Breaking News

১৯৪৬-এর দাঙ্গা স্মৃতিচারণ না ঘৃণাভাষণ

স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী হলে আয়োজিত হয়েছিল ‘অগাস্ট ১৯৪৬-এ গণহত্যার স্মৃতিচারণ’ শীর্ষক এক বক্তৃতা-সভা। মঞ্চ আলোকিত করে বক্তব্য রেখেছেন রাজ্যপাল আর এন রবি। তাঁর সেই বক্তৃতা সরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন কলেজে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে ৮০ বছর আগের সেই ১৯৪৬-এর দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনাকে এই ভাবে স্মরণ করার প্রাসঙ্গিকতা কী? এ শুধুই কি ইতিহাস চর্চা? যদি তাই হত, তা হলে তো এই সভায় বক্তা হিসেবে স্থান পাওয়ার কথা ছিল প্রথিতযশা ইতিহাসবিদদের, যাঁরা সেই সময়ের ইতিহাস নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা করেছেন বা তার চর্চায় এখনও রত। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ কিংবা ওই সময়ের ইতিহাস চর্চায় তাঁর কোনও বিশেষ অবদান রয়েছে– এমন কোনও তথ্য পাওয়া যায় না। তা হলে কীসের ভিত্তিতে এ রকম একটি ইতিহাসনির্ভর সভায় তিনি প্রধান বক্তার স্থান অধিকার করার উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হলেন? কেবল তাঁর পদ আর শাসক দলের বশংবদ হওয়ার যোগ্যতায়? এ প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক মহল, ইতিহাসবিদ থেকে শুরু করে নানা অংশ থেকে উঠছে।

রাজ্যপাল তাঁর বক্তব্যে সুস্পষ্ট ভাবে বলেন যে, ১৯৪৬ সালের ১৬-১৯ আগস্ট তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সুরাবর্দী ও তাঁর সহকারীদের প্রত্যক্ষ মদতে এই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। ওই চার দিনে দশ হাজার হিন্দু নিহত হন মুসলমানদের হাতে। এই নিষ্ঠুর ঘটনার ফলেই পরবর্তীকালে দেশভাগ হয়।

ঘটনা কি সত্যিই তাই? ইতিহাসবিদদের অভিমত কিন্তু তা বলে না। ইতিহাসবিদ সুগত বসু, যিনি ওই সময়ের ইতিহাস নিয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, অত্যন্ত পরিষ্কার ভাবেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন– ‘গোষ্ঠী সংঘর্ষের মতো মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের ধর্ম পরিচয় খোঁজায় আমি বিশ্বাসী নই। … এটুকু বলব, ১৯৪৬-এর সংঘর্ষ কখনওই একতরফা ছিল না। যেখানে যারা দুর্বল, তারা শিকার হয়েছিল। প্রথমে হয়তো হিন্দুরা মারা যান, চার দিনের হত্যালীলার শেষে বেশি মারা গিয়েছিলেন মুসলমানেরাই।’

তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তাঁরা বলেছেন, রাজ্যপাল পদাধিকার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। কিন্তু তার সুযোগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চকে শাসক দলের রাজনৈতিক মতবাদ প্রচারের কাজে ব্যবহার করবেন এ অধিকার তাঁর নেই।

রাজ্যপাল তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন, স্বাধীনতার পরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই সময়ের ইতিহাস চর্চাকে অবহেলা করা হয়েছে। বিভিন্ন সরকার এবং শিক্ষাবিদদের বিরুদ্ধে তিনি এই সময় নিয়ে নীরবতার অভিযোগ আনেন। দেখা যাক, তাঁর এই অভিযোগ কতটা সত্য।

