
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের সাধারণ সভা (জিবি) ডাকাকে কেন্দ্র করে ১৯ আগস্ট রাতে বিবাদ হয় ডিএসএফ নামে একটি সংগঠন এবং আরএসএস-এর ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি)-র মধ্যে। এর জেরে বচসা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই রাতেই এবিভিপি-র সদস্য ও বাইরের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে এক বিজেপি বিধায়ক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে যাদবপুরের ছাত্রদের হুমকি দিয়ে নানা মনগড়া অভিযোগ তুলে যাদবপুরকে দেশবিরোধীদের আখড়া বলতে থাকেন। কয়েক জনের নাম করে তাঁর হুঁশিয়ারি, এক ঘণ্টার মধ্যে এঁরা আত্মসমর্পণ না করলে, যেখানে লুকিয়ে আছেন, সেখান থেকে টেনে বার করবেন! ‘সারা রাত তাণ্ডব চলবে’।
বিধায়কের ওই হুমকির পরের দিন, ২০ আগস্ট, ‘যাদবপুর অভিযান’-এর নামে চরম বিশৃঙ্খলা, অসভ্যতা ও হামলার নজির তৈরি করে এবিভিপি। হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকে থাকা ঐতিহ্যবাহী প্রতীক ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে, যখন ছাত্রছাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে নৈরাজ্য চললেও উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের দেখা মেলেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তাকর্মীদেরও কোনও সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে কি প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থেকে এবিভিপি“বিজেপির তৈরি করা এই নৈরাজ্য চলতে দিল? আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার এবং বিজেপি-এবিভিপির দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে উপাচার্য ক্যাম্পাসে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের পক্ষে সংবাদমাধ্যমে সওয়াল করতে ভুললেন না। লক্ষণীয়, বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই সময় বলেন, ‘‘কেউ পেশি-শক্তির আস্ফালন দেখিয়ে প্রাসঙ্গিক হতে চাইলে স্থানীয় বিধায়ক অবশ্যই সেখানে যাবেন।’’ সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া মুখ্যমন্ত্রী ঘটনার দু’দিন পর যাদবপুরের একাংশে ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর অস্তিত্বের সন্ধান পেয়ে হুঙ্কার দিলেন ‘জাতীয়তাবাদ-রাষ্ট্রবাদের সঙ্গে কোনও আপস করা হবে না’ এবং জানিয়ে দিলেন, ‘রাখি পূর্ণিমার দিন যাদবপুরে গিয়ে ১০ হাজার কণ্ঠে বন্দেমাতরম গাওয়া হবে।’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বরে যে ভঙ্গিতে একজন বিধায়ক হুঙ্কার দিয়েছেন, যে ভাবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি তাঁকে সমর্থন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে ভাবে সব দেখেও নিষ্ক্রিয় থেকেছে, এমনকি মুখ্যমন্ত্রীও যে ভাষায় কথা বললেন, তা থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে বিজেপির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলের কৌশল স্পষ্ট হয়ে যায়।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপি-এবিভিপির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে ২০২৬ সালের ১৯-২০ আগস্টের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ রাখলে এর দীর্ঘমেয়াদি চরিত্রটি বোঝা যাবে না। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, এবিভিপির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। সেখানে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি বিক্ষোভ দেখালে মন্ত্রীর উস্কানিতে তীব্র সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাতে বিজেপি-এবিভিপির গেরুয়া বাহিনী ক্যাম্পাসে ঢুকে ছাত্রদের ইউনিয়ন রুমে ভাঙচুর চালায় এবং ছাত্রদের মারধর করে। এর সমর্থনে তৎকালীন রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ যাদবপুরকে ‘দেশ-বিরোধী’ ও ‘কমিউনিস্ট’-দের ঘাঁটি বলে আক্রমণ করে ‘বালাকোটের মতো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর দাওয়াই দেন। ২৩ সেপ্টেম্বর এবিভিপি মিছিল করে এসে আবার ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৪ নম্বর গেটের সামনে ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে মানববন্ধন করেন। ৩ মার্চ ২০২৫-এ, ফের এবিভিপির সদস্যরা বাইরে থেকে ক্যাম্পাসে ঢুকে এআইডিএসও এবং এসএফআইয়ের পতাকা সরিয়ে এবিভিপির পতাকা লাগায় এবং তাদের পোস্টার ছিঁড়ে দেয়।
