
রাজ্যে নব নির্বাচিত বিজেপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিধায়করা পারিষদ সহ বিশাল বাহিনী নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের অন্দরমহলে তদারকি শুরু করে দিয়েছিলেন। তাতে রাজ্যবাসীর অনেকের মনে আশা জাগতে পারে, এ বার হয়তো স্বাস্থ্যের ভগ্ন দশা দূর হবে। যদিও এমন হুড়মুড়িয়ে হাসপাতাল সফরের মেডিকেল প্রোটোকল ও প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন নিয়ে চিকিৎসকদের একাংশ যে প্রশ্ন তুলেছেন, সে সবের তোয়াক্কা না করে হাসপাতালের অন্দরমহলে ঢুকে পড়া রোগীদের পক্ষে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?
১৫ বছর আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এসএসকেএম-এর মতো হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে পড়েছিলেন এবং কর্তব্যরত চিকিৎসককে নানা প্রশ্নে বিদ্ধ করেছিলেন। পরে সেই চিকিৎসককে বিনা কারণে সাসপেন্ড করা হয়। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সে দিন যে ঔদ্ধত্য এবং স্বৈরতন্ত্র মানুষ দেখতে পেয়েছিলেন আজ তার স্মৃতি চিকিৎসক মহলে ভেসে উঠছে।
পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রীর এ রূপ আকস্মিক পরিদর্শনে স্বাস্থ্যক্ষেত্রের অচলাবস্থা দূর হয়নি। সিপিএম সরকারের তৈরি অব্যবস্থা, পরিকাঠামোহীনতা, দুর্নীতি, ঘুঘুর বাসা আরও গভীরে শিকড় গেড়েছিল। সীমাহীন দুর্নীতির গাছটি অবশেষে মহীরুহে পরিণত হয়েছিল, যার পরিণতিতে আর জি কর মেডিকেল কলেজের অভয়াকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটতে পেরেছিল। তা ছাড়া, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ওই আচরণ এবং চিকিৎসক সমাজের প্রতি বিরুদ্ধ আচরণ সাধারণ মানুষের একাংশকে উদ্বুদ্ধ করেছিল চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হতে। কারণে-অকারণে তার পর থেকে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। বাস্তবে চিকিৎসার সুব্যবস্থায় সরকারের যে কাজগুলি করার দরকার ছিল, তা না থাকায় চিকিৎসা যথাযথ না হওয়া, রোগী হয়রানি, রোগী মৃত্যুজনিত ক্ষোভ আছড়ে পড়ত ডাক্তারদের ওপর। ফলে এক বছরের মধ্যেই ১০৮টি জায়গায় চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছিল যা গোটা চিকিৎসক সমাজ তথা চিকিৎসা জগতে এক নৈরাজ্যের পরিবেশ তৈরি করেছিল।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার গোড়ায় যে গলদ রয়েছে সে দিকে না তাকালে এবং তার সুষ্ঠু সমাধানের পথে না এগোলে মানুষকে সুরাহা দেওয়া যায় না। স্বাধীনতার ৭৯ বছর অতিক্রম করলেও এ রাজ্যে কংগ্রেস থেকে সিপিএম, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনকাল অতিক্রান্ত। আজও সরকারি হাসপাতালে মানুষের চিকিৎসার নামে কী পরিহাস চলছে তা বিধায়করা স্বচক্ষে দেখছেন।
হাসপাতালে সুইপার এবং গ্রুপ ডি পদে লোক একেবারেই অপর্যাপ্ত। একটি বড় হাসপাতালে সুইপার থাকার কথা এক হাজার থেকে দেড় হাজারের উপরে। সেখানে বেশিরভাগ হাসপাতালেই মেরেকেটে ১০০ থেকে ১৫০-র বেশি সুইপার নেই। কোথাও কোথাও বেসরকারি সংস্থার হাতে হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে ওইসব কর্মচারীদের না আছে বাঁচার মতো বেতন, না আছে কাজের কোনও নিরাপত্তা বা স্থায়িত্ব। তবুও পাঁচ-ছয় হাজার টাকায় তারা দিনরাত পরিশ্রমের শর্তে এই ধরনের চাকরি করতে বাধ্য হয়েছেন। কোথাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরাসরি এই ধরনের লোক নিয়োগ করেছে, বেতন মাসে মাত্র ৩০০০ টাকা। শাসকদলের ছত্রছায়ায় এই ধরনের বেসরকারি সংস্থার সীমাহীন দুর্নীতির ফলে কোনও হাসপাতালে খাতায় কলমে ২০০ কর্মবন্ধুর নাম লেখানো থাকলেও, হাতেকলমে কাজ করেন মাত্র ৩০ থেকে ৪০ জন। এমন সব নিদারুণ তথ্য পূর্বতন সরকারি কর্তাব্যক্তিরা জানতেন না তা নয়। বরং বলা যায় তাদের প্রত্যক্ষ মদতেই এই জিনিস চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে আজ হাসপাতালের ভেতরে অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্নতার পরিবেশ দেখে নতুন সরকারের বিধায়কদের শুধু বেজায় চটে গিয়েই ক্ষান্ত হলে চলবে না। এই নিদারুণ অবস্থার পরিবর্তনে অবিলম্বে স্থায়ী সুইপার এবং কর্মী নিয়োগ করতে হবে। পরিদর্শন টিমের কর্তা-কর্ত্রীরা মুখমন্ত্রীকে তেমন সুপারিশ করেছেন কি?
