Breaking News

সাধারণ মানুষ ইংরেজি শিখলে অমিত শাহরা ‘লজ্জা’ পান কেন

 

তাঁদের লজ্জা কি শুধু দেশবাসী ইংরেজি শিখলেই! কেন হঠাৎ অমিত শাহদের এমন ভাবনা? কারণ, তাঁরা ভালই জানেন যে, ইংরেজির মাধ্যমে যথার্থ আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের আলোকপ্রাপ্ত সচেতন জনগোষ্ঠীর সংগ্রামী চেতনা গড়ে ওঠার মধ্যেই রয়েছে তাঁদের মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজদের মৃত্যুবাণ।

ইংরেজিকে গুরুত্বহীন করার ধারাবাহিক চেষ্টা

উনিশ শতকে রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমুখের অবিস্মরণীয় সংগ্রামের পথ বেয়ে পরাধীন ভারতে ইংরেজি ভাষা ও তার মাধ্যমে আধুনিক শিক্ষার প্রসারের ফলে নবজাগরণ এবং তার ধারাবাহিকতায় বিশ শতকে গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল। সে দিন ব্রিটিশ শাসক ভারতীয়দের ইংরেজি শেখাতে চায়নি। চেয়েছিলেন এ দেশের মনীষীরা। এই স্বাধীনতা সংগ্রামে কিন্তু বিজেপির অভিভাবক আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার কণামাত্র অবদান ছিল না। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়, তাদের লক্ষ্য ছিল মুসলমান বিরোধিতা।

সেই কারণে তারাও সেদিন ইংরেজি শিক্ষা পরিত্যাগের দাবি তুলেছিল। কেন না তারা জানত, ইংরেজি শিখে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান-দর্শনে শিক্ষিত হলে একটি জাতিকে ধর্মান্ধতার ভিত্তিতে একজোট করা কঠিন হবে। তবে এ দোষে শুধু উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাই দুষ্ট ছিল না, মুসলিম মৌলবাদী এবং কংগ্রেসের আপসমুখী নেতাদের অনেকেরই মনোভাব ছিল এই রকমই। স্বাধীন ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র রূপে গড়ে তোলার কথা সংবিধানে লেখা থাকলেও বহু-ভাষাভাষী ভারতে সাধারণ মানুষকে ইংরেজি শিখতে না দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হয় স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর আমল থেকেই। কেন না, স্পষ্টতই, আপামর সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা ও আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার সুযোগ উন্মুক্ত থাক এটা বিপ্লবভীত ভারতীয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং তার সেবাদাস কংগ্রেস সরকার চায়নি।

স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চেষ্টা হয়েছে সারা দেশে নির্বিচারে সংযোগকারী ভাষা হিসাবে ইংরেজির বদলে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার।

ইংরেজির প্রশ্নে সব শাসক দল এক সারিতে

 পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্মরণে আছে, ১৯৭৭ সালে সিপিআইএম পরিচালিত সরকারক্ষমতায় বসেই শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি এবং পাশ-ফেল তুলে দিয়েছিল। তখন তাদের নেতারাও যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ‘ইংরেজি বিদেশি ভাষা, ইংরেজি শিখতে চাওয়া বিদেশির গোলামির মানসিকতা’ এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল মার্ক্সবাদবিরোধী। এর বিরুদ্ধে এসইউসিআই(সি) সারা রাজ্যের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও শিক্ষানুরাগী মানুষদের সংগঠিত করে সুদীর্ঘ উনিশ বছর আন্দোলন পরিচালনা করে ইংরেজি ফিরিয়ে আনে। তখন আমরা বারবার দেখিয়েছিলাম যে, ইংরেজি শুধু উন্নত জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার জন্য প্রয়োজনীয় তাই-ই নয়, ঐতিহাসিক কারণেই এ দেশে এই উন্নত আন্তর্জাতিক ভাষাটি সর্বভারতীয় যোগাযোগের ভাষা বা লিংক ল্যাঙ্গুয়েজ এবং অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে সারা দেশেই গৃহীত হয়েছে। এতে আমাদের ক্ষতি হয়নি, লাভই হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘ইংরাজ হইতে এদেশের যত উপকার হইয়াছে, ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্য তাহার মধ্যে প্রধান। অনন্তরত্নপ্রসূতি ইংরাজি ভাষার চর্চা যত হয় ততই ভালো’। নবজাগরণের অন্যান্য অনেক মনীষীদের অনুরূপ বক্তব্যও এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করে রাজ্যবাসীর কাছে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এসব যুক্তিতে কর্ণপাত না করে সে দিন সিপিএম-ফ্রন্ট সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুল থেকে ইংরেজি তুলে দেন। যদিও তাঁদের অধিকাংশই নিজেদের সন্তান-সন্ততিদের পড়াতে শুরু করেন বেসরকারি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে। এমনকি সিপিএম নেতাদের অনেকে নিজেরাই ইংরেজিমাধ্যম স্কুল খোলা শুরু করেন। বস্তুত, ইংরেজি ও পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার পর এ রাজ্যে বেসরকারি স্কুল স্থাপন করে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসার দিগন্ত খুলে যায়। এরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে বহু সরকারি প্রাথমিক স্কুল ছাত্রশূন্য হতে হতে ধীরে ধীরে উঠে যায় এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রায় সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলোতেও ছাত্র কমছে। শুধু উচ্চবিত্তই নয়, মধ্যবিত্ত এমনকি কিছু নিম্নবিত্ত ঘরেরও সন্তানদের ভর্তি করতে অভিভাবকদের প্রথম পছন্দের স্কুল হয়ে উঠেছে ইংরেজিমাধ্যম বেসরকারি স্কুল।

