
সনাতন শাস্ত্রমতে সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর যুগ অতিক্রান্ত হইয়া এ ক্ষণে কলিযুগ চলিতেছে। শাস্ত্রবাক্য মিথ্যা হইবার নহে। কলিযুগে ক’টি অবতার আবির্ভূতও হইয়াছেন এবং প্রবল বেগে বিধর্মী সংহার করিতেও শুরু করিয়াছেন। আজিকার ক’টি অবতারের শত্রু হইতেছে তাহারা, যাহারা খাইতে না পাইয়া, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙনে ঘর হারাইয়া ‘শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কষ্ট ক্লিষ্ট প্রাণ কোনওমতে বাঁচাইয়া’ রাখিবার দুর্মর স্পর্ধা লইয়া শহরের রেলস্টেশনের ধারে বা খালের ধারে একচিলতে ঝুপড়ি বানাইয়া একবেলা আধপেটা খাইয়া না খাইয়া, রোগ হইলে বিনা চিকিৎসায় মরিয়া বহির্বিশ্বে ভারতের নাম খারাপ করিয়া দিতেছে। বিদেশি শত্রুদের সহিত চক্রান্ত করিয়া ইহারা ক্ষুধার্ত থাকিয়া বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২৫টি দেশের তালিকায় ভারতের নাম ১১৭ নম্বরে নামাইয়া লইয়া গিয়াছে। দেশদ্রোহ আর কাহাকে বলে! তাই তাহাদের উচিতশিক্ষা দেওয়ার জন্য তাহাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, জীবনজীবিকার উপর মহাবিক্রমে বুলডোজার চালাইয়া দেওয়া হইতেছে। কিন্তু উন্নয়ন বিমুখ দেশদ্রোহীরা ইহার বিরুদ্ধেও চেঁচাইতেছে। ইহারা দেশের কিছুই ভালো দেখিতে পায় না। সাধারণ লোকেও স্পষ্টই বলিতেছে, ‘গরিবের পেটে এই ভাবে লাথি মারাটা ভালো হইতেছে না’। এই যে লোকে গরিব বিনাশের বিরোধিতা করিতেছে ইহার কারণ কিন্তু অত্যন্ত গভীর। ভারতের নবজাগরণ হইতে স্বাধীনতা সংগ্রাম, তাহারও পরে সত্তর বছর হিন্দুত্ববাদীরা একটু যোগনিদ্রায় নাক ডাকাইতেছিলেন। সেই অবসরে প্রগতিশীল বামপন্থীরা জনসাধারণের মাথাটি চিবাইয়া খাইয়াছে। ‘গরিব মানুষের স্বার্থ’, ‘সৎ পথে দুটা করিয়া খাওয়া’র অজুহাত দিলে এ দেশের অতি বড় আত্মকেন্দ্রিক মানুষও কীরকম গলিয়া যায়। কহে, ‘তাইতো, ইহারা যাইবে কোথায়, খাইবে কী? নিষ্পাপ, অবোধ ছোটো ছোটো শিশুগুলির কী হইবে’? এ সমস্তই গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, মানবাধিকার, মানবিকতা প্রভৃতি বিদেশি দর্শনের কুফল। ইহা সকল ভারতবাসীকে ভুলাইতে হইবে। বলিতে হইবে দেখ, ‘আমাদিগের প্রাচীন দর্শন, ‘কা তব কান্তা, কস্তে পুত্র’? স্ত্রী, পুত্র কেহই তোমার নহে। সকলই মায়া। সে সকলই ভুলিয়া যাও।
আর স্টেশনের অপরিচিত গরিব হকার, বস্তিবাসী, সীমান্তে ঠেলিয়া ফেলা অসহায় প্রান্তিক বৃদ্ধ হইতে অশ্রুসজল কিশোরী– ইহারাই বা তোমার কে? উহাদের হাহাকার, চোখের জলে তোমার কি যায় আসে? তুমিও উনিজির মত সব ভুলিয়া রাজপথে যোগাসনে নির্বিকল্প সমাধিস্থ হইয়া যাও। জীবাত্মার সহিত পরমাত্মার সংযোগ স্থাপন করিয়া তুচ্ছ তুমি, তোমার সুখ, দুঃখ, অভাব, অভিযোগ, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, প্রতিরোধ, লজ্জা, বিবেক সকলই ওই অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্মে লীন করিয়া দাও। দেখ, আমাদের এই যোগদর্শন, তথা ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম কত সুপ্রাচীন! ইউরোপের দর্শন, গণিত, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজশাস্ত্রের প্রবক্তাদের পূর্বপুরুষগণ যখন অসভ্য অবস্থায় বনে জঙ্গলে ঘুরিয়া কাঁচা মাংস খাইত, সেই হাজার হাজার বৎসর পূর্বে আমাদিগের সনাতন শাস্তে্রর জন্ম হইয়াছে। যদিচ ইদানিং অনেক দেশদ্রোহী শত্রু শিবিরের পয়সা খাইয়া