দেশের বদনাম করছে সরকার, কৃষকরা নয়

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রখ্যাত কিছু ব্যক্তিত্ব দিল্লির কৃষক আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোয় গোঁসা হয়েছে বিজেপি এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলাদের। তাঁরা এখন সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ, পপ সঙ্গীত তারকা রিহানা, অস্কারজয়ী সিনেমা তারকা সুজান সারান্ডন প্রমুখ ‘খালিস্তানি’ কি না তা নিয়ে মাথা ঘামাতে ব্যস্ত। কোনও এক কানাডাবাসী খালিস্তান সমর্থকও নাকি কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন বলে সরকার খুঁজে বারও করে ফেলেছে! অতএব গোটা আন্দোলনটাই হয়ে গেল ‘খালিস্তানিদের চক্রান্ত’! আর কৃষকরা সব দেশবিরোধী!

অপূর্ব যুক্তিধারা সন্দেহ নেই! আর বিজেপি আইটি সেলের জোর গলা যখন আছে, তখন এটাকেই সত্য বলে মেনে না নিয়ে আর কী উপায় আছে! তারা যে রব তুলেছে তার পিছনেই দেশকে ছুটতে হবে!

এই কাজে নেমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার শচীন তেণ্ডুলকর, লতা মঙ্গেশকরের মতো কিছু বিখ্যাত নামের আড়াল নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ মাঠে মারা গেছে। যে সেলিব্রিটিদের টুইটকে সরকার ঢাল করে বাঁচতে চেয়েছিল, সেটাই ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে গিয়ে তাদেরকেই বিঁধছে। এঁদের কেউ কেউ অসুস্থ ও প্রায় ঘরবন্দি। তবুও দেশের নানা প্রান্তে বসে তাঁরা একই বা প্রায় একই বয়ানে কী করে টুইট মন্তব্য লিখলেন, তা অবাক করেছে মানুষকে। অপরাধ বিজ্ঞান যে বলে, মহা ধূর্ত অপরাধীও কিছু না কিছু ভুল করে বসে এবং তাতেই ধরা পড়ে। এখানেও বিজেপির আইটি সেল বয়ান সাপ্লাই দেওয়া অথবা নিজেরাই বেনামে তা ছাড়ার সময় একটা ভুল করে ফেলেছে। এর পিছনে যে একটাই মাথা কাজ করেছে, কোনও সেলিব্রিটির নিজের মাথা নয়, তা ধরা পড়ে গেছে।

মনে পড়ছে কি, ২০১৯-এ কলকাতায় অমিত শাহের মিছিলের লোকজন বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার পর বিজেপির আইটি সেলের তৈরি সোস্যাল মিডিয়াতে সেই বিখ্যাত পোস্টটির কথা! প্রায় দু’হাজার জনের নামে হুবহু একই বয়ানে লেখা হয়েছিল– আমি বিদ্যাসাগর কলেজের প্রাক্তন ছাত্র, আমি এই কলেজের পাশেই থাকি, এরপর ছিল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে নিজেকে দাবি করে হুবহু একই বয়ান। সম্প্রতি ‘আমি একজন ক্ষুদ্র কৃষক’ এই মর্মেও একেবারে হুবহু এক বয়ানে সোস্যাল মিডিয়া পোস্টের কারসাজি মানুষের চোখ এড়ায়নি। ফলে এ ক্ষেত্রেও কী ঘটেছে তা বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। তবে সরকারকে, বিশেষত বিজেপি সরকারের মতো চরম অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট মনোভাবাপন্ন সরকারের রোষের হাত এড়াতে এঁরা কেউই হয়ত সত্যিটা বলতে পারবেন না। মনে রাখা ভাল সেলিব্রিটিদের অধিকাংশই বর্তমান বা প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সচিব হলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র। বোর্ডকে চটালে রোজগারে টান পড়ার সমস্যা তাঁদের ভাবায় বৈকি। আজকের ফিল্ম এবং সঙ্গীত সহ সমস্ত শিল্পের বাজার পুরোপুরি কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত। এই ক্ষেত্রে মালিকদের বিরুদ্ধে যাওয়া যে কোনও কণ্ঠস্বরকে দাবিয়ে দেওয়া, হেনস্থা করা, শিল্পী চিত্রতারকাদের কাজ বন্ধ করা, তাঁদের অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া অতি সাধারণ ঘটনা।

খ্যাতি এবং অর্থ রোজগারে বড় মানেই মহৎ শিল্প স্রষ্টা নন। মহৎ শিল্প সৃষ্টির সাথে জড়িয়ে থাকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জীবনের দাবিকে তুলে ধরা। এ কাজে সরকারের নেকনজর নাও জুটতে পারে। কর্পোরেট পুঁজির চাহিদার সাথে সংঘাত এ ক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী। এই পরিস্থিতিতে কর্পোরেট প্রভুদের চটানোর বদলে তাদের নেক নজরে থাকাই তাঁরা অনেকে ভাল বলে মনে করেছেন। ভারতীয় সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, শিল্পমাধ্যমে আজ যথার্থ সৃষ্টিশীল কাজের অভাব। ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী শাসক এবং সর্বগ্রাসী একচেটিয়া পুঁজির পরানো বেড়ির সাথে সংঘাতের সাহসের অভাব এর অন্যতম কারণ।

