
সংখ্যাগরিষ্ঠতা কেন্দ্রীয় সরকারের ঔদ্ধত্যকে এমন উচ্চতায় তুলেছে যে, সংসদে কোনও আলোচনা ছাড়াই একের পর এক বিল তারা আইনে পরিণত করেছে। তারপর গণআন্দোলনের চাপে কিছু বিল বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি বিদ্যুৎ গ্রাহক সংগঠনগুলির ধারাবাহিক আন্দোলনের সামনে বিল নিয়ে তাদের বক্তব্য শোনার উদ্যোগ নেয় সরকার। গত ১৬ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় সরকারের বিদ্যুৎ সচিব অল বেঙ্গল ইলেক্ট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (অ্যাবেকা) এবং অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (আইকা)-কে অনলাইন মিটিংয়ে আহ্বান করেছিলেন। মিটিংয়ের আলোচ্য বিষয় ছিল বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল ২০২৫।
অল ইন্ডিয়া ইলেকট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (এআইইসিএ)-র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কে ভেনুগোপাল ভাট এবং অল বেঙ্গল ইলেক্ট্রিসিটি কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন (এবিইসিএ)-র পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক সুব্রত বিশ্বাস এই আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
এই মিটিংয়ে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী একচেটিয়া শিল্পপতিদের প্রতিনিধিরা, বিভিন্ন রাজ্যের সরকারি বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানির প্রতিনিধিরা, কয়েকটি এনজিও-র প্রতিনিধিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের (গৃহস্থ, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, ক্ষুদ্র শিল্প এবং ক্ষুদ্র কৃষি) জন্য এই বিলের সামগ্রিক প্রতিবাদ করে একমাত্র গ্রাহক সংগঠনের প্রতিনিধিরাই বক্তব্য রাখেন। তাঁরা বলেন, বিদ্যুৎ একটি অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা। এটাকে কখনোই মুনাফার পণ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। এই সংশোধনী বিলে তথাকথিত ক্রস সাবসিডি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পুরোপুরি বিলুপ্ত করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সেটা সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহক এবং কৃষকদের খুবই সংকটে ফেলবে। এই বিলে ‘ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবিলিগেশন’ প্রথাকে পুরোপুরি তুলে দিয়ে একটি এলাকায় একাধিক বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিকে ব্যবসা করার লাইসেন্স দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বিশাল বিস্তৃত সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করে বেসরকারি মালিকদের মুনাফা লোটার এই ব্যবস্থা সাধারণ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্বার্থকে বিঘ্নিত করবে।
বেসরকারি মালিকরা একমাত্র বেশি মুনাফা ভিত্তিক এলাকায় বিদ্যুৎ বন্টনের ব্যবসা করবে, যার ফলে রাজ্য সরকারি বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানি প্রবল আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তা ছাড়া একটি এলাকায় একাধিক বেসরকারি কোম্পানিকে বন্টনের ব্যবসা করতে বাস্তবে প্রিপেইড স্মার্ট মিটার বসাতেই হবে। যা কিনা গ্রাহকদের টাকা লুট করার একটা সুন্দর ব্যবস্থা ছাড়া কিছু নয়। বন্টন কোম্পানিগুলো প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের আবেদন না জানাতে পারলে বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকেই (সুয়োমোটো) ট্যারিফ নির্ধারণ করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেটা গ্রাহকদের স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করবে। গ্রাহক সমিতি সেটা বাতিল করার আবেদন জানিয়েছে।
অ্যাবেকা দাবি জানিয়েছে, কমিশন গ্রাহক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া যাতে ট্যারিফ নির্ধারণ না করে। এই সংশোধনী বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে, খরচ অনুযায়ী ট্যারিফ নির্ধারণ করার (কস্ট রিফ্লেকটিভ ট্যারিফ)। এই প্রস্তাব সাধারণ গ্রাহক এবং কৃষি বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্বার্থবিরোধী, কারণ এই গ্রাহকরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে না। রাজ্য সরকারি বিদ্যুৎ বন্টন কোম্পানিগুলো প্রচুর টাকা ক্ষতিতে চলছে, এই মিথ্যা প্রচার করে বন্টন ব্যবস্থার বেসরকারিকরণ করার চেষ্টা চলছে। লোকসান নয়, বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এ বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি, পরিবহণ কোম্পানি, এবং বন্টন কোম্পানিগুলোকে ন্যূনতম ১৬ শতাংশ লাভ যুক্ত করে ট্যারিফ নির্ধারণ করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। বেসরকারিকরণের ভয়াবহ পরিণাম দেখা যাচ্ছে ওড়িশায়। এই রাজ্যে বেসরকারিকরণের পর চূড়ান্ত গ্রাহক পরিষেবার গাফিলতির কারণে ওই রাজ্য সরকার একের পর এক বেসরকারি কোম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছে।
সংবিধানে বলা আছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রাজ্যের যৌথ বিষয়। এই সংশোধনী বিলে রাজ্যকে উপেক্ষা করে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ কেন্দ্রিকরণ করার যে প্রচেষ্টা রাখা হয়েছে গ্রাহক সমিতি তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। গ্রাহক সমিতি দাবি জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিষয়ে যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সবচাইতে বড় স্টেকহোষ্প্রর বিদ্যুৎ গ্রাহক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। এই সংশোধনী বিল বিদ্যুৎ বিষয়ক পার্লামেন্টারি কমিটির কাছে তাদের মতামতের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেই কমিটির মতামত জনসাধারণকে অবিলম্বে জানাতে হবে।