
সম্প্রতি রাজ্যে সরকার এক নির্দেশিকা জারি করে পঞ্চায়েত ট্যাক্স বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করেছে। বলা হয়েছে, ভাল পঞ্চায়েত পরিষেবা দেওয়ার জন্য এই ট্যাক্স বৃদ্ধির ঘোষণা। এত দিন গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় পরিবার পিছু গড় ট্যাক্স ছিল ২৩৩ টাকা। এ বারের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে এই ট্যাক্স বেড়ে পরিবার পিছু ন্যূনতম ১২০০ টাকা হবে। শুধু তাই নয়, নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, এবার থেকে পঞ্চায়েত ট্যাক্স বাকি রাখা চলবে না। তিন সপ্তাহের মধ্যে নির্ধারিত ট্যাক্স পরিশোধ না করলে তাদের নাম লাল তালিকাভুক্ত করা হবে এবং পঞ্চায়েত অফিসে টাঙিয়ে দেওয়া হবে। এর পর ১৫ দিনের মধ্যে ট্যাক্স পরিশোধ না করা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা হিসাবে জরিমানা ধার্য করা হবে, এমনকি জেল পর্যন্ত হতে পারে। এলাকায় এলাকায় এই ট্যাক্স আদায়ের জন্য বিশেষ শিবির করা হবে। এলাকার বিধায়কদের বিষয়টিতে নজরদারি করতে বলা হয়েছে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে পঞ্চায়েত এলাকার কিছু রাস্তা, সেতু ও ফেরি ঘাটে টোল ট্যাক্স ধার্য করা হবে, বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের বোর্ড গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টাঙানোর জন্য কোম্পানি, সংস্থা ও ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হবে এবং কিছু পর্যটন কেন্দ্র তৈরি করে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহিত করা হবে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুদান ক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২৫২১ কোটি টাকা তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর জন্য কাদের উপর এই পঞ্চায়েতি ট্যাক্সের বোঝা চাপানো হচ্ছে? পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দাদের শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি প্রান্তিক কৃষক, ভাগচাষি, খেতমজুর, দিনমজুর– এক কথায় অতি দরিদ্র মানুষ। বাংলার গ্রামে গ্রামে চাষি ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্রমাগত ঋণগ্রস্ত হচ্ছেন, খেতমজুর ও দিনমজুররা বছরে তিন-চার মাসের বেশি কাজ না পেয়ে ধারদেনায় ডুবে যাচ্ছেন, অনেকে আত্মহত্যা করছেন। সেই অসহায় মানুষদের উপরেই চাপানো হচ্ছে এই ট্যাক্সের এই বাড়তি বোঝা।
প্রশ্ন হচ্ছে পঞ্চায়েতবাসীদের ভাল পরিষেবা দিতে রাজকোষ থেকে বরাদ্দ টাকা বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না কেন? জনকল্যাণের জন্য বরাদ্দ করতে রাজকোষের টাকায় কি এতই সংকট? তাহলে রাজকোষ থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করে গুটিকয়েক ধনকুবেরের ব্যাংক-ঋণ মকুব করে দেওয়া হচ্ছে কেন? জনসেবক (!) এমএলএ, এমপি ও মন্ত্রীদের ভাতা এবং অন্যান্য বিপুল পরিমাণ সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে কেন? রাজকোষের অর্থ নেতা-মন্ত্রীদের বিলাসে, সরকারি দপ্তরে দলীয় রঙ করার মতো অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা হচ্ছে কেন? অপ্রয়োজনীয় খরচ বাঁচালে পঞ্চায়েত এলাকায় ভাল পরিষেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ রাজকোষ থেকে খুব সহজেই বরাদ্দ করা যায়। তাহলেই আর পঞ্চায়েতবাসীদের উপর ট্যাক্সের বোঝা চাপানোর কোনও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু তারা তা করবে না। পঞ্চায়েতের বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারের বরাদ্দ টাকা দুর্নীতির কারণে কিভাবে লোপাট হয়ে যায়, তা কারও অজানা নয়। এই দুর্নীতি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই দুর্নীতি আটকানো বিজেপির পক্ষে অসম্ভব। বিজেপি পরিচালিত বিভিন্ন রাজ্যে পঞ্চায়েতগুলির দুর্নীতির বহর সকলের কাছে জানা।
এ রাজ্যের বিজেপি পরিচালিত সরকারের বয়স এখনও ৩ মাসও হয়নি। এরই মধ্যে তারা একটার পর একটা জনবিরোধী পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। পঞ্চায়েতের ট্যাক্স বৃদ্ধি তার আরও একটা সংযোজন। রান্নার গ্যাসের দাম কমানো সহ নির্বাচনের আগে বিজেপির নেতারা জনকল্যাণের জন্য যে সব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এসে তা একটার পর একটা ভঙ্গ করে চলেছেন। তারা জনগণের ঘাড় ভেঙে কর্পোরেটের স্বার্থ রক্ষার্থে ব্যস্ত। আসলে বিজেপি সরকার হল কর্পোরেটের সরকার, নিপীড়িত গরিব মানুষ বা আমজনতার সরকার নয়।
অল ইন্ডিয়া কিসান-খেতমজদুর সংগঠন (এআইকেকেএমএস) পশ্চিমবঙ্গ কমিটির পক্ষ থেকে পঞ্চায়েতের এই ট্যাক্স বৃদ্ধির তীব্র বিরোধিতা করে সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক গোপাল বিশ্বাস এই অযৌক্তিক ও অন্যায় ট্যাক্সবৃদ্ধির বিরুদ্ধে গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করতে গ্রামে গ্রামে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলার জন্য পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত পঞ্চায়েতবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন।