Breaking News

সুরক্ষার দাবিতে অনন্য সংগ্রামের পথে নারীরা

কাকদ্বীপ-জয়নগর-বারুইপুরঃ হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা। সবে সূর্যের তেজ একটু বেড়েছে। পাকা ধানের আল বেয়ে মেয়েরা পৌঁছে যাচ্ছেন অঙ্গীকারের কথা নিয়ে কৃষক রমণীদের কাছে। সব শোনার পর মধ্যবয়সী এক শ্রমজীবী মহিলা বলে ওঠেন ‘তোমাদের কথা আর আমার বহু দিনের ইচ্ছা মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। তুমি সন্ধ্যার সময় এক বার এসো। অনেক মেয়েদের জোটাব।’

কৌতলা এলাকার এক গ্রামে ব্রেন স্টে্রাকে আক্রান্ত এক দিদি ঘরের বারান্দায় শুয়ে একটি আবেদনপত্রে চোখ বোলাচ্ছেন, আর জড়ানো কণ্ঠে বলছেন, ‘আমার শরীর চলে না, কিন্তু বাড়ির সব মেয়েদের বলো। আমি ক’দিন সামলে নেব, বৌমারা যাবে’। অঙ্গীকার যাত্রা নিয়ে এমনই আকুতি! ইতু পুজোর কারণ দেখিয়ে ১৬ ডিসেম্বর কলকাতার মিছিলে না আসার কথা বলছিলেন এক দিদি। জটলা চলছিল পাড়ার স্নানের ঘাটে। ভিড়ের মধ্যে থেকে এক অল্পবয়সি গৃহবধূ বলে ওঠেন, ‘আর রিতু (ইতু) পুজো! কী হবে এ সব করে? মেয়েদের অত্যাচার করছে, মারছে। বুক ফেটে যায়। বিচার নেই। না না, আমি যাব।’ আমতলা-বিষ্ণুপুরের এক স্কুলের দিদিমণি অঙ্গীকার যাত্রার আবেদন শুনে ছাত্রীদের ডেকে বললেন, ‘তোমাদের সঙ্গে এঁরা কথা বলতে এসেছেন। কথাগুলো যা বলবেন, ভেবে দেখো’।

রাজ্যব্যাপী অঙ্গীকার যাত্রার ষষ্ঠ দিন ১৪ ডিসেম্বর কাকদ্বীপ থেকে অঙ্গীকার যাত্রা লক্ষ্মীকান্তপুরের পোলেরহাট অতিক্রম করে অগ্রসর হচ্ছে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রৌঢ়া তার পাশের জনকে বললেন, আমরা তো তীর্থযাত্রার কথা শুনেছি, এটা আবার কী যাত্রা? তিনি বললেন, আরে এটা কোনও ধর্মীয় ব্যাপার নয়। এটা অঙ্গীকার যাত্রা। তার মানে? তার মানে ওই দেখছ না, ওদের জামায় লেখা আছে এরা নারীর মর্যাদা রক্ষার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে। প্রৌঢ়া বললেন– মা গো মা, আর কত দেখব। ওদিকে প্রধানমন্ত্রী বলছে ‘বেটি পড়াও, বেটি বাঁচাও’। তা বেটি তো পড়ছে অনেক, বাঁচছে কই? এমনই কত অভিজ্ঞতা উঠে এল। অনেক পথ পেরিয়ে অঙ্গীকার যাত্রীরা এসে পৌঁছলেন বহু সামাজিক লড়াইয়ের পীঠস্থান জয়নগরে। ঐতিহ্যমণ্ডিত শান্তি সংঘ তার হৃদয়ের উষ্ণতা দিয়ে অঙ্গীকার যাত্রীদের যেন অভিনন্দন জানাল। সংঘের সদস্যরা পুষ্পস্তবক দিয়ে অভিবাদন জানানোর পর মিছিল এগিয়ে চলল থানার মোড়ের দিকে। একজন অশীতিপর বৃদ্ধ এই কর্মসূচিকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন– নারী যে অর্ধেক আকাশ! এই সমাজের কালো মেঘ তাকে ঢেকে রেখেছে। তোমরা তাকে আলোকিত করতে এই যাত্রা শুরু করেছ। এগিয়ে যাও, একদিন বিজয়ী হবেই।

১৫ ডিসেম্বর অঙ্গীকার যাত্রীদের বর্ণাঢ্য পদযাত্রা বারুইপুর রাসমাঠ থেকে শুরু হয়ে শহর পরিক্রমা করে রেল ময়দানে সমবেত হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে, ভাষণ শুনতে সেখানে বহু মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

প্রশাসন শাসকের দাসত্ব করছে। সমাজকে মদে আসক্ত করে রেখেছে। অঙ্গীকার যাত্রীরা স্মরণে রেখেছেন নবজাগরণের পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রাণান্তকর লড়াই, নারী শিক্ষা প্রবর্তনের সংগ্রামকে, মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবন ও শিক্ষাকে। মিছিল থেকে তাই শোনা যায়– যাত্রা যত এগোবে“শাসক তত পেছোবে।