আশার কথা, দেশের কৃষকদের এভাবে দেশদ্রোহী হিসাবে দাগিয়ে দেওয়ার কাজে তাঁদের জড়িয়ে দেওয়াকে মানুষ মেনে নেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়াতে হাজার হাজার প্রতিবাদী কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যখন ১৭০ জনেরও বেশি কৃষক প্রাণ হারালেন সরকারের অসহযোগী ভূমিকার কারণে, তখন একবারও এই সেলিব্রিটিরা মুখ খোলার সময় পেলেন না কেন? কেন তাঁরা সরকারকে বলতে পারলেন না, যাদের উপকারের নামে তোমরা আইন পাল্টেছ সেই কৃষক সমাজ যখন তাঁদের সর্বনাশকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন, তা শোনার মতো মন তোমাদের নেই কেন? তাঁরা একবারও সরকারকে বলতে পারলেন না, কৃষি আজও দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা, এই কৃষিই দেশের মানুষের অন্ন-বস্ত্রের যোগান দেয়। তাকে একচেটিয়া মালিকদের মর্জির উপর ছেড়ে দেওয়ার সর্বনাশা নীতি তোমরা পুরোপুরি বাতিল কর! কেন এই নীরবতা?

আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হল, কোনও দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, কৃষক-শ্রমিকের লড়াই নিয়ে অন্য দেশের মানুষ মন্তব্য করতে পারবেন না কেন? বিদেশনীতির কূটনৈতিক প্রোটোকল এক কথা, আর দেশে দেশে সাধারণ মানুষ, গণতন্ত্র সচেতন মানুষ, সমাজ কর্মী, পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী তাঁরা কি দেশের গণ্ডির বাইরে গিয়ে চিন্তার অধিকার হারিয়েছেন? তাহলে রাশিয়ায় বিরোধী নেতাকে গ্রেপ্তারের পর যে বিক্ষোভ প্রতিদিন হচ্ছে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তা প্রচার করছে কেন? দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণ বিদ্বেষ বিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবি যখন ভারতীয়রাও করেছিলেন, তাঁরা কি অন্যায় করেছিলেন? ভিয়েতনামে মার্কিন অত্যাচারের বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণের লড়াইকে ভারতীয়রা সমর্থন করে অন্যায় করেছেন? এই ভারতের জনগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়ে যখন পাকিস্তান সরকারের বিরোধিতা করেছে, পাকিস্তান সরকার এবং আমেরিকা তাকে নাক গলানোই বলেছে। শোষক-শাসকের ভাষা এটাই। কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করা নাক গলানো হলে আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে নরেন্দ্র মোদী ‘অবকে বার ট্রাম্প সরকার’ আওয়াজ তুলে অন্য দেশের নির্বাচনে নাক গলাতে গেলেন কেন? কেনই বা ট্রাম্প সাহেবকে আমেদাবাদে ডেকে তাঁকে দিয়ে নরেন্দ্র মোদিকেই আবার জেতানোর আহ্বান তোলানো হল? আসলে কৃষক আন্দোলনের সামনে যুক্তি হারিয়ে প্রলাপ বকছেন তাঁরা।

ভারতীয় কৃষক সমাজ যে ঐতিহাসিক আন্দোলন পরিচালনা করছেন, তা দেশের গৌরব বাড়িয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে দেশটা মরেনি। দেশ মানে তো একখণ্ড মাটি এবং ধরাচূড়া পরা কিছু সামরিক অফিসার, মিলিটারি, পুলিশ, আমলা আর কিছু নেতা-মন্ত্রী নয়। দেশ কথাটার অর্থ দেশের জনগণ। সেই জনগণ যখন একটা স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, শাসকের চোখে চোখ রেখে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবি জানায় তা সূচিত করে তাঁদের শক্তি, গণতান্ত্রিক বোধ। শাসকের কাছে তা যতই অস্বস্তির কারণ হোক না কেন, এটাই দেশের প্রকৃত শক্তির পরিচয়। এই পরিচয় প্রমাণ করে দেয় এ দেশের ধমনীতে আজও ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, আসফাকুল্লা খান, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুদের মতো মহান সংগ্রামীদের রক্ত ধাবমান। শাসক পুঁজিপতি ও তার সেবাদাস বিজেপির কাছে তা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে, দেশের মানুষের কাছে তা গর্বের। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খ্যাতিমান ওই মানুষগুলি ভারতের এই চরিত্রকেই কুর্নিশ জানিয়েছেন।

দেশকে অসম্মান যদি কেউ করে থাকে, তা করেছে বিজেপি এবং তাদের পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার। প্রতিবাদী কৃষকদের তারা দেশদ্রোহী, খালিস্তানি, টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং– কী না বলেছে! শেষে তো ক্ষিপ্ত হয়ে কৃষকদের ‘পরগাছা’ পর্যন্ত বলে দিল। কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করার অপরাধে গ্রেটা থুনবার্গের কুশপুতুল পুড়িয়েছে বিজেপি-আরএসএস, এক ব্রিটিশ অভিনেত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছে তাদের মতাবলম্বী কেউ কেউ। এতে দেশের সম্মানই ক্ষুণ্ন হয়েছে। কৃষক আন্দোলন দমন করতে ধরনাস্থল ঘিরে কাঁটাতার, কংক্রিটের দেওয়াল, পরিখা গড়ে যুদ্ধক্ষেত্রের রূপ দিয়েছে সরকারই। কৃষকদের জল, আলো শৌচালয়, চিকিৎসার সুযোগ বন্ধ করেছে সরকার। কৃষক নেতাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের মামলা দিয়েছে। যে সাংবাদিকরা পুলিশের অত্যাচার এবং কৃষকদের উপর আক্রমণ করতে যাওয়া আরএসএস-বিজেপি কর্মীদের হিংস্র রূপ তুলে ধরেছিলেন, তাঁদেরও দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু এক্ষেত্রেই নয়, সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনকারী এবং তাদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, জামিয়া মিলিয়া ও জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা চালানোর কাজে মদত দিয়েছে সরকার এবং দিল্লি পুলিশ। এগুলো ভারত রাষ্ট্রের কী পরিচয় দেয়? এ পরিচয় তো ফ্যাসিস্টের! এ পরিচয় গণতন্তে্রর পক্ষে লজ্জার।

লজ্জার চিত্র আরও আছে। ডাক্তার কাফিল খানের মতো মানবদরদি চিকিৎসককে জেল খাটাতে সরকার উঠেপড়ে লেগেছে। আরএসএস-বিজেপির চিন্তাধারার বিরোধী বুদ্ধিজীবী গোবিন্দ পানসারে, আরএস কুলবার্গি, গৌরী লঙ্কেশদের খুন করেছে তাদের আরএসএস ধর্মান্ধরা। গো-রক্ষার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, দলিতদের পিটিয়ে মেরেছে এই বাহিনী। তাদের মদতেই ৫০০ বছরের পুরানো সৌধ বাবরি মসজিদ ভেঙেও পার পেয়ে যায় দুষ্কৃতীরা। বিশ্ব দেখল, ভারতের বিচারব্যবস্থা প্রাচীন সৌধ ভাঙা ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অপারগ। এগুলি কি দেশের সম্মান বাড়িয়েছে না ক্ষুণ্ন করেছে?

সারা দুনিয়ার কাছে আরএসএস-বিজেপি যে ভারতের পরিচয় তুলে ধরেছে তা হল ধর্মান্ধ, সংখ্যালঘু বিদ্বেষী, জাতপাত-ধর্ম-বর্ণ নিয়ে বিভাজিত, গণতান্ত্রিক বোধের প্রতি চরম শ্রদ্ধাহীন এক ভারত। এ ভারত যেন ভুলে যেতে চায় তার প্রাচীন শিল্প-সাহিত্যে প্রতিফলিত বিশ্বকে আপন করার বাণী। যে ভারত যেন ভুলতে চায় অসংখ্য নদী বিধৌত তার উর্বর ভূমির মতো তার সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু মতের ধারায়। এ ভারত যেন ভুলতে চায়, রামচরিত মানসের স্রষ্টা তুলসীদাস লেখেন, বিশ্রাম নেব মসজিদে গিয়ে। এই ভারত যেন ভুলতে চায়, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, জ্যোতিবারাও ফুলে, সুব্রহ্মণম ভারতী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধায়, মুন্সি প্রেমচাঁদ, কাজি নজরুল ইসলাম, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুদের ঐতিহ্যকে। বিজেপির হাত ধরে ভারতের এই বিচ্যুতির সূচনা সত্যিই লজ্জার। ভারতের এই মুখ বিশ্বের কাছে তার সম্মান বাড়ায়নি, বরং তা হরণ করেছে। এর থেকে দেশকে বাঁচাতেই হবে। আজ গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদী শাসনধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে কৃষক সমাজ বিশ্বকে যে বার্তা দিয়েছে, তাতে প্রমাণিত অন্ধকারের মধ্যে আশার আলোর রূপালি রেখা আজও হারিয়ে যায়নি। সেই বার্তাই ভারতের পক্ষে প্রকৃত মর্যাদার। যে মর্যাদা রক্ষা করেছেন প্রতিবাদী কৃষকরা।