
‘করোনা কালের মতো তৈরি থাকুন’– ২৩ মার্চ লোকসভায় এ কথা কার উদ্দেশে বললেন প্রধানমন্ত্রী? তা কি দেশের জনসাধারণকে উদ্দেশ্য করে? যুদ্ধ পরিস্থিতির আবহে সব জিনিসের দাম বাড়বে, তার জন্য জনসাধারণকে ত্যাগস্বীকার করতে হবে, সে কথাই কি বলছেন তিনি? (আবাপ-২৪ মার্চ)
‘করোনা কালের মতো তৈরি থাকুন’ বলতে প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চেয়েছেন? করোনা অতিমারির সময়ের মতো জনসাধারণ অভুক্ত-অর্ধভুক্ত থেকে, কাজ থেকে ছাঁটাই হয়ে দিনের পর দিন দুর্দশায় কাটাবে, ঘরে ঘরে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে, স্কুল-কলেজের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাবে, জরুরি সরকারি পরিষেবাগুলি না পেলেও দেশের মানুষ তা নিয়ে বিন্দুমাত্র অভিযোগ করবে না, এমনটাই কি! জনসাধারণের পূর্ব অভিজ্ঞতা অন্তত সেই আশঙ্কার সাথে মিলে যাচ্ছে।
করোনা কালে দেশের মানুষকে কোনও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কাঁসর-ঘণ্টা বাজিয়ে, আলো বন্ধ রেখে যখন করোনা তাড়ানোর নিদান দিলেন, যখন হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা করে দিলেন, তার ফল ভোগ করল কারা? সাধারণ মানুষই। অপরিকল্পিত লকডাউনের পরিণামে বহু মানুষের মৃত্যু হল। ঘরে ফিরতে চাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই খিদে-তৃষ্ণা-পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। রেললাইনে বিশ্রাম নেওয়া মানুষ দুর্ঘটনায় দলাপাকানো মাংসপিণ্ডে পরিণত হল। কাজ চলে গেল অসংখ্য মানুষের। রিক্সাচালক, মুটে-মজদুর সহ অসংগঠিত ক্ষেত্রের বহু মানুষ রুটি-রুজি হারিয়ে কার্যত পথে বসতে বাধ্য হলেন। সন্তানকে খেতে দিতে না পারার যন্ত্রণায় কত মা দেহবিক্রির পথে যেতে বাধ্য হলেন। তখন প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সরকারকে এই সঙ্কট মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকতে দেখা যায়নি। বরং মহামারি পরিস্থিতিতে জনসাধারণকে চরম ত্যাগস্বীকার করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং প্রতি মুহূর্তে তাদের ত্যাগস্বীকারের চরম পরীক্ষা। সে সময় প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর দল বিজেপি ‘তৈরি থেকে’ কী ভূমিকা নিয়েছিল? ‘পিএম কেয়ার’ ফান্ড তৈরি করে সমস্ত সরকারি কর্মচারীকে এক দিনের বেতন দিতে বাধ্য করেছে। সেই ফান্ডের কোনও হিসাব দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। আর সরকারের বদান্যতায় বড় বড় পুঁজিপতিরা সেই সময় তাদের সম্পদ কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। ওষুধ কোম্পানিগুলি, ভ্যাক্সিন কোম্পানিগুলি মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেছে। এমনকি বিজেপি সরকার ভ্যাক্সিন তৈরিতে সাহায্য দেওয়ার নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল টাকা পাইয়ে দিয়েছে সিরামের মালিক সাইরাস পুনেওয়ালাকে। দেখা গেছে, অতিমারির পর ভারতের কর্পোরেট সংস্থাগুলি রেকর্ড মুনাফা করেছে। ২০২০-২০২৫-এর মধ্যে ভারতীয় সংস্থাগুলির মুনাফা দেশের জিডিপি তুলনায় তিন গুণ দ্রুত হারে বেড়েছে (আবাপ-২৫ মার্চ,২০২৬)।
করোনার সময় প্রধানমন্ত্রীরই তৈরি থাকার কথা ছিল, কিন্তু তিনি তৈরি ছিলেন না। দেশের মানুষের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উল্টে সমস্ত রকম দুর্ভোগের বোঝা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন, এখন কি আবার সেই রকমই কোনও অভিসন্ধি রয়েছে তাঁর? প্রধানমন্ত্রীর জনগণের উদ্দেশে কোনও আহTান শুনলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রীর ‘মিত্রোঁ’ সম্বোধন শুনলে দেশের মানুষ ভয়ে সিঁটিয়ে যান, পিছনে বুঝি আবার কোন সর্বনাশ ধেয়ে আসছে!
