Breaking News

এস আই আরঃ এই অরাজকতার জন্য বিজেপির রাজনীতি দায়ী

এসআইআর-এর নামে নাগরিকদের হেনস্থার প্রতিবাদে ও মৃতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের দাবিতে জেলায় জেলায় এসইউসিআই(সি)-র বিক্ষোভ। ছবিঃ নদিয়ার দেবগ্রাম, ১৯ জানুয়ারি

এস আই আর শুরুর সময়ে রাজ্যের বিজেপি নেতা-নেত্রীরা শোরগোল তুলে দিয়েছিলেন যে রাজ্যে ঢুকে পড়েছে দুক্সকোটি রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। এস আই আর হলে তারা সব ধরা পড়বে। বিজেপি নেতাদের তারস্বর প্রচারে অনেকেই কথাগুলো বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন। তাঁরাও এখানে ওখানে কথাগুলো আওড়াচ্ছিলেন। এখন এস আই আরের প্রথম দফা কেটে যখন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে প্রায় দেড় কোটি মানুষের শুনানিতে ডাক পড়ছে তখন তাঁরাই রোহিঙ্গা কিংবা বাংলাদেশি খোঁজার কথা ভুলে গিয়ে ভোটার তালিকায় নিজের নাম বাঁচানোর দুশ্চিন্তায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। রাজ্যের মানুষ প্রতিদিন দেখছেন, নির্বাচন কমিশন কী ভাবে বয়স্ক, অসুস্থ, এমনকি হাসপাতালে ভর্তি মানুষদেরও শুনানির জন্য টেনে আনছে এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখছে। রাজ্য জুড়ে প্রবল গণবিক্ষোভের সামনে পড়ে শেষ পর্যন্ত কমিশন অক্ষম এবং অসুস্থদের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে শুনানির নির্দেশ দিলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কমিশনের খাতাতেই থেকে গেছে। মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে। অথচ এটার কোনও প্রয়োজন ছিল না।

প্রথমে জানানো হয়েছিল, ২০০২-এর ভোটার লিস্টে যাঁদের নাম নেই, বা তাঁর বাবা-মা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমারও নাম নেই, যাঁদের ম্যাপিং হয়নি তাঁদের শুনানির জন্য ডাকা হবে। তাঁদের কমিশন নির্ধারিত ডকুমেন্ট দিয়ে প্রমাণ করতে হবে তাঁরা ভারতীয় নাগরিক। এর পর হঠাৎ কমিশন নিয়ে এল লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নামক এক অদ্ভূত অসঙ্গতির কথা এবং সেই অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে ডাকা শুরু হল ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষকে। ফলে এই বিরাট সংখ্যক মানুষকে যেমন সমস্ত কাজ ফেলে দৌড়তে হচ্ছে শুনানিতে, তেমনই তাঁরা আশঙ্কিত যে তাঁদের দেওয়া তথ্যে কমিশন সন্তুষ্ট হবে কি না। এর বাইরেও বিরাট সংখ্যক মানুষ শুনানির ডাক পাওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত। দেখা যাচ্ছে, কোনও কোনও বুথে একশো থেকে তিনশো জনকে পর্যন্ত অর্থাৎ গণহারে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। তা হলে ম্যাপিং কথাটার তো কোনও মানেই থাকে না! অর্থাৎ যাঁদের ম্যাপড বলে এক বার কমিশনই ঘোষণা করেছে, তাঁদেরই আবার কমিশন আনম্যাপড বলে দাগিয়ে দিচ্ছে। ফলে শুনানিতে হাজির হওয়ার জন্য মানুষকে কাজ ফেলে, চাকরি এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট কাজ বাদ দিয়ে দৌড়তে হচ্ছে। যাঁরা অন্য রাজ্যে কাজ করেন তাঁদের বহু টাকা খরচ করে ছুটে আসতে হচ্ছে। শুনানিতে ডাক পেয়ে বহু মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। উদ্বেগ সহ্য করতে না পেরে অনেকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে, আবার অনেকে আত্মহত্যা পর্যন্ত করছেন। এই সব মৃত্যুর দায় নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে? কেন কমিশন এর দায় নেবে না? কিন্তু হঠাৎ এই ডিসক্রিপেন্সির কথা নির্বাচন কমিশন তুলল কেন? নাগরিকদের পূরণ করা এনুমারেশন ফর্ম, যার বড় অংশ ছিল স্থানীয় ভাষা বাংলায়, বিএলও-রা তো মিলিয়ে স্ট্যাম্প দিয়ে স্বাক্ষর করে একটি কপি নাগরিককে ফেরত দিয়েছিলেন। তা হলে নতুন করে অসঙ্গতির প্রশ্ন তোলা হল কেন? বিএলওরা মূলত যান্ত্রিক বিভ্রাটের কথা জানাচ্ছেন।