বলিতেছে যে, অধিকাংশ সংস্কৃত শাস্ত্রই, এমনকি রামায়ণ মহাভারত পর্যন্ত আসলে গুপ্ত যুগে অর্থাৎ মাত্র দেড় হাজার বৎসর পূর্বে লিখিত হইয়াছে, কিন্তু ইহারা যে মিথ্যা বলিতেছে তাহাতে সন্দেহ নাই। রাখিগড়িতে প্রাপ্ত হরপ্পা সভ্যতার মনুষ্য কঙ্কালের ডিএনএ টেস্টে যখন পরিষ্কার দেখা যাইতেছে যে, তাহাদের মধ্যে মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর কোনও সাদৃশ্য ছিল না, তাহাতেই স্পষ্ট প্রমাণ হইয়া যায় যে, এতাবৎকাল বামপন্থী ও সেকুলাররা ভারতের যে ইতিহাস লিখিয়াছে সব ভুল। এমনকি হরপ্পার যে বিশ্বখ্যাত নর্তকীমূর্তি পাওয়া গিয়াছে তাহার যে ছবি এতদিন বিশ্বে প্রচার করা হইয়াছে তাহা জাল। সনাতন ভারতীয় কোনও নারী পাশ্চাত্যের ন্যুডিস্ট সোসাইটির মতো জামাকাপড় না পরিয়া ছিলেন ইহা প্রচার করা হিন্দুদের বিরুদ্ধে জঘন্য চক্রান্ত। এখনকার ইতিহাস বইতে তাই ওই নর্তকী মূর্তিকে জামা-প্যান্ট পরাইয়া দেওয়া হইয়াছে। যদিও জামা-প্যান্টও আধুনিক পশ্চিমা ধাঁচের, তাহাতে দোষ নাই। নাই মামার চাহিতে কানা মামা ভাল। আর এই সব শিক্ষাসংস্কার তো যেমন তেমন পণ্ডিতেরা করিতেছেন না। গোহাল হইতে গো-সেবা করিয়া আসিয়া পবিত্র পঞ্চগব্যের প্রসাদ খাওয়া পণ্ডিতেরা করিতেছেন। তাঁহারা ইতিহাসের কুয়া খুঁড়িয়া কত নূতন আশ্চর্য আশ্চর্য তথ্য বাহির করিতেছেন। নিউটন পাইলট ছিলেন– ইহা পড়িয়া অনেকে হাসাহাসি করিতেছেন। কিন্তু তাঁহারা তো জানেন না, নিউটন শুধু মাধ্যাকর্ষণ আবিষ্কার করেন নাই। তাঁহার সুবিখ্যাত অবদান গতিসূত্রত্রয়। নিউটন নিজে যদি প্রচণ্ড গতিতে আকাশমার্গে না যাতায়াত করিতেন তাহা হইলে গতিতত্ত্ব তিনি বুঝিতেন কী রূপে? আর গণেশের হস্তিমুণ্ড যে প্রাচীন ভারতে প্ল্যাস্টিক সার্জারির নিদর্শন, কৌরবরা যে জন্মের পর ভ্রূণাকারে ঘৃতকুম্ভে নিমজ্জিত ছিল ইহাও প্রাচীন ভারতে স্টেম সেল প্রযুক্তি জ্ঞাত থাকিবার স্পষ্ট প্রমাণ। যদিও এগুলির সংস্কৃত নাম কী ছিল কে জানে, কেন না সেকুলার এবং বামপন্থীরা মুসলমানদের তোষণ করিবার জন্য সকলই পুড়াইয়া ফেলিয়াছে। তবুও যাই যাই করিয়া এই যোগশাস্ত্রটুকু টিকিয়া আছে। অবশ্য দেশদ্রোহীরা বলিতেছে হিন্দুত্ববাদীদের কোনও কৃতিত্ব নাই।
পাশ্চাত্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পশ্চিমী দুনিয়ার মানুষ যুদ্ধ বিগ্রহ, খুন জখম এবং দৈনন্দিন জীবনে সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদের নৈমিত্তিক আক্রমণে অশান্ত হইয়া যখন একটু শান্তি খুঁজিতেছিল সেই সময় কিছু সুযোগসন্ধানী ভারতীয় ধর্মগুরু তাহাদের ভারতীয় যোগ ধ্যানের সন্ধান দেন এবং অচিরাৎ তাহা পশ্চিমী দুনিয়ায় জনপ্রিয় হইয়া ইংরেজি ‘ইয়োগা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়। এ দেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠনগুলি বরং লাঠিখেলা তরোয়াল খেলার উপর জোর দিয়াছিল। কেন না তাহাদের আদর্শ হইতেছে মুসলমান শায়েস্তা করা। কিন্তু এ ক্ষণে বুলডোজার ধাক্কার উপর আতঙ্কিত ও তিতিবিরক্ত বিক্ষুব্ধ জনমতকে প্রশমিত করিতে হইলে রাজপথে ম্যারাপ খাটাইয়া চক্ষু বুজিয়া একপায়ে খাড়া থাকা ছাড়া আর উপায় নাই। অবশ্য ‘রবিন্দরনাথজি’ বলিয়াছিলেন, ‘ইন্দ্রিয়ের দোয়ার রুধ্ করি ইয়োগাসন সে নেহি হমার’! কিন্তু ওসব কথা এখন মনে করিতে নাই। এখন এক নাক টিপিয়া ধরিয়া অপর নাকে হাওয়া ছাড়ো। ফুস করিয়া হরমুজ প্রণালী খুলিয়া যাইবে। তবেই তো একশো টাকায় গ্যাস মিলিবে!