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের সাথে ইজরায়েল ও আমেরিকার যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মোদিজি ইজরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে গলা জড়াজড়ি করে, ইজরায়েলকে ‘ফাদারল্যান্ড’ বলে সগর্বে ভারতে ফিরে আসার পরই ইরানে লাগাতার আক্রমণ শুরুকরেছে ইজরায়েল ও আমেরিকা। স্বভাবতই মোদিজির কাছে এই আক্রমণের খবর না থাকাটাই অস্বাভাবিক। তিনি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য কতটা প্রস্তুত ছিলেন? যদি সরকার প্রস্তুত থাকত তা হলে জনসাধারণকে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হত না। রান্নার গ্যাসের সংকটে জেরবার হতে হত না। দ্বিগুণ তেল আমদানি হওয়া সত্তে্বও আতঙ্কে ভুগতে হত না। প্রতিটি জিনিসের চড়া দাম গুনতে হত না। জনসাধারণকে তৈরি থাকতে বলার দ্বারা আসলে তিনি তাদের আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে সরকারের ব্যর্থতার বোঝা বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়ার বার্তাই দিলেন কি?
আর পুঁজিপতিদের প্রতি তিনি কী বার্তা দিতে চাইলেন? দেশের বড় বড় শিল্পপতিদের গায়ে যাতে যুদ্ধের কারণে বাজার সংকটের বিন্দুমাত্র আঁচ না লাগে তার জন্য তাদের অভয় দিলেন কি? পেট্রল-ডিজেলে প্রতি লিটারে ১০ টাকা অন্তঃশুল্ক কমিয়ে বড় বড় তেল কোম্পানিগুলিকে সুযোগ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেটাই প্রমাণ করলেন। যদিও সাধারণ ক্রেতার জন্য এক পয়সাও কম হল না তেলের দাম।বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম অনেক কমে গিয়েছিল, তখনও সাধারণ মানুষের জন্য কমানো হয়নি দাম। বাস্তবে সমস্ত দুর্ভোগ সহ্য করার অর্থাৎ শ্রমিক শোষণের ঢালাও ছাড়পত্র দিয়ে পুঁজিপতিদের পাশে থাকার বার্তা দিলেন। এটাই কি তাদের বোঝাতে চাইলেন, তোমাদের লাভের পাহাড় অটুট রাখতে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিঃস্বার্থভাবে ত্যাগ করতে বল। দেশের সংকটের সামনে জনসাধারণের সংকট বড় নয় তা ভাবতে শেখাও। যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে মালিকরাও যথেচ্ছ সংকট তৈরি করছে জনজীবনে। এই সুযোগে শুধু তেল, গ্যাস নয়, অবশ্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম আকাশচুম্বী করেছে। সরকারের প্রশ্রয়ে কালোবাজারিরা বিপুল মুনাফা লুঠছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষকে আরও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সরকার ছেলেভোলানো কথা বলছে, কালোবাজারি করতে দেব না। এ ভাবে যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে সাধারণ মানুষকে বলি করে চলেছে সরকার-পুঁজিপতি-কালোবাজারিদের অশুভ চক্র। সরকার এ সব বন্ধ করতে যে আদৌ প্রস্তুত ছিল না, তা স্পষ্ট।
ইতিমধ্যেই মূল্যবৃদ্ধিতে বিপন্ন, দারিদ্র-জর্জরিত সাধারণ মানুষ কোনও কূলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রতিদিনের খাবার, জীবনদায়ী ওষুধে পর্যন্ত কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই ভাবছেন দেয়ালে তো পিঠ ঠেকেই গেছে, আর কত দিন সইতে হবে এই যন্ত্রণা? এরকম সংকটজনক পরিস্থিতিতে তাদের তৈরি হতে হবে এ কথা ঠিক, তবে তা শোষক পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের জন্য। এখন জরুরি হিসাবে করতে হবে এই একটাই কাজ। এটাই সময়ের দাবি।