বলছেন, তাঁরা এই পূরণ করা ফরম তাঁদের অ্যাপে আপলোড করার পর কমিশন আবার এআই-এর সাহায্য নিয়ে সেগুলিকে তাদের নিজস্ব অ্যাপে ইংরেজিতে ভাষান্তর করে আপলোড করেছে। কিন্তু বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় পরিবর্তিত উচ্চারণকে বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের দিয়ে ভাল ভাবে মেলানো প্রয়োজন ছিল। কমিশন সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। ফলে ২০২৫-এর তালিকায় থাকা নামের সঙ্গে মূলত বানানে অজস্র অসঙ্গতি দেখা দিচ্ছে। কমিশনের অ্যাপে সেগুলি মিসম্যাচ হিসাবে দেখাচ্ছে। কমিশন পাইকারি হারে তেমন সবাইকে নথি সহ দফতরে শুনানির জন্য তলব করছে। শুধু তাই নয়, ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও আবার কমিশন নির্ধারিত ডকুমেন্ট নিয়ে তাঁদের হাজির হতে হবে।

শুনানিতে ডকুমেন্ট জমা দিয়েও একজন নাগরিক বুঝতে পারছেন না, তাঁর নাম সত্যিই তালিকায় থাকল কি না। কারণ বিএলও, এইআরও, ইআরও নয়, এই তথ্য পরীক্ষিত হবে ডিএম বা ডিইও-র দ্বারা। আবার নাগরিকরা যে তথ্য দিচ্ছেন, তার কোনও প্রাপ্তিও স্বীকার করা হচ্ছে না। অর্থাৎ কমিশন তার নিজের ভুল সংশোধনের দায় নাগরিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে। অথচ এই ডিসক্রিপেন্সিগুলি বিএলওরা, যাঁরা এলাকার মানুষকে চেনেন বা এই সমস্যাগুলির ধরন বোঝেন, তাঁরাই মিটিয়ে ফেলতে পারতেন। বাস্তবে যত দিন গেছে ততই কমিশন বিএলওদের উপর নির্ভর না করে ডকুমেন্টের উপর জোর দিয়েছে, যে ডকুমেন্ট সংগ্রহ করা বহু নাগরিকের পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ সহজ প্রমাণগুলিকে কমিশন গ্রাহ্য করছে না। ফলে নাগরিকদের হেনস্থা বেড়েই চলেছে।

বিবাহিত মহিলাদের পদবি পরিবর্তনকেও অসঙ্গতি বলে দেগে দিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষেই তা করা হচ্ছে। যে মহিলাদের বাবা ও মা মারা গেছেন, তাঁরা শুনানিতে গিয়ে কোন নথিতে বাবা বা মা-র সঙ্গে সম্পর্ক প্রমাণ করবেন, বিশেষত যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তা নিয়ে তৈরি জটিলতায় তাঁরা হেনস্থা হচ্ছেন। এমনকি ভাই-বোনের সংখ্যা বেশি হলেও বা কমিশনের ভুলে বেশি দেখালেও তার জবাবদিহি নাগরিককেই করতে হচ্ছে। আদিবাসী, বনবাসী মানুষরাও যারপরনাই হেনস্থা হচ্ছেন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে তাতে নাগরিকদের হেনস্থা করাই যেন কমিশনের মূল লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।

কমিশনের দোষে ভুল বয়স এলে তা ঠিক করার জন্য মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, যেটি এত দিন পর্যন্ত বয়সের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসাবে সরকারি সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে, তা বাতিল করেছে কমিশন। বলেছে, অ্যাডমিট কার্ড নয়, কোনও সরকার স্বীকৃত বোর্ড থেকে পাশের সার্টিফিকেট দরকার। অদ্ভূত ব্যাপার! যে রাষ্ট্র দেশের বিরাট এক অংশের জনগণকে শিক্ষার সুযোগই দেয়নি, সেই রাষ্ট্রই আবার সেই নাগরিককে পাশ করার সার্টিফিকেট না থাকার জন্য দায়ী করছে। এই নাগরিক-ভোগান্তির সত্যিই কোনও প্রয়োজন ছিল না। বাস্তবে নির্বাচন কমিশন তার ভুলের দায় নাগরিকদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে।

