Breaking News

রুটি রুজি দেওয়ার বদলে তা কেড়ে নিচ্ছে নতুন সরকার

পুনর্বাসন ছাড়াই হকার ও বসতি উচ্ছেদের প্রতিবাদে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর ডাকে জয়নগরে প্রতিবাদ মিছিলে শামিল রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য সহ নেতৃবৃন্দ। ২৪ মে

নতুন সরকার মানে কি মাথার উপরের ছাউনিটুকু, জীবিকা অর্জনের উপায়টুকুকেও গুঁড়িয়ে দেওয়া, সন্তান-পরিবারকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে প্রকাশ্য রাস্তায় বসে থাকার ব্যবস্থা! অন্তত যে হাজার হাজার হকার এবং রেল সহ নানা বস্তির মানুষদের উচ্ছেদ করা শুরু করেছে রাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার, তাদের জীবনে এর আর অন্য কোনও মানে নেই। এমন কথাই বারে বারে উঠে এসেছে শিয়ালদহ, হাওড়া, বেলঘরিয়া, সোনারপুর, পার্ক সার্কাস প্রভৃতি রেল স্টেশনের দোকানদার এবং ঝুপড়িবাসীদের বক্তব্যে।

শিয়ালদহ দক্ষিণ স্টেশনের ঘুঘনি, মুড়ি বিক্রেতা অরুণ মণ্ডল বললেন, এক সময়ে আমার বাবা বসতেন এই দোকানে। এই দোকানের উপরই নির্ভর গোটা পরিবারের। সমস্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে রেল পুলিশ। জিনিসপত্র সরানোর সময়টুকুও দেয়নি। এটাই কি আমাদের নতুন সরকারের উপহার! আমরা এখন যাব কোথায়? খাব কী? শিয়ালদহ উত্তর স্টেশনের ঝালমুড়ি বিক্রেতা অনিল নাইয়া ক্ষোভের সাথে বললেন, জানি না, ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী যে দোকান থেকে ঝালমুড়ি খেয়েছিলেন, সেটি বৈধ নাকি অবৈধ। কিন্তু রেল পুলিশ অন্য অনেক দোকানের মতো আমার ঝালমুড়ির দোকানটিও ভেঙে দিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা আর পড়াশোনা করতে পারবে না। বললেন, হকারদের কথা একটু ভাবলে সরকারের কি উচিত ছিল না বিকল্প ব্যবস্থা করা! আমরা তো এ দেশেরই নাগরিক। বললেন, আশ্চর্যের বিষয়, আমি এ বার বিজেপিকেই ভোট দিয়েছি। এখন ভাবছি, ভুলই করেছি। চিনতে পারিনি।

অন্য চিত্রও দেখা গেছে। জয়নগর সহ বহু স্টেশনে হকাররা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে আটকে দিয়েছেন উচ্ছেদ অভিযান। বলেছেন, বুলডোজার চালাতে হলে আমাদের বুকের উপর দিয়ে চালাতে হবে।

রাজ্য জুড়ে আজ হাজার হাজার রেল হকার, স্ট্রিট হকার, ভ্রাম্যমান হকার প্রভৃতি পেশায় নিযুক্ত এমন জীবিকা হারানো মানুষের হাহাকার বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাস্তবে হকারি পেশায় নিযুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুদ্র শিল্প এবং কুটির শিল্পে নির্মিত মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এবং সস্তায় খাবার পরিবেশন করে আর্থিক সংকটের মধ্যেও কোনওক্রমে সংসার প্রতিপালন করে থাকেন। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা সহ দৈনন্দিন বেঁচে থাকার রসদটুকু সংগ্রহ করেন এই জীবিকার মাধ্যমে। পাশাপাশি বন্ধ কারখানার শ্রমিক, গ্রামীণ ভূমিহারা মানুষ, জনসাধারণের পরিশ্রম, অর্থে গড়ে ওঠা রেল ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। রেল লাইনের পাশে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীন লক্ষ লক্ষ মানুষ বসবাস করে নগর জীবনে পরিচারিকার কাজ, সাফাই কর্মীর কাজ, অটো টোটো-রিক্সা চালক এবং লোডিং আন-লোডিংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এঁদের উপরেও এই সরকারের আরপিএফ এবং রেল কর্তৃপক্ষ নামিয়ে এনেছে নজিরবিহীন আক্রমণ।

হকার আইন ২০১৪ (প্রোটেকশন অফ লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন) থাকা সত্ত্বেও পূর্বতন তৃণমূল সরকার গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে নিয়ে টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন করেনি এবং বর্তমান বিজেপি সরকারও ভেন্ডিং কমিটি গঠনের উদ্যোগ এখনও নেয়নি। বারবার দাবি করা সত্ত্বেও সরকারের সকল স্তরের আধিকারিকদের জানানো সত্ত্বেও রাজ্য সরকার উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এমনকি হকার আইন ২০১৪ অনুযায়ী রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও বিধি (রুল) তৈরি করা হয়নি। অর্থাৎ সরকার আইনের কোনও তোয়াক্কা না করেই বুলডোজার দিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। কার স্বার্থে এই গরিব নিধন?

