
অগ্নি নিরাপত্তার নিয়ম-কানুনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিনের পর দিন ধরে রমরমিয়ে চলছে হোটেল ব্যবসা। দিল্লিতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পুলিশ-প্রশাসন চোখেও দেখে না, কানেও শোনে না। পরিণামে গত ৩ জুন আগুনে পুড়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হল ২১ জনের। বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। মৃত ও আহতদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসা করাতে দিল্লিতে আসা বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও। এঁরা সকলেই ছিলেন দক্ষিণ দিল্লির ‘ফ্লারিশ স্টে বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ হোটেলের বাসিন্দা।
এই নিয়ে গত পাঁচ মাসে দিল্লিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পৌঁছল ২১টিতে। মৃত এ পর্যন্ত ১১০ জন। ৩ জুনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তবেই দিল্লির অপদার্থ বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সময় পেয়েছেন একটি বিশেষ ঘোষণা করার। তিনি জানিয়েছেন, এ বার সেখানকার বিজেপি সরকার দিল্লি শহর জুড়ে হোটেল সহ সমস্ত সংস্থার অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করবে।
দীর্ঘ দিন ধরেই দিল্লির হোটেল, রেস্টুরেন্ট সহ পরিষেবা প্রদানকারী বেশিরভাগ সংস্থাতেই অগ্নি নিরাপত্তা বিধি ঠিকমতো মানা হয় না। গত জানুয়ারিতে দিল্লি হাইকোর্ট সেখানকার পৌর সংস্থাগুলিকে, এই সব জায়গায় অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মনকানুন ঠিকঠাক কাজ করছে কি না তা দেখা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কেটে গিয়েছে দীর্ঘ পাঁচ মাস। দিল্লির বিজেপি সরকার ও পৌর প্রশাসন সে নির্দেশ কার্যকর করতে নড়েও বসেনি। বরং ২৭ মে দিল্লি সরকার নতুন এক অগ্নি নিরাপত্তা বিধির প্রস্তাব এনেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি ‘দিল্লি ফায়ার সার্ভিসেস’ (ডিএসএফ)-এর বদলে বেসরকারি ফায়ার-অডিটরদের কাছ থেকেই অগ্নি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র পাওয়া যেতে পারে। শুধু তাই নয়, দিল্লির বিজেপি সরকার ‘বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট’ ধরনের হোটেল সংক্রান্ত পুরনো নিয়ম পাল্টে ২০২৬-এর খসড়া নীতিতে এই প্রস্তাবও এনেছে যে, এরা অগ্নি নিরাপত্তার ব্যাপারে নিজেরাই নিজেদের সার্টিফিকেট দিতে পারবে! দিল্লির মতো ব্যস্ত রাজধানী শহরে যেখানে পৌরসংস্থার অনুমতি ছাড়াই যত্রতত্র বাড়ির উচ্চতা বাড়িয়ে নেওয়া বা বাসগৃহগুলিকে ব্যবসায়িক কাজে লাগানোর রেওয়াজ রয়েছে, সেখানে অগ্নি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশাসনিক কড়াকড়ির বদলে কাদের স্বার্থে বিজেপি সরকার নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার চেষ্টা করছে— সেই প্রশ্ন তুলছেন মানুষ। বাস্তবে অগ্নি নিরাপত্তা বিধি— যার সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে– তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিল্লি সরকারের ক্ষমাহীন উদাসীনতা ও অপদার্থতার কারণেই ৩ জুন প্রাণ হারাতে হল এতগুলি মানুষকে।
