
ডেমোক্রেটিক রিসার্চ স্কলার্স অর্গানাইজেশন (ডিআরএসও)-এর উদ্যোগে ২৭ ফেব্রুয়ারি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবেকানন্দ হলে অনুষ্ঠিত হল সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ক বক্তৃতামালার অন্তর্গত এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা। বিষয় ছিল, ‘প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরাঃ কল্পনা বনাম বাস্তবতা’।
প্রধান বক্তা ছিলেন ডঃ কণাদ সিংহ, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, সংস্কৃত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি প্রাচীন ভারতের ইতিহাসচর্চাকে ঘিরে গড়ে ওঠা নানা প্রচলিত ধারণা, পৌরাণিক কাহিনি ও জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করেন। তিনি দেখান, কী ভাবে ইতিহাস ও কল্পনার সীমারেখা বহু সময়ে ইচ্ছাকৃত ভাবে অস্পষ্ট করা হয় এবং কেন প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, শিলালিপি, প্রাচীন গ্রন্থ ও সমকালীন নথির সমন্বিত পাঠ অত্যন্ত জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ইতিহাসকে গৌরবচর্চার উপকরণে পরিণত না করে সমালোচনামূলক ও প্রমাণনির্ভর পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা উচিত।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জাহিদ হাসান প্রাচীন ভারতের প্রকৃত ঐতিহ্য ও সাফল্যের দিকগুলি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদদের একটি প্রচলিত দাবি ছিল যে ভারতীয়দের মধ্যে নাকি সুসংগঠিত ঐতিহাসিক চিন্তাভাবনার অভাব ছিল। কিন্তু বাস্তবে ভারতীয় ঐতিহ্যে অতীতকে কালানুক্রমিক তথ্য হিসেবে নয়, সামাজিক ও নৈতিক চেতনার অংশ হিসেবে ধারণ করার একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি বিদ্যমান ছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্নাতকোত্তর শ্রীময়ী মাইতি তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন, প্রাচীন ভারতের নামে প্রচলিত বহু অতিরঞ্জিত দাবি। যেমন বিমান বা আধুনিক অঙ্গ প্রতিস্থাপন বৈজ্ঞানিক প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত নয়। সেগুলি কাল্পনিক বা প্রতীকী বয়ান। তিনি বলেন, ইতিহাসকে কল্পনা নয়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা উচিত। সবশেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে আলোচনা আরও সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি প্রাচীন ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরাকে কল্পনা নয়, বরং সমালোচনামূলক ও প্রমাণনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্বিবেচনার এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসর সৃষ্টি করে। এই আলোচনার মূল বার্তা, ইতিহাসকে গৌরবকথা বা মিথের আবরণে নয়, তথ্য, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক মনোভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। তাই এ ধরনের উদ্যোগ শুধু অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে কলকাতার বহু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী-গবেষকের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। গবেষক সংগঠনের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ডঃ অর্ঘ্য দাস, সর্বভারতীয় অফিস সম্পাদক গৌরাঙ্গ খাটুয়া সভায় উপস্থিত ছিলেন।