বাস্তবে সংকট জর্জরিত বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের আজ দেশের শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত কোনও অংশের যুবকদেরই কাজ দেওয়ার ক্ষমতা নেই। মুনাফাভিত্তিক বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন-জীবিকা আজ মুষ্টিমেয় ধনকুবেরের হাতের মুঠোয় বন্দি। এই অবস্থায় বন্ধ কলকারখানার শ্রমিক, গ্রামীণ জীবনে ভূমিহারা মানুষকে বাধ্য হয়ে হকারিকে পেশা হিসাবে বেছে নিতে হয়। এই কাজ ছাড়া জীবিকা অর্জনের দ্বিতীয় রাস্তা তাঁদের নেই। পাশাপাশি রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষ, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুটো টাকা রোজগারের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যাঁদের পথে থাকতে হয়, এই হকারদের কাছ থেকে পাওয়া সস্তা দরের খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাদের ভরসা। রেলস্টেশন ও রাস্তার দু’পাশে হকাররা না থাকলে শ্রমজীবী জনতার এই অংশটিও ঘোর বিপদে পড়বেন।

হকার সমস্যা পুঁজিবাদী শাসন-শোষণেরই ফল। অথচ সরকার আজ বৈধ-অবৈধ প্রশ্ন তুলে, উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে বিরাট অংশের মানুষের জীবিকার অধিকার, বাঁচার অধিকারকেই কেড়ে নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যে উন্নয়ন মানুষের বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয় তা তাহলে কার উন্নয়ন। যে রাষ্ট্র মানুষকে কাজ দিতে পারে না, মাথার উপর একটু ছাদ দিতে পারে না, তার কি অধিকার রয়েছে ন্যূনতম রুজির, কোনও ক্রমে বেঁচে থাকার মতো আস্তানাকেও এ ভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার? তা হলে সে রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করছে?

বাস্তবে রেল কর্তৃপক্ষ রেল প্লাটফর্মে বহুজাতিক সংস্থা ও বৃহৎ ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করবার সুযোগ করে দিচ্ছে। এমনকি গোটা রেল ব্যবস্থাকেই নানা অংশে বিভক্ত করে তা বেসরকারি মালিকদের হাতে তুলে দিয়ে ব্যবসা করে অবাধ মুনাফা লুটবার সুযোগ করে দিচ্ছে। দেশের পুঁজিপতিরা রেল, স্ট্রিট ও ভ্রাম্যমান হকারদের এই বিশাল বাজার দখল করতে চায়। দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের স্বার্থেই সরকার আজ হকার উচ্ছেদ করছে।

হকার উচ্ছেদ পুঁজিবাদী সরকারের একটি কর্মসূচি। পুঁজিপতিদের স্বার্থরক্ষায় শাসক দলগুলি নানা রাজ্যে এ কাজ করে চলেছে। অতীতে সিপিএম সরকারও ‘অপারেশন সানসাইন’ নাম দিয়ে হকারদের জীবন-জীবিকা কেড়ে নিয়েছে। একদা তৃণমূল হকার উচ্ছেদের বিরোধিতা করলেও ক্ষমতাসীন হয়ে জেলায় জেলায় হকার উচ্ছেদ করেছে। হকারদের বুঝতে হবে, এই আক্রমণ শ্রমজীবী মানুষের উপর পুঁজিপতি শ্রেণির আক্রমণ।

পাশাপাশি, সমাজের যে আপাত সচ্ছল অংশ, যাঁরা কোনও রকম বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই এই উচ্ছেদকে সমর্থন করছেন, সরকারকে বাহবা দিচ্ছেন, তাঁদের একটা বিষয় ভেবে দেখতে হবে। আপাত সুরক্ষিত অবস্থান থেকে সহনাগরিকদের সম্পর্কে তাঁদের এই আচরণ কি আসলে তাঁদের বিবেক এবং মনুষ্যত্বের উপরই এক অদৃশ্য বুলডোজার চালানোর অনুমতি সরকারের হাতে তুলে দেওয়া নয়? এক অংশের মানুষের উপর সরকারের এই স্বেচ্ছাচারী আচরণ যদি সামাজিক সমর্থন পেয়ে যায় তবে আগামী দিনে অন্য এক অজানা দিক থেকে তাদের উপর হঠাৎ এসে পড়া কোনও আক্রমণের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষ তাঁরা সমাজে খুঁজে পাবেন তো!

এআইইউটিইউসি অনুমোদিত অল বেঙ্গল হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি মধুসূদন বেরা এবং সম্পাদক শান্তি ঘোষ সরকারের এই দানবীয় আচরণের তীব্র বিরোধিতা করে হকার, বস্তিবাসী সহ সমস্ত আক্রান্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই আক্রমণকে প্রতিহত করার ডাক দিয়েছেন। অবিলম্বে এই উচ্ছেদ বন্ধ করে মানবিক দৃষ্টিতে বিষয়টিকে দেখার জন্য তাঁরা রাজ্যপালকে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন।