Breaking News

বেকারত্বের সংজ্ঞাই বদলে দিল বিজেপি সরকার

বেকারের সংখ্যা নিয়ে কারচুপি এর আগে কংগ্রেস আমলেও দেখা গেছে। এ বার আর সংখ্যা নিয়ে কারচুপি নয়, বেকারত্ব পরিমাপের মাপকাঠিটাই বদলে দিল বিজেপি সরকার। সপ্তাহে এক ঘণ্টার কাজ জুটলেও তাকে আর বেকার বলে ধরা হবে না। রোজগেরের তালিকায় তার নাম ঢুকে যাবে! কর্মসংস্থানের আসল চিত্রটা ঢাকতে এমন বেনজির সিদ্ধান্ত বোধহয় বিজেপি নেতাদের উর্বর মস্তিষ্কেই সম্ভব! সরকার চাকরি দিতে পারছে না, কল-কারখানায় ছাঁটাই, কুছ পরোয়া নেই। সপ্তাহে এক ঘণ্টা যে কোনও একটা কাজ করলেই আর সে বেকার নয়। বেকারের সংজ্ঞা বদলাতে সরকার ঢাল করেছে ‘কারেন্ট উইকলি স্ট্যাটাস’ পদ্ধতিকে।

কলমের খোঁচায় বেকারত্বের সংজ্ঞা বদলে দিলেই বেকারের সংখ্যা কি সত্যিই কমে যায়? বাস্তবটা কী? লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেটের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশের হাতে কাজ নেই। সিএমআইই-তথ্য বলছে, গত মার্চ মাসেই শুধু ৪২ লক্ষের কাজ চলে গিয়েছে। এমন ভুরি ভুরি তথ্য সরকারের নিজের হাতেই মজুত। তার জন্যই কি প্রতারণার পথ নিচ্ছে বিজেপি সরকার?

কাগজে-কলমে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ার্কিং আওয়ার হল, সপ্তাহে ৪০-৪৪ ঘণ্টা কাজ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এবং আইএলও-র ২০১৬ রেকর্ড বলছে, ওই সময় থেকেই ১০ জনের মধ্যে একজন কর্মী সপ্তাহে ৫৫-৬০ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করতে বাধ্য হন। এমনকি লম্বা সময় কাজ করতে বাধ্য হয়ে বিশ্বে বছরে ৭ লক্ষ ৪৫ হাজার মানুষ হার্টের রোগে বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারাও যান। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কাজের অনিশ্চয়তার জন্য ঘণ্টার হিসাব না রেখেই কাজ করতে বাধ্য হন মানুষ। এখন মোদি জমানায় চারটি শ্রমকোড চালু করে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ১২-১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত করা হয়েছে। একদিকে শ্রমসময় বৃদ্ধি, মাইনে ছাঁটাই, অন্য দিকে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে নির্বিচারে। এখন আবার বেকার-ছাঁটাই। সপ্তাহে একদিন কোথাও ইলেকট্রিক বালব লাগানোর বা মাটি কাটার কাজ করলেও তাকে রোজগেরে হিসাবে ধরা হবে। চরম ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারের এই ‘সহজ সমাধান’ সাধারণ ঘরের বেকার যুবকদের বিপাকে ঠেলছে। বিপন্ন হচ্ছে গোটা পরিবার।

‘এক ঘণ্টা = ফুল জব’ মোদিজির এই ‘পাকা’ বন্দোবস্তে দেশে আর কোনও বেকারই থাকবে না! তিনি অবশ্য বলেননি, ‘ফুল জব’ ধরা হলে এই একঘণ্টার জন্যই পুরো সপ্তাহের ‘ফুল’ মজুরি দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার করবে কি না! কোনও রকমে বেঁচে থাকার চেষ্টায় যে কোনও মজুরিতে, যেখানেই হোক কাজ করতে বাধ্য হয় বিরাট সংখ্যক মানুষ। আর কায়িক শ্রমজীবী মানুষ সপ্তাহের প্রতিটি দিনই অত্যন্ত কম মজুরিতে হলেও কাজ করতে বাধ্য হন। এখন এই বন্দোবস্তে সরকারের আর কাজ দেওয়ার দায়িত্বই রইল না।

ক্ষমতায় আসার আগে বছরে দু’কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। একটানা ১১ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মোদির ‘বিকশিত ভারতে’ সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা– বেকারত্ব বাড়ছে লাফিয়ে। লক্ষ লক্ষ মানুষের কাজ চলে যাচ্ছে। ২০১৯-এ খোদ সরকারি রিপোর্টেই প্রকাশ হয়েছে, দেশে বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বাধিক। বেকারের সংখ্যা এত বাড়ছে যে, জুন মাসে গত বছরের তুলনায় ৪.৫ শতাংশ বেশি পরিবার ১০০ দিনের প্রকল্পে কাজের আবেদন করেছেন। এই অবস্থায় বেকারত্বের সংজ্ঞা বদল কি আপামর দেশবাসীর সাথে প্রতারণা নয়?

জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটা সরকারের দায়িত্ব কী? সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব হল, প্রতিটি নাগরিকের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার সুষ্ঠু রোজগারের ব্যবস্থা করা। তা কি পালন করছে সরকারগুলি? মানুষের দু’বেলা খেটে খাওয়ার মতো রোজগারের ব্যবস্থাও করতে পারছে না সরকার। এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে সরকারি ব্যর্থতা ঢাকতেই বেকারত্বের সংজ্ঞা বদল। তাতে কি বেকারত্বের জ্বালা এতটুকু দূর হবে? পেট বড় বালাই। অর্থনৈতিক সঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে দাবি করবে– কাজ দাও, চাকরি দাও, ন্যায্য মজুরি দাও। সংজ্ঞা বদলে বেকারদের আপাতত ধোঁকা দিলেও ক্ষোভের আগুন নেভাতে এর বিরুদ্ধে মানুষ মাথা তুলবেই।