Breaking News

যন্তর মন্তর থেকে জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়াম রাঁচি উত্তাল ছাত্র-যুব আন্দোলনে

রাঁচিতে ছাত্র-যুব বিক্ষোভকারীরা

২৯ জুলাই। রাঁচির জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়াম। সমবেত হয়েছেন হাজার হাজার তরুণ-তরুণী। তাঁদের হাতে প্ল্যাকার্ড, গলায় স্লোগান, চোখে ক্ষোভ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। জেপিএসসি, জেএসএসসি, সিজিএল সহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনার বিরুদ্ধে ওই স্টেডিয়ামে বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধরনার মধ্য দিয়ে সে দিন যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, মাত্র কয়েক দিনে তা রূপ নিয়েছে এক বৃহত্তর ছাত্র-যুব গণআন্দোলনে। উলগুলানের মহানায়ক বিরসা মুণ্ডার জন্মভূমিতে যেন আবারও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে প্রতিরোধের সেই আহ্বান। পুলিশের হুমকি, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস কিংবা জলকামান– কিছুই আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের পিছু হটাতে পারেনি। বরং প্রতিটি বাধার পর আন্দোলন ব্যাপকতর হয়েছে। দাবি একটাই– নিয়োগ পরীক্ষার দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি ও কালো তালিকাভুক্ত সংস্থার হাতে পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

আন্দোলন শুরু হওয়ার পর দূর-দূরান্তের ছাত্রছাত্রীরা, কোচিং সেন্টার, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের যুবক-যুবতীরা ক্রমশ এসে জড়ো হতে থাকেন স্টেডিয়ামের ধরনা মঞ্চের বিক্ষোভ সমাবেশে। তাঁদের বুকে একই যন্ত্রণা– পরিশ্রম করে চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির কারণে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ হয়ে পড়া। বছরের পর বছর চলেছে এই দুর্নীতি। একের পর এক সরকার পাল্টেছে, কিন্তু অবস্থা বদলায়নি। শেষ পর্যন্ত সহ্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেছে রাজ্যের চাকরিপ্রার্থী তরুণ-তরুণীদের। তাঁরা এই দুঃসহ পরিস্থিতির অবসান চান। চান শুধু তাঁদের নয়, আগামী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদেরও যেন এই যন্ত্রণা ভোগ করতে না হয়।

আন্দোলনের পাশে পরিবার, সাধারণ মানুষ

দিন যত এগিয়েছে, আন্দোলনের চরিত্রও বদলেছে। শুধু পরীক্ষার্থী নয়, অভিভাবকরা, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ, আদিবাসী সমাজের মানুষও ধরনা মঞ্চে আসতে শুরু করেন। প্রতিদিন অভিভাবকেরা নিজের হাতে রান্না করা খাবার নিয়ে হাজির হয়েছেন। শিক্ষিত মধ্যবিত্তের পাশাপাশি এমন বহু আদিবাসী ও নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষও আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যাঁদের নিজের সন্তান হয়তো এখনও পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেনি। তাঁরা বলছেন, আজকের নিয়োগ দুর্নীতি যদি বন্ধ না হয়, আগামী দিনে তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও নিরাপদ থাকবে না।

বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিরোধ

আন্দোলন চলতে চলতেই ধূর্ত শাসক শ্রেণি ও তাদের মদতপুষ্ট নানা গোষ্ঠী প্রতিবাদীদের বিভাজিত করার চেষ্টা করে। একটি সংবাদমাধ্যমের এক সাংবাদিক আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের মুখ দিয়ে বিভাজনমূলক বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তিনি যন্তরমন্তরের আন্দোলনকে দেশবিরোধী আখ্যা দিলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং স্পষ্ট জানান, তাঁদের আন্দোলনের মূল বিষয়– চাকরি, স্বচ্ছ নিয়োগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি নয়। প্রতিরোধের মুখে পড়ে ওই সাংবাদিক আন্দোলনস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। বাস্তবে এই আন্দোলনকে ধর্ম, জাতি বা পরিচয়ের প্রশ্নে ভাগ করে দেওয়ার অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে ঝাড়খণ্ডের লড়াকু ছাত্রসমাজ।

সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দাবি আদায়

ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত সরকার আলোচনায় বসে এবং আন্দোলনকারীদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। সরকার ১৪তম জেপিএসসি পরীক্ষা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৩ ও ২০২৫ সালের জেপিএসসি-জেএসএসসি ব্যাকলগ পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা টিডিপিএল-এর বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা হয়েছে। দুর্নীতিতে অভিযুক্ত অভয় তিয়ারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এই সিদ্ধান্তগুলি অবশ্যই আন্দোলনের সাফল্য। কিন্তু একে আংশিক সাফল্য হিসেবেই দেখছেন রাঁচির আন্দোলনকারীরা। তাই লড়াই তাঁদের থামেনি। কারণ সিজিএল সহ অন্যান্য বিতর্কিত পরীক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন থেকে গিয়েছে। আন্দোলনকারীদের আরও দাবি, দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত পরীক্ষা বাতিল করতে হবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করতে হবে।

চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন থেকে সর্বস্বান্ত হওয়ার যন্ত্রণা

প্রথম দিন থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক ছাত্র বিবেক পণ্ডিত জানালেন, বাবা-মা অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার দুর্নীতি তাঁদের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তাই যত বাধাই আসুক, আন্দোলন থেকে এক মুহূর্তের জন্য সরে যেতে রাজি নন বিবেক। বললেন, ‘‘আন্দোলন ছাড়া সামনে আর কোনও পথ নেই।”

গিরিডির প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা এক ছাত্রী চোখের জলে বললেন, চাকরিটা না পেলে অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসা করানো তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। এই ব্যক্তিগত কান্নাগুলিই ক্রমে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়ে আন্দোলনের চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশি হামলাকে চ্যালেঞ্জ করে ঐতিহাসিক মিছিল

১০ আগস্ট পুরনো বিধানসভা থেকে নতুন বিধানসভা ভবনের উদ্দেশে রওনা হয় বিশাল মিছিল। হাজার হাজার ছাত্র-যুব, চাকরিপ্রার্থীরা তো ছিলেনই, বহু মহিলা, বৃদ্ধ, সাধারণ মানুষও এতে অংশ নেন। মিছিল এগোতেই পুলিশ বাধা দেয়। ৬টি ব্যারিকেড ভেঙে আন্দোলনকারীরা অসীম সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলেন। ঝাড়খণ্ড পুলিশ জলকামান ও টিয়ার গ্যাস চালিয়ে মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে চায়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের রোখা যায়নি। তাঁরা পুলিশের বাধা পার হয়ে বিধানসভা চত্বরে ঢুকতে সক্ষম হন।

আন্দোলন গড়ে ওঠার ইতিহাস

ঝাড়খণ্ড পৃথক রাজ্য হওয়ার পর থেকেই জেপিএসসি সহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে, তার বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠন এআইডিএসও বারবার সোচ্চার হয়েছে। এ বারের আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এআইডিএসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত করে আন্দোলনের মঞ্চ গড়ে তুলতে এবং আন্দোলনকে ধারাবাহিক রূপ দিতে সংগঠনের ব্যানার ছেড়ে শত শত ছাত্রকর্মী লাগাতার ভাবে যুক্ত থেকে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন।

ধরনা মঞ্চ থেকে এআইডিএসও ঝাড়খণ্ড রাজ্য কমিটির সহসভাপতি আশীষ কুমার বলেছেন, ‘‘এটি কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট সরকারের সমস্যা নয়, এটি একটি নীতির প্রশ্ন। যতদিন এই নীতির পরিবর্তন না হবে, ততদিন এই ধরনের দুর্নীতি চলতেই থাকবে।” দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনাগুলির উল্লেখ করে তিনি ছাত্র আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।

রাঁচির শিক্ষাঃ জয় এসেছে আন্দোলনের রাস্তাতেই

এই আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, ছাত্রদের দাবিগুলি সরকারের আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারার পিছনে রয়েছে পুলিশের বাধা, জলকামান, টিয়ার গ্যাস, পরিবারের উদ্বেগ ও হাজারো অসুবিধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার ছাত্র-যুবকের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রত্যয়। কিন্তু রাঁচির এই আন্দোলনের প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়। যে সমাজে একটি চাকরির জন্য মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত পরিবারের বহু বছরের সঞ্চয়, বাবা-মায়ের স্বপ্ন এবং তরুণ-তরুণীদের কঠিন পরিশ্রম জড়িয়ে থাকে, সেখানে নিয়োগ পরীক্ষায়় দুর্নীতিকে নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম বলা যায় না। এ হল কার্যত জীবনের উপর আঘাত। সেই কারণেই জয়পাল সিং মুণ্ডা স্টেডিয়াম হয়ে উঠেছে প্রতিরোধের প্রতীক। এই আন্দোলন দিল্লির যন্তরমন্তরে সদ্য ঘটে যাওয়া অসমসাহসী আন্দোলনের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

রাঁচির ধরনা-মঞ্চ থেকে প্রতিটি জেলা, শহর, গ্রাম, কলেজ ও কোচিং সেন্টারে ছাত্র সংগ্রাম কমিটি গড়ে তোলার আহ্বান উঠেছে। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী অধিকার অর্জনের জন্য প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্বে সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল ছাত্র আন্দোলন। রাঁচির রাজপথ সেই শিক্ষাই আবার সামনে এনেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে এই অঙ্গীকার নিয়েই রাঁচি এখনও সংগ্রামমুখর।