
এ বার বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বিজেপি সবচেয়ে বেশি গলা চড়িয়েছিল অবৈধ অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে। সিএএ-র আওতার বাইরের অনুপ্রবেশকারীদের– সোজা কথায় বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়া মুসলমানদের ‘ডিটেক্ট’ ও ‘ডিলিট’ করে তারপর তাদের ‘ডিপোর্ট’ করে দেওয়ার হুঙ্কার তাদের প্রায় প্রতিটি প্রচারসভাতেই শোনা গেছে। অনুপ্রবেশকারীদের ডিটেক্ট তথা চিহ্নিত করে তাঁদের ডিলিট অর্থাৎ ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য রাজ্য জুড়ে প্রবল শোরগোল তুলে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ‘এসআইআর’-এর বুলডোজার চালিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার দেওয়া কেউই সমর্থন করে না। কিন্তু এসআইআর-এর অজুহাতে উপযুক্ত নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ বৈধ নাগরিককে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেগে দিয়ে ‘বিচারাধীন’ রেখে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষকে কোনও কারণ ছাড়াই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ভোট দিতে পারেননি। বলা বাহুল্য, বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বলি, চরম অন্যায়ের শিকার এই মানুষগুলির বেশিরভাগই ধর্মে মুসলমান।
এই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভবিষ্যৎ ‘ট্রাইবুনাল’ নামক প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা একটি প্রক্রিয়ার ভরসায় ঝুলিয়ে দিয়ে হয়ে গেল এ বারের বিধানসভা নির্বাচন, প্রায় নজিরবিহীন ভাবে। এত সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেসের অপশাসন ও চুরি-দুর্নীতিতে অতিষ্ঠ রাজ্যের জনসাধারণ বিপুল ভোটে জিতিয়ে ক্ষমতায় এনেছে বিজেপিকে। এই ভোট যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বহু সংখ্যালঘু মানুষও আছেন। অথচ সরকারে বসেই বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীকে আবার প্রবল উৎসাহে অনুপ্রবেশ ইস্যু নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এবং দেখা যাচ্ছে, তাঁর আক্রমণের মূল লক্ষ্য যথারীতি মুসলমান ধর্মের মানুষরাই, যাঁদের সিএএ-র আওতায় রাখা হয়নি। ২১ মে হাওড়ায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বড়কর্তাদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের বলেছেন– ‘‘পুলিশ কমিশনারকে এবং আরপিএফ-কে সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছে, হাওড়া স্টেশন থেকে সিএএ-র আওতায় পড়েন না এমন বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়লে কোর্টে পাঠাবেন না। … সোজা বনগাঁ-পেট্রাপোল সীমান্তে, নইলে বসিরহাটে বর্ডার আউটপোস্টের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন’’ (দ্য টেলিগ্রাফ, ২২ মে, ‘২৬)।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ফরমানে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অফিসাররাও স্তম্ভিত। সন্দেহভাজন একজন মানুষ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তিনি ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ কি না– তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব আদালতের, পুলিশের নয়। আইন অন্তত তাই বলে। কিন্তু সেই চিরাচরিত নিয়মের তোয়াক্কা না করে, সন্দেহ হলেই কাউকে, কোর্টে গিয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগটুকুও না দিয়ে, সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশের অর্থ– মুখ্যমন্ত্রী আইনের ধার ধারেন না। আইনের একটি বুনিয়াদি কথা হল, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সেই সুযোগ থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। একজন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান– তাঁর মুখ থেকে এমন বেআইনি নির্দেশ রাজ্যের জনগণের পক্ষে অত্যন্ত হতাশাজনক।
গত বছর কয়েক ধরেই বিজেপি দেশ জুড়ে অনুপ্রবেশ নিয়ে ব্যাপক শোরগোল তুলে চলেছে। তারা দেখাতে চায়, বেকারি, মূল্যবৃদ্ধি, শিক্ষা-চিকিৎসার অভাবের মতো জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, দেশের মূূল সমস্যা আসলে অনুপ্রবেশ। বিশেষ করে নিজেদের শাসনাধীন রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী হলেই তাকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দিয়ে নিজেদের এই ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারকে সত্য বলে দেখাতে চেয়েছে বিজেপি। রাজ্যে রাজ্যে স্রেফ অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে দুষ্কৃতীদের হামলায় প্রাণ গেছে বেশ কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিকের। গত বছর জুন মাসে বীরভূম থেকে দিল্লিতে কাজ করতে যাওয়া সুনালী খাতুন, তাঁর স্বামী, নাবালক পুত্র, প্রতিবেশী সুইটি বিবি ও তাঁর দুই পুত্র সহ কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিককে স্রেফ সন্দেহের বশে অনুপ্রবেশকারী বলে দেগে দিয়ে, নথিপত্র কোর্টে যাচাই করার সুযোগ না দিয়েই সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। অপরাধ– তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলেন। শেষে দেশজোড়া প্রতিবাদের চাপে ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ডিসেম্বরে বীরভূমের চার পুরুষের বাসিন্দা বৈধ ভারতীয় নাগরিক আট মাসের গর্ভবতী সুনালী খাতুন ও তাঁর নাবালক পুত্রকে দেশে ফেরাতে বাধ্য হয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও সেই সময় বাংলাদেশে থেকে যেতে বাধ্য হন সুনালীর স্বামী দানিশ শেখ, সুইটি বিবি ও তাঁর ছেলেরা। শেষে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ২২ মে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এঁদেরও আগামী ১০ দিনের মধ্যে দেশে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
সুনালী খাতুন, সুইটি বিবিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সুপ্রিম কোর্টের আদেশে প্রমাণ হল, অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে বিজেপির প্রচারের পিছনে অন্য ধর্ম, বিশেষ করে মুসলমান ধর্মের মানুষের প্রতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক বিদ্বেষ যতটা রয়েছে, বাস্তব সত্য ততটা নেই। ফলে এই ঘটনায় গোটা দেশের সামনে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মাথা নিঃসন্দেহে নিচু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এর পরেও পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সেই একই বেআইনি ফরমান জারি করছেন কোন বিবেচনায়? তাঁর ভোলা উচিত নয়, রাজ্যের মানুষ– হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বিপুল ভোটে তাঁদের জয়ী করেছে। মানুষ চায় শিল্প স্থাপন, মূল্যবৃদ্ধি রোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো যে সব প্রতিশ্রুতি বিজেপি ভোটের আগে দিয়েছিল, নতুন সরকার এ বার একে একে সে সব পূরণ করার ব্যবস্থা করুক। তার বদলে অনুপ্রবেশ নিয়ে অকারণ হইচই বাধিয়ে, বেআইনি নির্দেশ জারি করে মুখ্যমন্ত্রী যদি জনজীবনের মূল সমস্যাগুলিকে আড়াল করার চেষ্টা করেন, রাজ্যের মানুষ তা ভাল ভাবে নেবে না।