রাজ্যের সর্বত্রই হাসপাতালগুলিতে ডাক্তার, নার্স সহ স্বাস্থ্যকর্মীর বিপুল ঘাটতি রয়েছে। রাজ্যে যত সংখ্যক হাসপাতাল বেড থাকার কথা তার এক তৃতীয়াংশও নেই। ফলে সর্বত্রই রোগীর ভিড়। হাসপাতালে বহির্বিভাগে একজন ডাক্তার সুষ্ঠু ভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বড়জোর ৩০ থেকে ৪০ জন রোগী দেখতে পারেন। বিদেশে যেখানে ১০-২০ জন রোগী দেখা হয়, আমাদের হাসপাতালগুলিতে বহির্বিভাগে সেই সংখ্যাটা ২০০ থেকে ৮০০ পর্যন্ত। অন্তর্বিভাগে একজন বা দু’জন নার্সের উপরে ১০০-২০০ রোগীর দায়িত্ব থাকে, সেখানে গ্রুপ ডি কর্মী হয়তো মাত্র একজন বা কোথাও নেই। এই ঘাটতি পূরণ না করে শুধু ডাক্তারদের সহমর্মিতা, ঐকান্তিক চেষ্টার দ্বারা চিকিৎসা হবে? যদিও এগুলি দরকারি।
হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নীতিতে বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। শুরু হয়েছিল সিপিএম সরকারের হাত ধরে। তৃণমূল আমলে তার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ফলে আজ হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে চিকিৎসার অনেকটাই ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকাঠামোর অপ্রতুলতার দরুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং অপারেশনের ডেট পেতে পেতে বিভিন্ন বিভাগের রোগীদের মাসের পর মাস কেটে যায়। তত দিনে অনেকের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। নতুন সরকার এই ঘাটতি পূরণে কী ভূমিকা নিচ্ছে মানুষ তা জানতে চায়।
সরকার, প্রশাসন ও বিভিন্ন কোম্পানির যোগসাজশে হাসপাতালে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ, স্যালাইন এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের রমরমা। যার বিষক্রিয়ায় প্রসূতি মা থেকে শিশু, বৃদ্ধ অনেকেরই অকালমৃত্যুর খবর প্রায়ই শোনা যায়। এই সব মৃত্যুর দায়ে কর্তব্যরত ডাক্তারদের সাসপেন্ড করা হয়, শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু ধরা হয় না ওই সব ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী মালিকদের। বিগত দিনের কোনও সরকারই তা খতিয়ে দেখেনি।
বিগত সরকার বারবার হাসপাতালের দৈন্যদশা চাপা দিয়ে ভাবমূর্তি রক্ষা করার জন্য নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদের ভিলেন বানানোর জন্য জনসমক্ষে নানা চটকদার পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। ফলে বহু সময় মানুষ স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব রকম সংকটের জন্য ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মীদেরই দায়ী করেছে এবং কারণে-অকারণে তাদের উপর চড়াও হয়েছে। কিন্তু সকলের জন্য স্বাস্থ্যনীতি প্রয়োগ করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ, পরিকাঠামো তৈরি, ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কাজটি কেউ করেনি, বরং যতটুকু ছিল তাও কমিয়েছে।
নতুন সরকার চটকদার পদক্ষেপগুলি পরিত্যাগ করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকটের গভীরে ঢুকুক। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি তৈরি করুক। পুরনো যে সব বিজ্ঞানভিত্তিক সুপারিশ, ভোর কমিটির সুপারিশ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ রয়েছে সেগুলি প্রয়োগ করুক। হাসপাতাল পরিদর্শন অবশ্যই দরকার। তার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক এবং প্রশাসনিক নিয়ম মেনে নিয়মিত হাসপাতাল পরিদর্শন হোক।