
সাম্রাজ্যবাদের বর্তমান যুগে অবাধ বাণিজ্য বলে যে কিছু হয় না, কোনও রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে অন্য কোনও রাষ্ট্রনেতার সম্পর্ক কেমন, কে কাকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে পরিচয় দেন কিংবা দেখা হলে কত জোরে জড়িয়ে ধরেন, এ সব কোনও কিছু দিয়েই যে বাণিজ্য সম্পর্ক তৈরি হয় না, ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
বাস্তবে পুঁজির জোর যার যত বেশি, সে থাকে ততখানি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। ভারত-মার্কিন চুক্তিতে আমেরিকার ভূমিকা সেই নিয়ন্ত্রকেরই। তাই যৌথ কোনও ঘোষণার পরিবর্তে চুক্তির সব কিছু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই ঘোষণা করলেন। এমনকি ভারত কী কী কিনতে রাজি হয়েছে তা-ও ট্রাম্পই বলে দিলেন। চুক্তিতে আমেরিকার কাছে ভারতের নতিস্বীকার একেবারেই নগ্ন। যদিও এই চুক্তির ফলে ভারতের কৃষক সমাজ সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে-খাওয়া মানুষ বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে, কিন্তু এতে দেশের একচেটিয়া পুঁজির মালিকরা লাভবান হবে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা যাক। প্রথমে ভারতের সঙ্গে বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি আটকাতে ২৫ শতাংশ এবং পরে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির অজুহাতে আরও ২৫ শতাংশ, মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠে যায় দেশের শিল্পমহলে। কারণ ভারতীয় রফতানির ১৮ শতাংশ যায় আমেরিকায়, যা বিদেশে মোট রফতানির সর্বোচ্চ। তার পর দীর্ঘ দর কষাকষি, বাস্তবে যা ভারতের উপর মার্কিন পুঁজির চাপ ছাড়া কিছু নয়, শেষে ১৮ শতাংশ শুল্ক মেনে নিয়ে ভারত-আমেরিকা অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং ভারত ৫০,০০০ কোটি ডলারের পণ্য ও পরিষেবা আমেরিকা থেকে কিনতে ‘দায়বদ্ধ’ বলে খত দিতে বাধ্য হয়। ২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষে আমেরিকা থেকে এ দেশে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪১৮০ কোটি ডলারের পণ্য। অন্য দিকে আমেরিকার সমস্ত শিল্পজাত পণ্য এবং সে দেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের বড় অংশের উপর ভারত হয় আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে, নয় অনেকখানিই কমিয়েছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভারতীয় পণ্যে চড়া শুল্কের চাপ দিয়ে ভারতীয় বাজার মার্কিন পণ্যের জন্য খুলে দেওয়ানোর উদ্দেশ্যেই ছিল ট্রাম্পের এই শুল্ক-হুমকি।
আমেরিকার থেকে ভারতের আমদানি তিন গুণ বাড়বে
স্বাভাবিক ভাবেই দেশ জুড়ে প্রবল প্রতিবাদ ওঠে যে, চুক্তিতে যে ভাবে আমেরিকা থেকে সমস্ত শিল্পদ্রব্য এবং কৃষিপণ্য আমদানিতে ছাড় দেওয়া হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে শূন্য শুল্কের কথা বলা হয়েছে, তাতে ভারতীয় কৃষকরা বিরাট ক্ষতির মুখে পড়বেন। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পগুলিও মার্কিন পণ্য-জোয়ারে ভেসে যাবে। এই চুক্তির ফলে হয়তো কিছু বেশি ভারতীয় পণ্য রফতানি করা সম্ভব হবে এবং তার দ্বারা ভারতীয় বড় বড় কোম্পানিগুলির ব্যবসাও খানিকটা চাঙ্গা হবে। কিন্তু তাতে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ রামা কৈবর্ত আর রহিম শেখদের কিছুই যাবে-আসবে না।
এই চুক্তিতে ঠিক কী কী পণ্য আমদানি-রফতানি হবে তা আমেরিকা বা ভারত কেউই দেশের মানুষের সামনে স্পষ্ট করেনি। কেন করেনি? কেন এই গোপনীয়তা? সরকারের জনগণের থেকে কী আড়াল করতে চাইছে বিজেপি নেতাদের তার স্পষ্ট জবাব দিতে হবে। আমদানি-রফতানির যে অঙ্ক ঘোষণা করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট, আমেরিকা থেকে ভারতের আমদানি তিনগুণ বেড়ে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এই চুক্তি ভারতের কৃষক, উদ্যোগপতি, ছোট-মাঝারি শিল্প, স্টার্ট আপ, মৎস্যজীবীদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। আমেরিকার সমস্ত শিল্প পণ্য আমদানিতে ভারত ছাড়পত্র দিয়েছে। এ কথা কে না জানে যে, সর্বোচ্চ মানের প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে মার্কিন পণ্যের মান অনেক উন্নত। সেই উন্নত মানের পণ্য বিনা শুল্কে বা নামমাত্র শুল্কে যদি ভারতের বাজারে ঢোকে তবে ভারতের উদ্যোগপতি, ছোট-মাঝারি শিল্প এবং স্টার্ট আপগুলি তার দ্বারা কী ভাবে লাভবান হবে? বাস্তবে এই অসম প্রতিযোগিতায় এই সব সংস্থাগুলি দাঁড়াতেই পারবে না। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। মার্কিন ব্লেড উৎপাদক সংস্থা জিলেট ভারতে ব্যবসা শুরুর পর ভারতীয় ব্লেড উৎপাদক সংস্থাগুলির কী পরিণতি দাঁড়িয়েছে? প্রায় সবগুলিকেই পাততাড়ি গোটাতে হয়েছে। একই পরিণতি ঘটবে অন্য ছোট এবং মাঝারি শিল্পগুলিরও।
আমেরিকার অসংখ্য খাদ্য ও কৃষিপণ্যে ভারত আমদানি শুল্ক হয় কমাবে বা একেবারেই তুলে নেবে। আমদানি তালিকায় পশুখাদ্যের পাশাপাশি সয়াবিন তেল, বাদাম, টাটকা ও প্রক্রিয়াজাত ফল, আপেল, তুলো, মদ, ওয়াইন এবং ‘অতিরিক্ত’ পণ্যের উল্লেখ করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত পণ্য কী কী, তা যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করা হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, আরও বহু পণ্যই আমদানি করা হবে, যেগুলি গণবিক্ষোভের আশঙ্কায় উভয় দেশের নেতারা এখনই প্রকাশ্যে আনছেন না। এর আগে কোনও বৈদেশিক চুক্তিতে কৃষিক্ষেত্রকে বিদেশি পুঁজির জন্য এ ভাবে খুলে দেওয়া হয়নি।
আমদানি বৃদ্ধির কুফল
আমেরিকা থেকে পশুখাদ্য এবং সয়াবিন তেল আমদানির ফল কী হবে? এখন দেশে পোল্ট্রি-মাছ এবং পশুপালন শিল্পে সয়াবিন, তুলোর বীজ, বাদাম বা তুঁষ থেকে তেল বের করার পর যে খোল বা কেক তৈরি হয় তা খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকায় ভুট্টা থেকে ইথানল তৈরির কারখানার উপজাত পণ্য ডিডিজি (ড্রায়েড ডিস্টিলার্স গ্রেইনস) ও লাল জোয়ার আমদানি ভারতীয় সয়াবিন চাষিদের মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলবে। কারণ এখন যে দামে যে পুষ্টিগুণের ডি-অয়েলড কেক চাষিদের কিনতে হয়, ডিডিজি তার তুলনায় অনেকটাই সস্তা। একই পরিণতি হবে তুলো এবং আপেল চাষিদের। মার্কিন তুলোর মান অনেক উন্নত হওয়ায় ভারতীয় তুলো চাষিরা পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়বে। অন্য দিকে ভারতীয় বস্তে্রর উপর ১৮ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে আমেরিকা। শর্ত দিয়েছে একমাত্র মার্কিন তুলো থেকে উৎপাদিত বস্ত্রই শুল্ক ছাড় মিলবে।
ইউরোপ এবং আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির পর ভারতীয় বাজারে অবাধে বিদেশি আপেল ঢুকতে থাকলে কাশ্মীর তথা ভারতীয় লক্ষ লক্ষ আপেল চাষি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। ইতিমধ্যেই কাশ্মীরের আপেল চাষিরা বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করে সরকারের কাছে বিদেশি আপেলে ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক চাপানোর দাবি জানিয়েছে। আমেরিকার কৃষি সচিব ব্রুক রলিন্স দাবি করেছেন, বাণিজ্য চুক্তির ফলে আমেরিকার কৃষিজাত পণ্য আরও বেশি করে ভারতের বাজারে ঢুকবে। ফলে আমেরিকার গ্রামে নগদ ডলার ঢুকবে। মনে রাখতে হবে, কৃষিজ পণ্যের এই আমদানি-রফতানিতে উভয় দেশের সাধারণ চাষিদের কোনও স্বার্থ নেই। আমেরিকায় কৃষি মূলত বিগ-ফার্মিং তথা বৃহৎ পুঁজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর এবং বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় ভরতুকি নির্ভর। তেমনই ভারতের কৃষিতে ছোট-মাঝারি চাষির ভূমিকা থাকলেও কৃষিপণ্যের রফতানি বাণিজ্যে তাদের কোনও ভূমিকা নেই। তারা চিরকালই অভাবি বিক্রির শিকার হয়। শিল্পপণ্যের মতোই কৃষিপণ্যের বাণিজ্যও এখন পুরোপুরি বৃহৎ পুঁজির কুক্ষিগত। বৈদেশিক বাণিজ্যের তো কথাই নেই।
বিদেশে রফতানির সুফল নেবে বৃহৎ পুঁজির মালিকরা