ফ্লারিশ স্টে হোটেলে আগুন লাগার পরে পরেই দমকলের অপেক্ষায় না থেকে দুর্গতদের উদ্ধারের কাজে যথারীতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আশপাশের লোকজন। এই প্রসঙ্গে সামনে এসেছে দিল্লির দমকলের বেহাল দশা। ডিএফএস-এর তথ্য বলছে, স্টেশন অফিসারের ৯০টি পদের মধ্যে ৭২টিই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। সাব অফিসারের ১৭২টি পদের মধ্যে ফাঁকা রয়েছে ৬১টি। নিচের তলার দমকল-কর্মী, যাঁরা আগুন নেভানো ও উদ্ধারকার্যে প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেন, তাঁদের ৫৮ শতাংশ পদই শূন্য। এই পরিস্থিতিতে কর্মীর অভাবে ধুঁকতে থাকা দিল্লির দমকল বাহিনী যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছয়, তার আগেই দাউদাউ আগুন গ্রাস করেছে গোটা হোটেল।
ফ্লারিশ স্টে হোটেলের অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা আদৌ যথাযথ ছিল না। বাইরে বেরনোর দরজা ছিল মাত্র একটি। পাল্লা খোলা যায় এমন জানলাও ছিল না। এমনকি বন্ধ ছিল ছাদের দরজাও। ফলে আগুনের তাপে ও ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মরতে বসা বাসিন্দাদের বাইরে বেরনোর রাস্তা ছিল সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ। এগিয়ে এসেছিলেন আশপাশের মানুষ। বাইরে থেকে জানলার কাচ ভেঙে, আগুন ও ধোঁয়ার পরোয়া না করে ভিতরে ঢুকে দুর্গতদের উদ্ধার করেছেন স্থানীয় আমীর খান, ওয়াসিম রাজা, মহম্মদ আফজলরা। ৬১ বছরের প্রৌঢ় রিয়াজউদ্দিন নিজের গদির দোকান থেকে একের পর এক গদি টেনে এনে হোটেলের সামনে পেতে রাখেন, যাতে ওপর থেকে ঝাঁপ দিলেও দুর্গতরা প্রাণে বাঁচতে পারেন। রিয়াজউদ্দিনের সঙ্গে সেই কাজে হাত লাগান সঞ্জয় গোয়েল সহ আরও অনেকে। এই কাজে রিয়াজউদ্দিন সাহেবের ক্ষতি হয়ে গেছে কয়েক লক্ষ টাকা। কিন্তু চোখের সামনে মানুষকে আগুনের গ্রাসে চলে যেতে দেখে স্থির থাকতে পারেননি তিনি। আর্থিক ক্ষতির কথা সেই মুহূর্তে তাঁর ভাবনাতেও আসেনি। বাস্তবে তাঁর বাস্তববুদ্ধির কারণে প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন ওই হোটেলের বেশ কয়েকজন। ধোঁয়া ও তাপে অজ্ঞান হয়ে পড়া অন্তত ৮ জন দুর্গতের মুখে মুখ দিয়ে কৃত্রিম ভাবে তাঁদের শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করেন মহম্মদ শোয়েব। মৃতদের স্থানান্তরিত করা ও আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন হোটেলের আশপাশের বাসিন্দা ও ছোট ব্যবসায়ীরা।
ফ্লারিশ স্টে-র অগ্নিকাণ্ডে দুর্গতদের প্রাণ বাঁচালেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই ধর্মে মুসলমান। নিজেদের প্রাণ বিপন্ন করে উদ্ধারের কাজে ঝাঁপানোর সময়ে তাঁরা কেউই কিন্তু অগ্নিদ* মানুষের ধর্ম-পরিচয়ের কথা ভাবেননি। মানবিকতার স্বাভাবিক প্রেরণায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অন্য আর এক জন মানুষের প্রাণ বাঁচাতে। অথচ ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার ‘অপরাধে’ এঁদেরই অনবরত ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘দেশদ্রোহী’ বলে দাগিয়ে দেয় সাম্প্রদায়িক বিজেপির নেতা-কর্মীরা, হুমকি দেয় পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়ার।
দিল্লিতে এখন সরকারি ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। নিজেদের সেই সরকারের অপদার্থতা ও দায়িত্বহীনতার পরিণামে এতগুলি মানুষের প্রাণহানি এবং দুর্গতদের উদ্ধারে সংখ্যালঘু সাধারণ মানুষের অসমসাহসী ভূমিকা দেখার পর মুসলমান-বিদ্বেষী সেই সব বিজেপি নেতা-কর্মীরা এবার লজ্জিত বোধ করবেন তো?