রাজীব গান্ধীর শিক্ষানীতিতেও ইংরেজি ছিল গৌণ

১৯৮৬ সালে রাজীব গান্ধীর প্রধানমন্ত্রিত্বে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকার যে নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি প্রবর্তন করে, তাতেও বলা হয়েছিল, সাধারণ সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ছাত্ররা শুধু মাতৃভাষা, সহজ কিছু গণিত ইত্যাদি শিখবে। কিন্তু দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘মডেল স্কুল’ বা ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’ গড়ে তোলা হবে যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু ছাত্রকে ইংরেজি সহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বোত্তম শিক্ষা দেওয়া হবে। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে, শুধু বিজেপির অমিত শাহই নন, যখন যে দলই কেন্দ্রীয় সরকারে বসেছে, তারা প্রত্যেকেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বাহক ইংরেজির বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়েছে এবং ইংরেজি শিক্ষাকে সঙ্কুচিত করেছে।

ইংরেজি বিরোধিতার কারণগুলি

অমিত শাহদের ইংরেজি বিরোধিতার কারণ মূলত চারটি। প্রথমত, সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়েরা যাতে উচ্চশিক্ষা এবং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের সুযোগ না পায়, ফলে উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষান্তে চাকরির যতটুকু সীমিত সুযোগ আছে তাও যেন শুধু ধনী ঘরের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত করে ফেলতে সুবিধে হয়। দ্বিতীয়ত, যাতে শিক্ষার ব্যবসায়ীকরণের পথ অবাধ হয় এবং তৃতীয়ত, ইংরেজির বদলে হিন্দি চাপিয়ে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ স্লোগানের আড়ালে হিন্দুত্বের বাহনে মুসলমান বিদ্বেষ এবং অন্ধ উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষ সমাজমননে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে হিন্দিবলয়ে ভোটে বাজিমাত করা যায়। চতুর্থত, ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনে শিক্ষিত হয়ে যুবসমাজ পুঁজিবাদী শোষন-নিপীড়ণ অবসানকল্পে বিপ্লবী গণআন্দোলনে সংগঠিত হতে না পারে। অবশ্যই তাঁরা নিজেদের সন্তানদের ব্যয়বহুল বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াবেন। তারা ইংরেজিতে বাড়িতে কথা বললেও লজ্জিত না হয়ে গৌরববোধ করবেন। এই ইংরেজি এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ধনী-মন্ত্রী ও উচ্চ আমলাদের সন্তানরাই হবে ভবিষ্যত ভারতের শাসক এবং শোষণমূলক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সেবক। এরাই নানা সরকারি হোমরা চোমরা হয়ে ইউরোপ আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।

স্বয়ং অমিত শাহেরই পুত্র জয় শাহ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়েছেন। মন্ত্রীমশাই বলতে পারবেন কি, জয় শাহ সেখানে হিন্দিতে আলাপচারিতা করেন, নাকি ইংরেজিতেই অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন? এ জন্য তাঁর মহান হিন্দিপ্রেমী পিতৃদেবের লজ্জায় মাথা কাটা যায় কি?

একদিকে শিক্ষার সার্বিক গৈরিকীকরণের মাধ্যমে সনাতন হিন্দু ধর্ম, তার কুসংস্কার, পরধর্মবিদ্বেষ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, যুদ্ধোন্মাদনার মারাত্মক বিষ সমাজমননে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তারই পরিপূরক করে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বাহন ইংরেজি শিক্ষাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার এ এক মারাত্মক ষড়যন্ত্র। বাংলা এর কুফল বুঝেছে। ভারত সাবধান।