বাস্তবে বহু ইতিহাসবিদ এই সময়ের ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, যেমন কলকাতা এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য সুরঞ্জন দাস, বাংলাদেশের ইতিহাসবিদ তাজিম মুর্শেদ। কলকাতার সেই গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রাণহানি নিয়ে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন ইতিহাসবিদ বরুণ দে-র তত্ত্বাবধানে জাপানি ইতিহাসবিদ নারিয়াকি নাগাজাতোও। ওই সময়ের ইতিহাস নিয়ে এই সব কাজের কোনওটিই রাজ্যপালের বক্তব্যের সত্যতা প্রতিফলিত করে না। কোথাও প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, সেই সময়ের হিংসা ছিল একতরফা, শুধুমাত্র মুসলমানদের তরফে এবং হিন্দুরা শুধুই আক্রান্ত হয়েছিল। সুরাবর্দী যেহেতু সে সময় মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, দাঙ্গা আটকানোর ব্যর্থতার দায় অবশ্যই তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রিসভার উপর বর্তায়। কিন্তু প্রত্যক্ষ ভাবে তিনি দাঙ্গায় মদত দিয়েছিলেন– এ কথাও সত্য নয়।

এখন বিচার্য বিষয়, ৮০ বছর পরে হঠাৎ ইতিহাস চর্চার নামে এই ধরনের ঘৃণা চর্চার প্রাসঙ্গিকতা কী? ভিতরের গূঢ় লক্ষ্য কি শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতচিহ্নকে খুঁচিয়ে দগদগে ঘায়ের স্মৃতিকে ফিরিয়ে আনা? তাতে লাভটা কার হবে? সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশের গরিব নিম্নবিত্ত সাধারণ মানুষের জীবনের যেগুলি মৌলিক সমস্যা– অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান– দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে সেগুলি আজও অধরা। আজও আমাদের দেশের এক বিশাল সংখ্যক মানুষ নিম্ন আয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হয়। শাসক-শোষকের স্বার্থে দরিদ্র মানুষের এই মৌলিক চাহিদাভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ঐক্যকে শুরুতেই বিপর্যস্ত করে দেওয়া, তাদের সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভেঙে পরস্পরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে তার আড়ালে শাসন ও শোষণকে আরও পাকাপোক্ত ও নিরাপদ করে তোলাই কি তার আসল উদ্দেশ্য নয়?

শাসক ও শোষক শ্রেণির এই অপচেষ্টা আমাদের দেশে নানা সময়ে নানা রূপে ফিরে এসেছে– নেলীর গণহত্যা, ভাগলপুরের দাঙ্গা থেকে ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গা, উদাহরণ বহু। রাজ্যের পালাবদলের পর মাত্র চার মাসের মতো সময় অতিবাহিত হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, কখনও বিদ্যাসাগর-রামমোহনের মতো নবজাগরণের মনীষীদের উপর আক্রমণ শানানো হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে বিচিত্র সব অভিযোগে প্রশ্নচিহ্নের সামনে ফেলা হচ্ছে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে লাগাতার কুৎসা। তারই সাথে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের নামে দেশভাগের সেই বেদনাময় স্মৃতিকে সমারোহের সাথে উদযাপন করা চলছে। সাম্প্রদায়িক ঘৃণার উৎসারীদের মনীষীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যমে পালিত হচ্ছে পক্ষকালব্যাপী স্মরণোৎসব। প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নামে অপর একটি গোষ্ঠীর আবেগে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলার অপচেষ্টা খুব মোটা দাগেই সকলের চোখে ধরা পড়ছে– সে ঈদের ঠিক আগে গোহত্যা নিবারণে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হোক বা সেই ১৯৩৭ সালে স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে গৃহীত সিদ্ধান্তকে অগ্রাহ্য করে বন্দেমাতরম-এর পুরো সঙ্গীত স্কুলে- কলেজে বা সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে হোক।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হঠাৎ রাজ্যপালকে দিয়ে ইতিহাসের নামে অসত্যকে এইভাবে মদত দেওয়া এবং তা সরকারি উদ্যোগেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচারের উদ্যম অবশ্যই ঘৃণাচর্চার নামান্তর। সঙ্গত কারণেই রাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ একে ধিক্কার জানিয়েছেন।