Breaking News

পাঠকের মতামতঃ জনতা পথে নামলেই শাসকের চোখে ভাসে ‘ষড়যন্ত্র’

শাসকরা সব সময়ই ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে ‘ষড়যন্ত্র’ খুঁজে পায়। দিল্লির যন্তর মন্তরে গড়ে ওঠা ছাত্র-যুবদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ক্ষেত্রেও ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।

দিল্লি রাজ্যে বিজেপির সভাপতি হর্ষ মালহোত্রা থেকে শুরু করে সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াত, জাতীয় মুখপাত্র সিদ্ধার্থ যাদব সহ ওদের নানা মাপের নেতারা এই আন্দোলনকে বিরোধী দলগুলোর ‘উসকানি’ এবং ‘সংসদ অবরুদ্ধ করার চক্রান্ত’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এক ধাপ এগিয়ে বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে বলেছেন, যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভের পেছনে ভারত-বিরোধী শক্তির হাত রয়েছে। একই সুরে সুর মিলিয়ে ছিলেন দলটির তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেলের প্রধান অমিত মালব্য।

শাসক দল ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের বড় অংশও দিন-রাত এই তত্ত্বই আওড়েছে যে ছাত্র-যুবদের আন্দোলনের পেছনে চিন, পাকিস্তান এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর হাত রয়েছে। ২৬ দিন অনশন চালানো শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককেও তারা কখনও ‘চিনের দালাল’ আবার কখনও ‘ডিপ স্টেটের এজেন্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

কিন্তু এই অভিযোগগুলি যে সত্য নয় তা গত ২৪ জুলাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্রের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তিনি বলেছেন, আন্দোলনে বিদেশি অর্থায়নের কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দেশের বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাস ফিরে দেখলে দেখা যাবে, প্রেক্ষাপট ও আন্দোলনের চরিত্র আলাদা হলেও বিভিন্ন সময় শাসক দল বা সরকার আন্দোলনকে প্রতিহত করতে দমন-পীড়ন নীতির পাশাপাশি ‘ষড়যন্ত্র’-এর তত্ত্বও হাজির করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে, উত্তরপ্রদেশের নয়ডায় ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং কর্মপরিবেশের উন্নতির দাবিতে জোরালো শ্রমিক বিক্ষোভ হয়। হরিয়ানার গুরুগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই শ্রমিক আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে নয়ডা, ফরিদাবাদ সহ পুরো দিল্লি-এনসিআর শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং এক বৃহৎ শ্রমিক বিক্ষোভের রূপ নেয়। শ্রমিকদের দাবি পূরণ করার পরিবর্তে এ ক্ষেত্রেও শাসক দল বিজেপি সেই একই কৌশলী অপপ্রচারকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল। উত্তরপ্রদেশের শ্রমমন্ত্রী অনিল রাজভর বলেন, এই অসন্তোষের পেছনে কোনও ‘পাকিস্তান যোগসূত্র’ রয়েছে কি না তা তদন্তকারী সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ রাজ্যবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণে বলেন, ‘বিভ্রান্তিকর ও বিঘ্নকারী উপাদানগুলো’ সম্ভবত রাজ্যে নকশালবাদকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। কোনও রকম উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই নয়ডার পুলিশ কমিশনার লক্ষ্মী সিং এই শ্রমিক বিক্ষোভকে, ‘অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সংগঠিত কর্মকাণ্ড’ বলে আখ্যা দেন। ২০২০-২১ সালের দিল্লির ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনেও অনুরূপ ঘটনা দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পাশ করা তিনটি বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে কৃষকরা দিল্লির বুকে আন্দোলন করেন। দিল্লির প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি এবং হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে কৃষকদের দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই দেশের কৃষক আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। এই আন্দোলনকেও শাসক দলের নেতা-নেত্রীরা এবং সরকার ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমের একটা বড় অংশ ‘অতি-বামপন্থীদের আন্দোলন’, ধনী কৃষকদের আন্দোলন, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, ‘দেশবিরোধী শক্তির চক্রান্ত’ ও ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে দাগিয়ে দেওয়ার প্রবল চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কৃষকরা এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়নি।

শুধু বিজেপি নয়, ২০১১-১২ সালে আন্না হাজারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন’ বা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সময়ও কংগ্রেস নেতৃত্বাধীনে ইউপিএ সরকারের নেতারা এই আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র হিসেবে দাগানোর চেষ্টা করেছে। সংসদের উভয় কক্ষে এক বিবৃতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-ও এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সিলমোহর দেন।

পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে তৎকালীন সিপিএম সরকার এবং জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্ল্যাটফর্ম ‘সিঙ্গুর কৃষিজমি রক্ষা কমিটি’ ও ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গণআন্দোলনকে প্রতিহত করতে কৃষক-জনতার ওপর চরম রাষ্ট্রীয় দমনপীড়নের পাশাপাশি এই আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত এবং গভীর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বলে প্রচার তুলেছিল। এমনকি এই আন্দোলনকে বহিরাগত ও মাওবাদীদের উসকানি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের চক্রান্তও তারা বলেছে।

আসলে প্রেক্ষাপট বদলালেও প্রতিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে সব জমানার সব শাসকেরই বয়ান বা হাতিয়ার অপরিবর্তিত থাকে। যে কোনও গণআন্দোলনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি যে নিজ নিজ উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করবে, রসদ সরবরাহ করবে এর মধ্যে বিস্মিত হওয়ার মতো কোনও বিষয় নেই। কিন্তু শাসকরা যে ভাবে কথায় কথায় দেশি-বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব হাজির করছে, তা নিছকই আন্দোলনকে প্রতিহত করার একটা পুরনো কৌশল। ভেতর থেকে আঘাত করে গণআন্দোলনের কোমর ভেঙে দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস।

ইতিহাসে মানুষই চিরকাল শেষ কথা বলে। তারাই প্রগতির পতাকা বহন করে। প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত গণতান্ত্রিক আন্দোলন বারবার আমাদের এ কথাই জানান দেয় যে– পার্লামেন্ট পুলিশ, মিলিটারি, আমলাতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা শেষ কথা নয়, শেষ কথা বলে জনগণ। সামরিক দম্ভ বা বন্দুকের নল নয়, শেষ পর্যন্ত গণদেবতাই ইতিহাসের নীতি নির্ধারক হয়ে ওঠে।

জিশু সামন্ত, খানাকুল, হুগলি

About suphal

Check Also

জিডিপি-র বৃদ্ধি নাকি বিপুল মানুষের দুর্দশা তবে বাড়ছে কেন

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হইচই ফেলে দিয়েছেন, কারণ নাকি ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি প্রথম …