
এ বছর রাজ্য স্বাস্থ্য বাজেটকে জনমুখী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে বিজেপি সরকার। তাদের এই দাবি বাস্তবে কতটা সত্য তা বিচার করে দেখা যাক।
প্রথমত, স্বাস্থ্য বাজেটে টাকার অঙ্কে বরাদ্দের ক্ষেত্রে গত বছর বাজেটের তুলনায় সামান্য অর্থ বৃদ্ধি পেলেও টাকার ও মূল্যবৃদ্ধির অবমূল্যায়ন নিরিখে তা বিগত বছরগুলির তুলনায় বাস্তবে কমানো হয়েছে বলা যায়। গত অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬ এ) যেখানে স্বাস্থ্য বাজেট সামগ্রিক রাজ্য বাজেটের ৬.৪ শতাংশ ছিল, এ বছর পেশ করা স্বাস্থ্য বাজেট কমে দাঁড়াচ্ছে সমগ্র বাজেটের ৫.৬৪ শতাংশ মাত্র। অর্থাৎ গতবারের থেকেও শতাংশের হিসেবে অনেকটা কম। রাজ্য স্বাস্থ্য বাজেট যেখানে সামগ্রিক বাজেটের ন্যূনতম ৭.৫ শতাংশ হওয়ার কথা, তার তুলনায় অনেকটাই কম।
দ্বিতীয়ত, ইন্ডিয়ান পাবলিক হেলথ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী রাজ্যের জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামোর যে বিপুল ঘাটতি রয়েছে অর্থাৎ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে শুরু করে মহকুমা হাসপাতাল জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিকাঠামো প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম রয়েছে। সেই বুনিয়াদি পরিকাঠামো পূরণ করার লক্ষ্যে এই বাজেটে কোনও অর্থই বরাদ্দ করা হয়নি। নতুন কিছু মেডিকেল কলেজ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, এইমস-এর মতো হাসপাতাল গড়ে তোলার ঘোষণা হলেও তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ কোথা থেকে আসবে তা কিন্তু বাজেটে স্পষ্ট বলা হয়নি।
তৃতীয়ত, বর্তমানে ইন্ডিয়ান পাবলিক হেলথ স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গ্রুপ-ডি ও সুইপারের পদে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পদ শূন্য পড়ে রয়েছে। ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পদ শূন্য। স্বাস্থ্যক্ষেত্রের এই বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ পূরণ নিয়ে একটি কথাও নেই। এ জন্য কোনও অর্থ বরাদ্দও বাজেটে করা হয়নি।
চতুর্থত, আয়ুষ্মান ভারত নামক বিমা যোজনার উপরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সঁপে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইতিপূর্বে স্বাস্থ্যসাথী বিমা প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষ যে পরিষেবা পেতেন, বর্তমানে তা আয়ুষ্মান ভারতের মাধ্যমে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, আগে যেখানে ১০ কোটির উপরে মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পেতেন, বর্তমানে সেখানে মেরে কেটে ৭ কোটি মানুষ এই প্রকল্পের সুবিধা পেতে পাবেন। ফলে বিপুল অংশের নিম্নবিত্ত দরিদ্র মানুষ এই প্রকল্প থেকে বাদ পড়ে যাবেন। আবার সরকারি হাসপাতালে পরিকাঠামো না থাকার জন্য সেখানেও উপযুক্ত মানের চিকিৎসা তাঁরা পাবেন না।
পঞ্চমত, এই বাজেটের মাধ্যমে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) নীতির উপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কিছু মেডিকেল ট্যুরিজম তৈরি করা হবে। যেখানে বেসরকারি মালিকদের সহযোগিতায় অত্যাধুনিক সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই সব পরিকাঠামো গড়ে তুললেও সেখানে মানুষ সম্পূর্ণ ফ্রি চিকিৎসা পাবেন না। মুনাফা লুটবে কর্পোরেট।
ষষ্ঠত, পাঁচটি আন্তর্জাতিক স্তরের স্বাস্থ্য পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে যা মূলত পিপিপি নীতিতে তৈরি হবে। অর্থাৎ জনগণের ট্যাক্সের বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে ওই সব পরিকাঠামো তৈরি হলেও মূলত কর্পোরেট ব্যবসায়ীরাই সেখান থেকে ব্যবসা করার সুযোগ পাবে।
সপ্তমত, রোগীর পথ্যে বরাদ্দ প্রায় ডবল করাকে স্বাগত জানিয়েও বলছি তা যে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে যথেষ্ট নয় তা চিকিৎসক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অজানা নয়। এ ছাড়া ঠিকাদারদের চুরি দুর্নীতি বন্ধ না করলে রোগীদের কাছে এর সুফলও পৌঁছবে না।
অষ্টমত, মুম্বাই, ভেলোরে বাংলার রোগীদের জন্য পিপিপি মডেলে গেস্ট হাউস বানানো পশ্চিমবাংলার স্বাস্থ্য পরিষেবার দৈন্য দশার চিত্রকেই প্রকট করে তোলে। বরং রোগীদের বাইরে যাওয়া রুখতে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান উন্নয়নে সরকার মন দিলে, চুরি দুর্নীতি স্বজনপোষণ বন্ধ করলে, স্বচ্ছ ট্রান্সফার ও পদোন্নতি নীতি চালু করলে, দালাল চক্র খতম করলে, সরকারি বেড বৃদ্ধি করলে, ওষুধ ও সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানো হলে বাংলার রোগীদের অন্য প্রদেশে যেতে হবে না।
এই ভাবে সমস্ত দিক থেকে এই স্বাস্থ্য বাজেটের মধ্য দিয়ে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে বেসরকারি ও কর্পোরেট মালিকদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষিত হয়েছে। পাশাপাশি যতটুকু স্বাস্থ্যপরিকাঠামো ছিল তার উন্নয়নের লক্ষ্যে বা যে বিপুল ঘাটতি রয়েছে তা পূরণের ক্ষেত্রে এই বাজেটে তেমন কিছুই বরাদ্দ করা হয়নি। বলা বাহুল্য অর্থের অভাবে এই সব বুনিয়াদি স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এক সময় ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। মুনাফা লুটবে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা।