
যে দেশে কিংফিশার এয়ারলাইনসের মালিক বিজয় মাল্য ন’হাজার কোটি টাকা ঋণ ফাঁকি দিয়ে বিদেশে গা ঢাকা দিয়েছেন এবং হিরে ব্যবসায়ী নীরব মোদি তেরো হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি করেছেন, জিতু মুন্ডা সেই দেশেরই মানুষ। যে দেশে শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির এক দিনের রোজগার একশো তেষট্টি কোটি থেকে সাড়ে তিনশো কোটির মধ্যে ঘোরাফেরা করে এবং শতকোটিপতির সংখ্যায় যে দেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে, জিতু মুন্ডা সেই দেশেরই মানুষ।
ওড়িশার কেওনঝড়ের বাসিন্দা দিনমজুর জিতু মুন্ডা আর তার বোন কালারা মুন্ডার বেঁচে থাকার মূল অবলম্বন ছিল সরকারি প্রকল্পের মাসিক কয়েক কেজি চাল আর নিঃসম্বল বৃদ্ধাদের জন্য মাসিক বরাদ্দ ১০০০ টাকা। কয়েক মাস আগে দুটো মহিষ বেচে পাওয়া উনিশ হাজার তিনশো টাকা কালারার নামে রাখা ছিল গ্রামীণ ব্যাঙ্কে। কালারা যখন অসুস্থ হয়ে বিছানা নিলেন, ওই টাকাটা তোলার জন্য অনেকবার সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ উজিয়ে ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন জিতু। লাভ হয়নি। ব্যাঙ্কের কর্তারা বলেছিলেন, যার নামে টাকা তাকে আসতে হবে। এরই মধ্যে কালারা মারা গেলেন। সেই কয়েক কেজি চাল আর হাজার টাকার সংস্থানটুকুও হারিয়ে কার্যত অনাহারে মরার দশা হল জিতুর। জিতু বারবার ব্যাঙ্কে গেলেন, প্রাণপণে বোঝাতে চাইলেন ওই উনিশ হাজার টাকা যাঁর নামে, সেই মানুষটা আর পৃথিবীতে নেই। ব্যাঙ্ক বুঝল না। বলল, মৃত্যুর প্রমাণ চাই— অর্থাৎ কাগজ চাই।
জন্ম-মৃত্যু-পরিচয়ের এই কাগুজে প্রমাণ থাকা যতটা জরুরি, সে সব জোগাড় করা ততটাই অসাধ্য এ দেশের কোটি কোটি ভুখা মানুষের পক্ষে। জিতু মুন্ডার মতো নুন আনতে পান্তা ফুরনো নাচার মানুষগুলো সেই ভারতের প্রতিনিধি, যাদের থাকার ঝুপড়ি ঘর বারবার ভেসে যায় ভেঙে যায় ঝড়ে, বন্যায়, উচ্ছেদের বুলডোজারে। বেঁচে থাকাটাই যাদের জীবনে প্রতি মুহূর্তের যুদ্ধ, তাদের কাছে প্রমাণপত্র চাওয়া আইনসম্মত হলেও, কোথাও কোথাও ভয়ঙ্কর অমানবিক।
স্বভাবতই জিতুর কাছে বোনের ডেথ সার্টিফিকেট ছিল না। কিন্তু ওই টাকাটুকু না পেলে তাকে মরতে হবে। কাজেই তিন মাস ব্যাঙ্কে দৌড়াদৌড়ির ব্যর্থ চেষ্টার পর জিতু একটা অসমসাহসিক কাজ করে বসলেন। মুন্ডা সম্প্রদায়ের রীতি অনুযায়ী কালারার দেহ সমাধিস্থ করা ছিল। জিতু সেই কবর খুঁড়ে ফেলে মৃত বোনের কঙ্কাল টেনে বের করে আনলেন। সেই কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে এলেন ব্যাঙ্কের দরজায়। ‘আচ্ছে দিন’ আর ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র ভারতবর্ষ তাকিয়ে দেখল— এ দেশেরই এক নিরক্ষর আদিবাসী মজুরকে উনিশ হাজার টাকার জন্য দাখিল করতে হয়েছে একটা আস্ত কঙ্কাল— বোনের মৃত্যুর প্রমাণ!
এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে নড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে ওড়িশার পুলিশপ্রশাসন। দু-দিনের মধ্যে জিতু প্রাপ্য টাকা পেয়েছেন, বোনের ডেথ সার্টিফিকেট পেয়েছেন, জীবনে প্রথম বার পায়ে দেওয়ার জন্য কয়েক জোড়া চটি জুটেছে তার। এই খবর ভাইরাল হওয়ার পর আরও নানা সংস্থা থেকে টাকা এসেছে জিতুর নামে। আগামী বেশ কিছুদিন হয়তো তাঁকে আর অর্থকষ্টে ভুগতে হবে না। কিন্তু এই যে ভয়ানক একটা শারীরিক-মানসিক যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যেতে হল জিতুকে, একটি সভ্য দেশের একজন নাগরিককে বোনের মৃত্যুর প্রমাণ দিতে এমন ভয়ানক অস্বাভাবিক পদক্ষেপ নিতে হল, তার দায় কার? ব্যাংকের লোকদের দায় আছে বটেই। দিনের পর দিন এই দরিদ্র মানুষটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার সময়, কাগজ চাওয়ার সময় যে বাস্তব জ্ঞান এবং সংবেদনশীলতা দেখানো দরকার ছিল, তা তারা দেখাননি। জিতু মুন্ডার জায়গায় যদি ধোপদুরস্ত পোশাক পরা বা অর্থবান সচ্ছল কেউ এসে টাকা তোলার দাবি করতেন, আত্মীয়ের মৃত্যুর কথা জানাতেন, ডেথ সার্টিফিকেট না থাকলেও তাকে এইভাবে দিনের পর দিন মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হত কি? আসলে এই ঔদাসীন্য বা অসংবেদনশীলতা বিশেষ কিছু লোকের বা একটি ব্যাংকের ঘটনা নয়। শিক্ষা-স্বাস্থ্য রোজগারের মতো যে জিনিসগুলো মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার, দেশের প্রান্তে প্রত্যন্তে কোনওমতে বেঁচে থাকা গরিবগুর্বো মানুষেরা তা পাবেন না, না পাওয়ার মাশুলও তাঁদেরই দিতে হবে এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁরা বারবার প্রত্যাখ্যাত, অসম্মানিত হবেন এ যেন সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
২০১৬ সালের কথা। ঠিক এভাবেই অনেকটা বদলে গিয়েছিল দানা মাঝির জীবন। একটা অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করতে পারেননি বলে মৃত স্ত্রীর দেহ কাঁধে নিয়ে দশ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন দানা মাঝি। হইচই হওয়ার পর সুরাহা হয়েছিল। বেশ কিছু আর্থিক সংস্থানও জুটেছিল। কিন্তু যে অমানবিক ব্যবস্থা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবনকে এমন অসহনীয়, এমন মূল্যহীন করে তোলে, সেই ব্যবস্থা যে এতটুকু পাল্টায়নি তার প্রমাণস্বরূপ ২০১৬-র দানা মাঝির পর ২০২০-তে করোনা কালের ভারতে মাইলের পর মাইল হেঁটে তেলেঙ্গানা থেকে ছত্তিশগড়ে বাড়ি যাওয়ার পথেই খিদে-তেষ্টায় শুকিয়ে মারা গিয়েছিল বারো বছরের মেয়ে পরিযায়ী শ্রমিক জামলো মকদম। আর ইতিহাসের নির্মম পরিহাসের মতো এই ২০২৬-এর প্রজাতন্ত্র দিবসের ভোরে মারা গেলেন কালারা মুন্ডা, মাস তিনেকের মধ্যেই আবার অবশিষ্ট ছাল-চামড়া সহ কঙ্কাল হয়ে উঠে আসবেন বলে।
বছরের পর বছর এভাবেই প্রবল দারিদ্র, ক্ষুধা, অপুষ্টি আর অসহায়তা নিয়ে কাটে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন। অন্য দিকে বাড়তে থাকে কোটিপতিদের মুনাফা। রাজ্যে রাজ্যে, দেশে সরকারগুলো ডবল ইঞ্জিন হোক বা একাই ইঞ্জিন চালাক, সকলেই সেই মুনাফার দায়দায়িত্ব নিয়ে অবাধ শোষণ চালাতে দেয় পুঁজিমালিকদের। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গরিব থেকে আরও আরও গরিব হতে থাকে, আর ভাষণে-বিজ্ঞাপনে-ভোটের প্রচারে নেতা-মন্ত্রীরা জনসেবার, উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়ে চলেন রঙিন কার্পেট দিয়ে গর্ত ঢেকে রাখার মতো করে। কিছুদিন পর পর এই মিথ্যের কার্পেট ফুঁড়ে জিতু মুন্ডার মতো কেউ কেউ মূর্তিমান অস্বস্তি হয়ে উঠে আসেন। আমাদের মনে করিয়ে দেন, কয়েক হাজার টাকার জন্য কবর খুঁড়ে বের করা ওই কঙ্কাল আসলে ‘বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের’!