রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ না থাকলেকু-কথাই সম্বল

বিজেপি’র প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সম্প্রতি লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে যে কদর্য মন্তব্য করেছেন, তাকে ‘নজিরবিহীন’ বলা গেলে ভালো হত। কিন্তু কঠিন বাস্তব হল, শাসক ও বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের এরকম ভুরি ভুরি উক্তি রয়েছে। ভোট কেনাবেচা এবং দল-বদলের মতোই বিশেষত ভোটের আগে নেতা-নেত্রীরা একে অপরের দিকে কুকথা ছুঁড়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবেন, এও যেন ভোটের রাজনীতিতে খানিকটা স্বাভাবিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। দিলীপ ঘোষের মতো ‘রত্ন’রা মাঝেমধ্যেই এরকম বিতর্কিত মন্তব্য করাটাকে হয়তো নতুন করে সংবাদ শিরোনামে উঠে আসার সহজ পথও ঠাউরেছেন। বড় বড় দলগুলোর নীতিহীনতা, চুরি-দুর্নীতি, পরস্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি, গদি দখলের জন্য যে কোনও অনৈতিক পথ অবলম্বন করা তো আজ প্রায় রোজকার ঘটনা। তাও এই সবকিছুর সাথে কোনও মহিলার প্রতি অশালীন মন্তব্য বা ইঙ্গিত করার যে গুণগত তফাতটুকু ছিল, দিলীপ ঘোষরা সেটুকুও মুছে ফেলে রাজনীতির মর্যাদা একেবারে মাটিতে মিশিয়ে দিতে একেবারে বদ্ধপরিকর। বিজেপি দলটির সাম্প্রতিক এবং অতীত ইতিহাসে বিরোধীদের সম্পর্কে, একটি বিশেষ সংখ্যালঘু ধর্মের মানুষ সম্পর্কে কদর্য, অসংবেদনশীল মন্তব্যের উদাহরণ কষ্ট করে খুঁজতে হয় না। কিন্তু এ জিনিস বিজেপি দলটির একক সম্পত্তি, এমন কথাও বলা যাচ্ছে না।

বিগত কয়েক দশকে শুধু এ রাজ্যের রাজনৈতিক ঘটনাক্রমে চোখ রাখলে, মহিলা সহ সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতি, বিরোধীদের প্রতি বিভিন্ন দলের নেতাদের কুৎসিত মন্তব্যের তালিকা খুব ছোট হবে না। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নানা সময় বিজেপি নেতাদের লক্ষ্য করে কুকথা বলতে ছাড়েননি। নব্বই সালে বাসভাড়া বিরোধী আন্দোলনের ময়দানে এসইউসিআই(সি) কর্মী আঠেরো বছরের মাধাই হালদারের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত দেহ যখন পড়ে আছে, তখন ‘নিরামিষ আন্দোলনকে আমিষ করে দিলাম’ বলে চূড়ান্ত অসংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন বামফ্রন্ট সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। ২০১১ তে সিপিএম নেতা অনিল বসু তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে আজকের দিলীপ ঘোষের সুরেই নোংরা ইঙ্গিত করেছিলেন। পরে তিনি ক্ষমা চান, যেমন এই ভোটের বাজারে দিলীপ ঘোষকে লোকদেখানো তিরস্কার করতে বাধ্য হয়েছে তাঁর দল। কিন্তু ভেবে দেখা দরকার, কোনও কথা মুখ থেকে বেরোনোর আগে তৈরি হয় মনে। যে মন মহিলাদের সম্পর্কে এমন অশালীন কথা ভাবতে পারে, বিরোধীদের জব্দ করার জন্য যে কোনও অন্যায়কে যে মন মান্যতা দেয়, ক্ষমা চাওয়া বা দুঃখপ্রকাশ দিয়ে তার পচন আড়াল করা যাবে কি? যে রাজনীতি এমন মানসিকতাকে প্রশ্রয় দেয়, তার কদর্যতাও তো দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার।