২০১৯ সাল থেকে ঘটে চলা ধারাবাহিক ঘটনাগুলির দিকে তাকালে দেখা যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘দেশ-বিরোধী’ শক্তির ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত করা, এবিভিপির সাংগঠনিক উপস্থিতি বাড়ানো এবং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক দখল নেওয়াই বিজেপির একমাত্র উদ্দেশ্য। দেশের অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও বিজেপি-শাসিত রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপি-আরএসএস-এবিভিপি যে ভাবে ক্যাম্পাস দখলের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, এই প্রবণতা তার থেকে ভিন্ন নয়। বিশেষত, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কেও একই ছকে দখলের চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। মতপ্রকাশ, ভিন্নমত ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসরকে সংকুচিত করে ক্যাম্পাসে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই এই রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। ফলে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রাজনৈতিক মডেল প্রত্যক্ষ করা হয়েছে, যাদবপুরেও তার অনুরূপ পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় এক সভায় এবং শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিনহার মতো বিজেপির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময়ে সমগ্র যাদবপুরকে ‘অরাজকতা’ বা ‘দেশ-বিরোধী’ কার্যকলাপের ঘাঁটি হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এক ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করার চেষ্টা করে গেছেন। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় বিজেপি বামপন্থী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ বা সরকারবিরোধী রাজনীতিকে গণতান্ত্রিক পরিসর দিতে চায় না। বরং ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে আদর্শগত বিরোধী রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিসরকে খর্ব করার চেষ্টা করে।
সারা দেশে শিক্ষাকে কবরে পৌঁছে দেওয়ার কারিগর বিজেপি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার অবস্থা, ছাত্রছাত্রীদের জন্য চোখের জল ফেলছে। অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয় গত ২০২৪ সালেও ভারতশ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মর্যাদা অর্জন করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রছাত্রী বিশ্বময় নিজ নিজ ক্ষেত্রে আজও প্রতিষ্ঠা অর্জন করে চলেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাঙ্গনকে আলোকিত করেছিলেন প্রথম উপাচার্য পদ্মশ্রী ডঃ ত্রিগুণা সেন, নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ডঃ অমর্ত্য সেন, কবি শঙ্খ ঘোষ, সাহিত্যিক নবনীতা দেবসেন, ঐতিহাসিক ডঃ সুকুমারী ভট্টাচার্য। যাঁদের যত্ন ও তত্ত্বাবধানে শিক্ষা সাহিত্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্বময় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় আজ সুনামের সাথে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। এই ক্যাম্পাস আজও মুক্ত চিন্তা, আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত, যা বিজেপি-আরএসএস-এর রাজনৈতিক আদর্শের সাথে খাপ খায় না। তারা যে সর্বাত্মক অন্ধতা ও তাকে ভিত্তি করে যে আনুগত্য চায় তা যাদবপুরের ক্যাম্পাস স্বীকার করে না। তাই চূড়ান্ত অনৈতিহাসিক ভাবে এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসকে বার বার আক্রমণ করে চলেছে তারা।
যাদবপুরের ঘটনাবলি থেকে উঠে আসা মূল প্রশ্ন হল, বিশ্ববিদ্যালয় কি স্বাধীন ও মুক্ত চিন্তা, বিতর্ক এবং ভিন্নমতের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে থাকবে, নাকি শাসক দলের রাজনৈতিক আধিপত্য ও একমাত্রিক ‘দেশপ্রেমের’ হিন্দুত্ববাদী সংজ্ঞার অধীনে পরিচালিত হবে? প্রশ্নটি শুধু যাদবপুরের নয়, এটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে, শিক্ষাক্ষেত্রে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি ছাত্র-শিক্ষক সহ বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ ও তাঁদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আশার কথা, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বস্তরের মানুষ এবং প্রাক্তনীদের পাশাপাশি রাজ্য জুড়ে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি এআইডিএসও, এসএফআই-এর মতো ছাত্র সংগঠন, যুব সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং শিক্ষাপ্রেমী সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের ফলে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী-ফ্যাসিবাদী রাজনীতি এই মুহূর্তে চরম পর্যুদস্ত হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের এই প্রতিরোধই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যাদবপুরকে হিন্দুত্ববাদী আধিপত্যের অধীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা সফল হবে না।