
ক্ষমতার দাপটের কাছে সাধারণ মানুষের জীবন যে কত অসহায় হয়ে উঠছে দিনের পর দিন, কুলদীপ সেঙ্গারের জামিন তা আরও একবার ভীষণ ভাবে স্পষ্ট করে গেল। বিচার না প্রহসন! দেশে সত্যিই আইন আছে? থাকলে তা কতটা নিরপেক্ষ? আইন, আদালত, বিচারব্যবস্থা, গণতন্ত্রের এই সুদৃশ্য কাঠামোয় সুবিচার পাওয়ার অধিকার কাদের? এই প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়ে উঠেছে আজ। সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্ট উন্নাওয়ের ঘটনার মূল অভিযুক্ত কুলদীপ সেঙ্গারের যাবজ্জীবন সাজা রদ করে, মামুলি কয়েকটা শর্ত সাপেক্ষে জামিনে মুক্তি দিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টে এই জামিন স্থগিত হলেও, জনমনে যে প্রশ্ন উঠেছে তার নিরসন হয়নি।
২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে এক নাবালিকা গণধর্ষিতা হয়। মূল অভিযুক্ত হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হয় তৎকালীন বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার। তার পরের ঘটনা আরও মারাত্মক। অভিযোগ জানাতে গেলে নির্যাতিতাকে একের পর এক হুমকি, হামলা, হেনস্থার সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি তার পরিবারের অন্য সদস্য সহ তাকে ও তার আইনজীবীকে ট্রাক চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়। ভয়াবহ ওই ঘটনায় পরিবারের এক সদস্য ও আইনজীবী মারা যান। নির্যাতিতাকে দেহের বিভিন্ন জায়গায় আড়াইশোর বেশি সেলাই ও একাধিক ভাঙা জায়গায় প্লেট লাগিয়ে কোনও মতে সারিয়ে তোলা হয়। পুলিশি হেফাজতে তার বাবাকে অত্যাচার করে খুন করা হয়।
ঘটনাক্রম প্রমাণ করে শাসক দল হিসাবে বিজেপির একজন বিধায়ক কতখানি ভয়ঙ্কর ও প্রভাবশালী হতে পারে। একের পর এক প্রতিবাদের ঘটনায় এরপর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২০১৯ সালে বিচারে কুলদীপের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। ক্ষমতার দম্ভ ও প্রতাপের বিরুদ্ধে গিয়ে এই রায়ে মানুষ স্বস্তি পায়। কিন্তু সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্টের রায়ে সেই আস্থা, বিশ্বাস আজ আবার বড়সড় প্রশ্নের সম্মুখীন। হাইকোর্ট শর্ত সাপেক্ষে কুলদীপকে জামিন দিয়েছে। শর্তগুলি হল, নির্যাতিতার পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে তিনি যেতে পারবেন না। তাঁকে এলাকায় থাকতে হবে ও নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে। এ রকম দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজনৈতিক নেতা, যার শাগরেদ ও অনুগামীরা ছড়িয়ে আছে রাজ্যের নানা প্রান্তে, তাঁর উপর চাপানো মামুলি এইসব শর্ত নির্যাতিতার সুরক্ষায় কতটুকু কার্যকরী তা সহজেই অনুমান করা যায়। এই অবস্থায় নির্যাতিতা যখন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হচ্ছেন, তখন সিবিআইও অতি সক্রিয় হয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদনের দিকে যাচ্ছে।
সিবিআই-এর এ হেন ভূমিকায় নির্যাতিতা ও তাঁর আইনজীবীরা সহায়ক শক্তি হিসেবে সিবিআইকে পাশে পাওয়ার স্বস্তির বদলে আশঙ্কা করছেন, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের এজেন্ট হিসাবে সিবিআই সেঙ্গারকেই কার্যত সাহায্য করবে। অতীত অভিজ্ঞতা সে দিকেই ঠেলে! এই কেস চলাকালীন সিবিআই কুলদীপের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির কঠিন ধারায় মামলা না করে বিষয়টা লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। কুলদীপের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, বিচার প্রক্রিয়ায় দোষীর গুরুতর সাজা যাতে না হয়, সে জন্য ভূমিকা পালন করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার ও উত্তরপ্রদেশের সরকার নামীদামি আইনজীবীদের দিয়ে নির্যাতিতার পরিবারের নিরাপত্তা তুলে নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে। সিবিআই-এর এই ভূমিকা নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গে আর জি করের ঘটনাতেও সিবিআই-এর ভূমিকা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এতবড় ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে, প্রমাণ হাতে থাকা সত্ত্বেও সময়মতো অতিরিক্ত চার্জশিট জমা না দিয়ে দোষীরা যাতে জামিন পেয়ে যায়, কার্যত সেই ভূমিকাই পালন করেছে সিবিআই। উন্নাওতেও যে এটাই হতে চলেছে এটা আন্দাজ করা কঠিন নয়।
বুঝতে অসুবিধা হয় না, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সমর্থন না থাকলে এত বড় প্রভাবশালী নেতার এমন ভয়ঙ্কর অপরাধের ঘটনায় এ ভাবে জামিন হত না। জামিনের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তাতেই স্পষ্ট যে, এমন অপরাধীকে কোনও ভাবেই জামিন দেওয়া চলে না। কার্যত এই জামিন এক দিকে সরকারি বাগাড়ম্বরের স্বরূপ উন্মোচন করল, অন্য দিকে বিচারব্যবস্থাও ক্ষমতার পদতলে কতখানি নতজানু তা-ও সামনে এনে দিল।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দলবলের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’-এর গর্জন যে কতখানি ফোঁপরা, কুলদীপ সেঙ্গারের জামিন তা-ও সামনে এনে দিল। যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের জয়জয়কার অবিরাম বিজেপি-র নেতাদের মুখে শোনা যায়, নারীর নিরাপত্তা রক্ষায় সেই সরকার যে নেহাত অপদার্থ, উত্তরপ্রদেশের এই জঘন্য ঘটনায় তা-ও স্পষ্ট হল। সেঙ্গারের মতো দুষ্কৃতীকে দলের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তি দেওয়ার বদলে যে ভাবে সে রাজ্যের বিজেপি সরকার তার পিছনে দাঁড়িয়ে গেল, তাতে বিজেপি দলটির নৈতিক চরিত্রের আসল চেহারাটাও মানুষের সামনে আরও একবার নগ্ন হল।
পশ্চিমবঙ্গে অভয়া এখনও বিচার পায়নি। অভয়ার মা-বাবা মেয়ের বিচারের আশায় এখনও পথে পথে, দরজায় দরজায় হন্যে হয়ে ঘুরছেন। ৯-১৬ ডিসেম্বর মহিলাদের আহ্বানে নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত ও মর্যাদা রক্ষার, অঙ্গীকার যাত্রায় বিপুল জনতার সাথে তাঁরাও শামিল হয়েছেন। সমাপনী সমাবেশে অভয়ার বাবা বলছেন, রোজ সকালে ভাবি আজ যেন কোনও মেয়ের এ রকম সর্বনাশ হয়েছে শুনতে না হয়। সকলের সাথে এর প্রতিকার চেয়ে মুষ্টিবদ্ধ হাতে শপথ নিয়েছেন।
পশ্চিমবঙ্গে যখন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এই আন্দোলনের তরঙ্গে শামিল হয়েছে সুদূর পাহাড়, বনাঞ্চল থেকে সমুদ্র পারের মানুষজন, ঠিক তার কয়েক দিন পরেই খোদ দিল্লির বুকে, ইন্ডিয়া গেটের সামনে নিজের বিচার চেয়ে অবস্থানরত উন্নাওয়ের নির্যাতিতাকে টেনে হিঁচড়ে দিল্লি পুলিশ সরিয়ে দিয়েছে। শাসক দলের নেতাদের কটাক্ষ, ব্যঙ্গোক্তি বিদ্ধ করছে নির্যাতিতাকে। স্বভাবতই দেশের, সমাজের এই গভীর অসুখে প্রশ্ন ওঠে আর কবে মেয়েরা নিরাপত্তা পাবে? আর কবে, নারীরা সমাজে মাথা উঁচু করে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে? আর কবে?
আজ সময় এসেছে দেশ জুড়ে শহর-গ্রাম-পাড়া-মহল্লায়, প্রতিটি পরিবারের প্রত্যেক মানুষের এই প্রশ্নেই সোচ্চার হওয়ার, নারীর সুরক্ষা সুনিশ্চিত করার দাবিতে জোট বেঁধে পথে নামার। তবেই পরাক্রম কমবে ধর্ষক-দুষ্কৃতীদের। দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক দলগুলি বাধ্য হবে তাদের এইসব ‘দলীয় সম্পদ’দের মাথার উপর থেকে অভয়হস্ত সভয়ে সরিয়ে নিতে। তবেই এ সমাজকে নারীর মুক্ত নিশ্চিন্ত নিরাপদ পদক্ষেপের উপযুক্ত করে তোলা যাবে।