আদানি এবং আম্বানি গ্রুপই মূলত ভারতের বৈদেশিক কৃষি-বাণিজ্যে সরবরাহ শৃঙ্খল, লজিস্টিকস এবং পরিকাঠামোগত সহায়তার মাধ্যমে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। আদানি গ্রুপ যেমন বন্দর পরিচালনা করে, তেমনই তারা বৃহদাকার আধুনিক গুদামঘর নির্মাণ করেছে যেগুলি খাদ্যশস্যের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ এবং দ্রুত আমদানিতে সহায়তা করে। আদানি উইলমার তাদের ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভোজ্য তেল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশ্ববাজার থেকে আমদানি করে। অন্য দিকে রিলায়েন্স রিটেইল সরাসরি কৃষকদের থেকে পণ্য সংগ্রহ ও খুচরো বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে, যা বৈদেশিক বাণিজ্যে পণ্যের সরবরাহ বাড়ায়। রিলায়েন্স ফ্রেশ বা রিলায়েন্স রিটেইলের মাধ্যমে আম্বানিরা আমদানিকৃত এবং দেশীয় পণ্যের একটি বিশাল সাপ্লাই চেন নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, ভারতীয় যে কৃষিপণ্যই বিদেশে রফতানি হোক, তার সঙ্গে সাধারণ চাষির সুফল পাওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। এই কোম্পানিগুলি চাষির থেকে সস্তা দামে কৃষিপণ্য কিনে চড়া দামে বিদেশের বাজারে বিক্রি করবে। দেশের মধ্যেও এর অজস্র উদাহরণ রয়েছে। যেমন মহারাষ্ট্রের চাষিরা যে পেঁয়াজ দু’টাকা কেজি দরে বড় বড় পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হয়, কয়েক মাসের মধ্যেই দেশের মানুষ সেই পেঁয়াজ ৮০-৫০-৬০ টাকা, কখনও এমনকি ১০০ টাকা কেজি দামে কিনতে বাধ্য হয়। কৃষি কিংবা শিল্প যে কোনও পণ্যের আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রণ করবে ধনকুবেরদের নিয়ন্ত্রিত বৈদেশিক বাণিজ্যের সিন্ডিকেটগুলি।
ফলে মার্কিন কৃষি ও শিল্প পণ্যের জোয়ারে ভাসবে ভারতীয় বাজার। অর্থনীতির নিয়মে প্রাথমিক ভাবে ভারতীয় ক্রেতারা সাময়িক ভাবে কিছুটা সস্তায় পণ্য কেনার সুযোগ পেলেও, ভারতীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতায় বাজার ছাড়তে বাধ্য হলেই মার্কিন পণ্যের দাম বাড়বে। তা ছাড়া কোনও পণ্য সস্তায় আমদানি হলেই যে দেশের সাধারণ ক্রেতারা তার সুবিধা পায় না, তার স্পষ্ট উদাহরণ রাশিয়ার সস্তা তেল। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া ভারতকে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের তুলনায় অনেকখানি সস্তায় তেল বিক্রি করতে রাজি হয়। ভারতীয় কোম্পানিগুলি সেই তেল বিপুল পরিমাণে আমদানি করতে থাকে এবং অস্বাভাবিক রকমের মুনাফা করে। কিন্তু তার কোনও সুবিধা দেশের সাধারণ মানুষ পায়নি। স্বাভাবিক ভাবেই বিদেশের কোনও পণ্য যদি বিনা শুল্কে বা অপেক্ষাকৃত সস্তায় আমদানি হয়ও তার সুবিধা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছবে না। লাভের গুড় খেয়ে নেবে বৃহৎপুঁজি নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটগুলিই।
ভারত থেকে আমেরিকায় রফতানি হবে ইস্পাত, তামা, গাড়ির যন্ত্রাংশ, বস্ত্র, চামড়া, জুতো, রত্ন-অলঙ্কারের মতো প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার পণ্য। সরকারের উপর এই সব ক্ষেত্রে উৎপাদক এবং রফতানিকারি বৃহৎ কোম্পানিগুলির থেকে চাপ ছিল দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার।
আমেরিকা এবং ভারতের বৃহৎ পুঁজিপতিদের চাপেই চুক্তি
দেশের সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিপন্ন হলেও এই অসম চুক্তির দ্বারা যেহেতু দু-দেশের বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা হবে তাই এই চুক্তির পিছনে যেমন মার্কিন ধনকুবেরদের চাপ ছিল তেমনই ভারতীয় ধনকুবেরদের চাপও ছিল। আমেরিকার টালমাটাল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো আমেরিকার পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন ছিল। আবার রফতানি ক্ষেত্রে ভারতের অতিরিক্ত আমেরিকা নির্ভরতা ভারতকে মার্কিন শর্ত মানতে বাধ্য করেছে ঠিকই, কিন্তু রফতানি বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে ভারত সরকারকে প্রয়োজনে জনস্বার্থ বলি দিতে বাধ্য করেছে ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজিপতিরা।
ভারত শুধু কৃষি এবং শিল্পপণ্যই আমদানি করবে এমন নয়। বিপুল পরিমাণ তেল, গ্যাস এবং আধুনিক অস্ত্রও কিনবে। অনেকেরই মনে আছে, ট্রাম্প দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরই আমেরিকা পৌঁছেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মোদিকে পাশে বসিয়ে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৫ থেকে ভারতকে যুদ্ধাস্ত্র বেচার পরিমাণ বাড়াবে আমেরিকা। ভারত আমেরিকা থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সহ কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র কিনবে। দু’দেশের আলোচনায় ঠিক হয়, ভারত আমেরিকা থেকে আরও বেশি পরিমাণে তেল ও গ্যাস কিনবে, যাতে দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ঘাটতি কমে আসে। ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আমেরিকাই ভারতে তেল ও গ্যাস সব থেকে বেশি পরিমাণে জোগান দেবে। ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, রাশিয়া থেকে সস্তা তেল না কিনে চড়া দামে আমেরিকা ও ভেনেজুয়েলার তেল আমেরিকার মাধ্যমেই কিনতে হবে ভারতকে। শুধু তাই নয়, এত দিন পর্যন্ত আইন ছিল অসামরিক পরমাণু উৎপাদনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় নিতে হত চুল্লি সরবরাহকারী কোম্পানিকে। সরকার সম্প্রতি এই ক্ষেত্রে বিদেশি পুঁজির জন্য ছাড়পত্র ঘোষণা করেছে। তেমনই নতুন আইন এনে দুর্ঘটনার দায় থেকে কোম্পানিকে ছাড় দিয়ে দিল। এর লক্ষ্য যে মার্কিন কোম্পানিগুলি, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
কারণ, বাণিজ্য চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন কোম্পানিগুলিই বহু কোটি টাকার চুল্লি সরবরাহের বরাত পেয়েছে। আবার কোনও রকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাতারাতি গজিয়ে ওঠা আদানিদের অসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি এই ক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে এবং তাদের সেই বিদ্যুৎ নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে গণতন্ত্রের ন্যূনতম রীতিনীতিকে দু’পায়ে মাড়িয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে রাতের অন্ধকারে মার্কিন সেনা গ্রেফতার করে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার তেলখনিগুলির দখল নিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। ভারতীয় রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ সেই তেলই আমদানি করার অনুমতি পেয়েছে ট্রাম্পের থেকে। বাস্তবে ভারতের জনগণের স্বার্থকে বলি দিয়ে ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির মুনাফার স্বার্থ রক্ষাই যে এই চুক্তির একমাত্র লক্ষ্য তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থই মূল জনস্বার্থ কোথাও নেই
চুক্তির সূচনায় প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, এই চুক্তি হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে। বাস্তবে সাম্রাজ্যবাদের কাছে গণতন্ত্রের কোনও মূল্য নেই। পুঁজির নিরঙ্কুশ স্বার্থই ওদের কাছে গণতন্ত্র। মুনাফার প্রয়োজনে এমন কোনও কাজ নেই যা তারা করতে পারে না। আজ শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকার লক্ষ্য সমস্ত রকম প্রতিযোগিতায় তার চূড়ান্ত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।
ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও আমেরিকার লক্ষ্য ভারতীয় পুঁজিকে শক্তিশালী মার্কিন পুঁজির উপর নির্ভরশীল করে তোলা, ভারতের বাজারকে মার্কিন ধনকুবের গোষ্ঠীর পণ্য বিক্রির খোলা ময়দানে পরিণত করা। ভারতীয় পুঁজিপতি শ্রেণিরও লক্ষ্য, মার্কিন ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি থেকে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জায়গায় নিয়ে যাওয়া, ভারতীয় লগ্নিপুঁজির জন্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলির নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য মার্কিন সমর্থন পাওয়া। সব মিলিয়ে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মধ্যে একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থই মূল, জনস্বার্থ কোথাও নেই, বরং তাদের স্বার্থে দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থের সঙ্গে জনস্বার্থকেও বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।