
পুরুলিয়াঃ ১১ ডিসেম্বর। বেলা ১২টা বেজে ৫ মিনিট। পুরুলিয়া ভিক্টোরিয়া স্কুলের সামনে থিক থিক করছে ভিড়। বাস, টোটো, বাইক দাঁড়িয়ে পড়ছে কিন্তু হর্ন বাজাচ্ছে না, কেউ বিরক্ত হচ্ছে না। দেখে একটু অবাকই হয়েছি, ভাবছি কী এমন হল! এমন সময় একটি সুসজ্জিত ট্যাবলো থেকে ঘোষণা শুরু হল– আমরা এক বিপন্ন সময়ের মধ্যে চলেছি, সমাজের অর্ধেক আকাশ পুড়ছে, বাকিটা ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছে। নারীর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। কিন্তু আর নয়। এ বার উঠে দাঁড়ানোর সময় মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে। আসুন আমরা জোট বাঁধি, লড়াই করি। সাদা নিশান হাতে হাজার হাজার মহিলা দৃপ্ত পদক্ষেপে স্লোগান দিয়ে এগিয়ে আসছেন। সবাই যে স্লোগান দিতে পারছেন বা ঠিক ঠিক গলা মেলাতে পারছেন এমন নয়, কিন্তু এক অদ্ভুত তেজ, বিরাট ইচ্ছাশক্তি, যেন পারতেই হবে এমনই দৃঢ়তা। ওঁরা অঙ্গীকার যাত্রায় হাঁটছেন।
সত্যি অঙ্গীকার যাত্রাই বটে। মিছিলে হাঁটছেন অধ্যাপক, আইনজীবী, কলেজ ছাত্রী, গৃহবধূ, পরিচারিকা– কে নেই? ধান কাটার কাজ ছেড়ে দিয়ে অযোধ্যা পাহাড় থেকে এসেছেন একদল গৃহবধূ। পাহাড়তলি নুনিয়া, তানসি, গন্ধবাজার সহ সিরকাবাদ অঞ্চলের প্রায় ৫৮০ জন মহিলা এসেছেন ১২টি গাড়ি রিজার্ভ করে। তার মধ্যে একটি গ্রাম থেকেই দেড়শো জন আদিবাসী মহিলা এসেছেন। সুদূর বাঘমুণ্ডি থেকে দুটি গাড়িতে করে মহিলারা এসেছেন। সকাল ৭টায় তাঁদের গাড়ি ছেড়েছে। পুরুলিয়ার গ্রামে গ্রামে মদবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছে। সেই আন্দোলনকারীদের অনেকেই এ মিছিলে পা মিলিয়েছেন। ধান কাটা, ধান ঝাড়ার কাজ ছেড়ে তাঁরা যেমন এসেছেন, তেমনই এসেছেন পরিচারিকার কাজ ছেডে, গৃহবধূরা এসেছেন গৃহকর্ম করে। এ মিছিল যেন পুরুলিয়ার যথার্থ অর্ধেক আকাশ। ভিক্টোরিয়া স্কুলের সামনে থেকে মিছিল পায়ে পায়ে এগিয়ে চলে জেলা স্কুল মোড, জেলখানা মোড, হাটের মোড় দিয়ে ট্যক্সিস্ট্যান্ড। সেখানে মহতী সমাবেশে সঙ্গীত ও নৃত্যের অনুষ্ঠান হয়। ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ গানের উপর নৃত্য পরিবেশিত হয়। অভ্যর্থনা সমিতির পক্ষ থেকে অঙ্গীকার যাত্রীদের প্রতি উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। চিত্রশিল্পীরা লাইভ পেন্টিংয়ের মধ্য দিয়ে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। পথনাটিকা, গান, নৃত্য, যোগা, সেলফ ডিফেন্স সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। বক্তব্য রাখেন আর জি কর আন্দোলনের অন্যতম নেতা ডাঃ আসফাকুল্লা নাইয়া, অঙ্গীকার যাত্রার রাজ্য আহ্বায়ক ভাস্বতী মুখার্জী সহ জেলার বহু বিশিষ্ট মানুষ।