এক সময় সমাজের সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল মানুষরা রাজনীতিতে আসতেন। ক্ষুদিরাম বসু, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, মাস্টারদা সূর্য সেন, বিনয়-বাদল-দীনেশ, গান্ধীজী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এঁরা ছিলেন দেশের রাজনৈতিক চরিত্র। মত ও পথের পার্থক্য থাকলেও রাজনীতিতে সেদিন একটা সৌজন্য-সহবত এর জায়গা ছিল, রাজনীতির মানুষরা ছিলেন সাধারণের শ্রদ্ধার পাত্র। পরবর্তীকালে বৃটিশের জায়গায় ক্ষমতা দখল করল দেশের পুঁজিমালিকরা। ক্ষমতায় বসা রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর গদিতে বসে দেশসেবার নামে এই পুঁজির দাসত্বই করে যাচ্ছে। এই পুঁজির শাসন ও শোষণ টিকিয়ে রাখার পথে প্রধান অন্তরায় হল মানুষের মনুষ্যত্ব, যুক্তিবোধ, উন্নত সংস্কৃতি, প্রতিবাদ করার মানসিকতা। তাই কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম সহ এইসব ভোটসর্বস্ব দলগুলোর অভ্যন্তরে রুচি সংস্কৃতি, নীতি আদর্শের বালাই একেবারে উঠে গেছে। সমাজ পরিসরে এবং রাজনীতিতে আজ মূল্যবোধের এক বিরাট শূন্যতা, নৈতিকতার ধস।

বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক, এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের প্রতিষ্ঠাতা শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, কোনও রাজনৈতিক আদর্শ সত্যিই উন্নত কিনা, মহৎ কিনা তা চেনা যায় ওই রাজনীতির সাথে যুক্ত মানুষগুলোর নৈতিক চরিত্র, রুচি-সংস্কৃতির উন্নত মান দিয়ে। রাজনীতি উচ্চ হৃদয়বৃত্তি, বিপ্লবী রাজনীতি উচ্চতর হৃদয়বৃত্তি। তাঁর এই শিক্ষা বুকে নিয়েই এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের কর্মীদের গড়ে ওঠা। এই দলের কর্মীদের নিষ্ঠা, সততা, রুচিবোধ দেখে মানুষ বিস্মিত হন, ভালোবাসেন। আবার অনেকে হতাশার সুরে বলেন, ‘আপনারা ঠিকই বলছেন, তবে এখন দিন বদলে গেছে, আজকাল আর নীতি-আদর্শের কথা মানুষ শুনতে চায় না।’ দিনকাল কেন বা কীভাবে এমন বদলে গেল, রাজনীতির মূল স্রোত থেকে নীতি আদর্শের চর্চা কেন হারিয়ে গেল, জীবন-যুদ্ধে জেরবার মানুষ অতশত ভেবে দেখেন না। আর এই ভেবে না দেখার মাশুল সাধারণ মানুষকেই চোকাতে হয়, বারবার হতাশ, বীতশ্রদ্ধ হতে হয়। রাজনীতি খারাপ এই দোহাই দিয়ে যারা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান, তাঁদের নিষ্ক্রিয়তা, নীরবতাও পরোক্ষে এই নীতিহীন রাজনীতির বাড়বাড়ন্তকেই প্রশ্রয় দেয়। তাই আজ যারা রাজনীতিতে সৌজন্য, রুচিবোধ, সুস্থতা সত্যিই দেখতে চান, তাঁদের বুঝতে হবে, শুধু দিলীপ ঘোষদের নিন্দা করাই যথেষ্ট নয়। মূল্যবোধ-আদর্শের এই সংকটের যুগে, কলুষিত রাজনীতির ভিড়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার মতো একমাত্র যে দলটি নীতি-আদর্শভিত্তিক রাজনীতির পতাকা বহন করে গণআন্দোলনের ময়দানে লড়ছে, সেই এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের বিপ্লবী রাজনীতিকে শক্তিশালী করাই একমাত্র পথ।