কমিশনের খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে সারা রাজ্যে সাধারণ মানুষ যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ছে তখন বিজেপি নেতারা বিনা বাক্য ব্যয়ে সেই খামখেয়ালিপনাকে সমর্থন করে চলেছেন। তাঁরা নাকি কোথাও জনগণের হেনস্থা দেখতে পাচ্ছেন না। আসলে তাঁরা নিজেদের চোখ দিয়ে দেখলে এগুলির সবই তাঁদের চোখে পড়ত। তাঁরা দেখছেন হয় দলের দিল্লি নেতাদের চোখ দিয়ে, না হয় নির্বাচন কমিশনের চোখ দিয়ে। বাস্তবে এঁদের রাজ্যের জনগণের প্রতি কোনও দরদ বা দায়িত্ববোধ কিছুই নেই। এঁরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেন না, দেখেন শুধুই ভোটার হিসেবে এবং শুধুমাত্র তাঁদের দলের ভোটার কি না সেই বিচার করে। বাস্তবে ভোটার তালিকায় দেশের নাগরিকদের নাম তোলাই যদি কমিশনের একমাত্র উদ্দেশ্য হত, তবে নাগরিকদের সঙ্গে কমিশনের ব্যবহার অন্য রকম হত। তা হত নাগরিক সহায়ক। কীসে তাদের ভোগান্তি কম হয় বা একেবারেই ভোগান্তির মুখোমুখি না হতে হয় কমিশন সেই চেষ্টা করত। বাস্তবে নাগরিকদের সঙ্গে কমিশনের আচরণ সম্পূর্ণ বিদ্বেষমূলক। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে রজ্য বিজেপির নানা স্তরের নেতারাও অহরহ বলে চলেছেন যে, এ রাজ্য অনুপ্রবেশকারীতে ভরে গেছে। কমিশনের আচরণ থেকে স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশনেরও উদ্দেশ্য এস আই আর এর মধ্য দিয়ে বিরাট একটা অংশের মানুষের নাম বাতিল করে সেই প্রচারটাকেই সত্য বলে প্রমাণ করা। তাই কোনও রকম প্রস্তুতি ছাড়াই এবং অত্যন্ত কম সময় নিয়েই কমিশন এসআইআরে নেমে পড়েছে। বিএলও-রা জানাচ্ছেন, তাঁদের কাজের জন্য কমিশন থেকে কোনও গাইডলাইন বা কোনও ম্যানুয়াল বুক দেওয়া হয়নি। যে অ্যাপ তাঁদের ব্যবহার করতে দেওয়া হচ্ছে তা ব্যবহার করার জন্য তাঁদের কোনও রকম প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়নি। ফলে বহু বিএলও গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এমনকি তাঁদের ঊর্ধ্বতন এইআরও বা ইআরওদের কাছেও কমিশনের কোনও নির্দিষ্ট গাইডলাইন বা সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। ফলে বিএলওরা নিচের তলায় যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য সমাধানের কথা এইআরও-ইআরওরা-ও বলতে পারছেন না। তাঁরা শুধু উপরওয়ালা দেখিয়ে তাঁদের দায়িত্ব শেষ করছেন।

কমিশনের যাঁরা এস আই আরের নিত্যনতুন নীতি নির্ধারণ করছেন তাঁরা তো কেউ মূর্খ নন। দেশ সম্পর্কে, দেশের মানুষ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা থাকারই কথা। নাকি কমিশনার এবং তাঁদের অধীন অফিসাররা সমাজের এতই উচ্চকোটির বাসিন্দা যে দেশের মানুষের বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁদের সঠিক কোনও ধারণাই নেই। আর না হয়, তাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে, বা কোনও অদৃশ্য নির্দেশ কার্যকর করতে নাগরিকদের এ ভাবে হেনস্থা করছেন। তাঁদের আচরণ থেকে দেশের মানুষ যদি মনে করেন কেন্দ্রের বিজেপি নেতাদের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যই তাঁদের একমাত্র যোগ্যতা তবে তাঁদের দোষ দেওয়া যাবে কি? আর যদি তাঁরা মনে করে থাকেন, যে হেতু তাঁদের সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হতে হয় না এবং তাঁরা আইনের দ্বারা সুরক্ষিত এবং তাঁরা কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পছন্দের লোক, তাই তাঁরা মানুষকে নিয়ে, মানুষের জীবন নিয়ে যা খুশি করতে পারেন, তাঁদের কেউ কিছু করতে পারবে না তবে দেশের মানুষকেই তাঁদের এই উদ্ধত আচরণের জবাব দিতে হবে।

ইতিমধ্যেই রাজ্যের সর্বত্র সাধারণ মানুষ কমিশনের স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। কোথাও বিএলওকে ঘেরাও করছে তারা, কোথাও বিডিও অফিস, কমিশন অফিসে বিক্ষোভ হচ্ছে। রাস্তা অবরোধ হচ্ছে। বিজেপি নেতারাও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন। কমিশন দ্রুত নিজেদের আচরণ সংশোধন না করলে এমন বিক্ষোভ আগামি দিনে বাড়তেই থাকবে।