Breaking News

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিঃ ১৮ কোটি কৃষকের সর্বনাশ করবে, ২১ জুলাই দেশ জুড়ে বিক্ষোভের ডাক কৃষকদের

ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি এক বছরের বেশি স্থগিত থাকার পর ৩ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত হয়েছে। সংসদে কৃষক বিরোধী, জনবিরোধী এবং কর্পোরেট স্বার্থবাহী বাজেট পেশ হওয়ার ঠিক পর পরই এই চুক্তির খবর দেশবাসী জানতে পেরেছিল। পরিহাসের বিষয়, ভারতের সংসদ অধিবেশন চলাকালীনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তির কথা ঘোষণা করেন। এই চুক্তি ভারতের জনগণ বিশেষ করে কৃষকদের ভযঙ্কর ক্ষতি করবে।

মোদি সরকার এখনও এই চুক্তি সম্পর্কে বিশদে দেশের জনগণকে কিছু জানায়নি। কেন এই গোপনীয়তা? চুক্তি সম্পর্কে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উচ্চ পর্যায়ের মার্কিন আধিকারিকদের বক্তব্য থেকে বেরিয়ে এসেছে, প্রথমত, ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করবে এবং ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের উপর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ৫০ শুল্ক ধার্য করেছিল তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, আমেরিকা থেকে ভারতে আমদানিকৃত পণ্যের উপর কোনও শুল্ক থাকবে না। আমেরিকা বলছে ভারত আমদানি শুল্ক কমাবে এবং অন্যান্য অ-শুল্ক প্রাচীর তুলে দেবে।

তৃতীয়ত, ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত আমেরিকা থেকে আগামী ৫ বছরে ৪৫.৫ লক্ষ কোটি টাকার পণ্য কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে।

এই চুক্তির কী প্রভাব পড়বে জনজীবনে? খাদ্যশস্য এবং জেনেটিকালি মডিফায়েড সয়াবিন সহ সমস্ত মার্কিন কৃষিপণ্য এ দেশের বাজারে ঢোকার সব ব্যবস্থা ভারত সরকার করে দেবে। মার্কিন আধিকারিকরা আশা করছেন, এর ফলে ভারতের সাথে তাদের দেশের কৃষি বাণিজ্যের যে ১.৩ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি আছে, তা অনেকটা কমে যাবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে তাতে বলা হচ্ছে, ব্যাপক ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার খুলে দেওয়া হবে। এর ফলে ভারতের ডেয়ারি ফার্মারদের বছরে ১.০৩ লক্ষ কোটি টাকা ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দু*জাত পণ্য আমদানিতে ৫৫ থেকে ৮১ শতাংশ হারে শুল্ক চাপানো আছে। এই চুক্তির ফলে এ ক্ষেত্রে কোনও আমদানি শুল্ক থাকবে না এবং এই পথ ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্টে্রর সস্তার দুগ্ধজাত পণ্য এ দেশের বাজার দখল করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি সচিব উল্লসিত হয়ে বলেছেন, এই চুক্তি আমেরিকার পক্ষে একটা বিরাট জয়। এর ফলে ভারতের বিরাট বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্য রপ্তানি করে আমেরিকার ধনী চাষিদের পকেটে প্রচুর নগদ টাকা ঢুকবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের ডেয়ারি চাষিরা।

খবর পাওয়া যাচ্ছে, ভারত সরকার মার্কিন পণ্যের আমদানি শুল্ক কমাতে বা একেবারে তুলে দিতে এবং আমদানিকৃত কৃষিপণ্যের উপর অন্যান্য অ-শুল্ক বাধা তুলে দিতে সম্মত হয়েছে। কাজুবাদাম এবং পেস্তা বাদামের বাজার ভারতে সুবিস্তৃত এবং ২০২৪ সালে আমেরিকা থেকে ভারত ১.১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এই সব পণ্য আমদানি করেছে। মার্কিন দেশ থেকে ডাল আমদানির ক্ষেত্রে বর্তমান শুল্কের হার ৩০ শতাংশ। সেই শুল্কও কমানো বা একেবারে তুলে দেওয়া হবে। এর ফলে ভারতের কৃষক সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ কী ভয়ানক হতে পারে তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। সকলে জানেন ব্রিটেনের সাথে কয়েক মাস আগে ইএফটিএ স্বাক্ষরিত হওয়া এবং তার পরবর্তীকালে সমস্ত ধরনের তুলোর উপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক কমিয়ে আনার ফলে বাজারে তুলোর দাম অত্যন্ত কমে গেছে এবং ভারতীয় তুলো চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই বাণিজ্য চুক্তির ফলে এ দেশের সয়াবিন, ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনকারী কৃষক এবং দুগ্ধ উৎপাদকদের সর্বনাশ হবে। কিন্তু এই সব কৃষিপণ্য নিয়ে কারবার করে এমন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক একচেটিয়া পুঁজিপতিদের, বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মালিকদের কোনও ক্ষতি হবে না। তারা কম দামের মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করবে, বেশি দামে বিক্রি করবে এবং বিপুল পরিমান মুনাফা লুটবে। এই বাণিজ্য চুক্তিতে লাভ হবে আমেরিকার কৃষি কর্পোরেট হাউসের এবং ভারতের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের, যারা কৃষিজাত দ্রব্যের় আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করে। ধ্বংস হবে এ দেশের কৃষকরা। ভারতে দুগ্ধজাত দ্রব্য উৎপাদনের সাথে যুক্ত প্রায় ১০ কোটি কৃষক। আর সয়াবিন ও ডাল উৎপাদনের সাথে যুক্ত কৃষকের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ কোটি ও ৫ কোটি। সরাসরি ১৮ কোটি কৃষকের সর্বনাশ হবে। এর সাথে যুক্ত হবে অপ্রত্যক্ষ ভাবে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। দেশের অনাহারক্লিষ্ট মানুষের সংখ্যা একলাফে বেড়ে যাবে অনেকটা।

এই সর্বনাশা আক্রমণ প্রতিরোধ করতে আগামী ২১ জুলাই দেশব্যাপী জেলা স্তরে প্রতিবাদ বিক্ষোভের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে দেশের সংগ্রামী কৃষক ও খেতমজুর সংগঠন এ আই কে কে এম এস। দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতির সর্বোচ্চ মুনাফার স্বার্থে সরকার দেশের কৃষক-শ্রমিকদের স্বার্থ বিপন্ন করতে এতটুকু দ্বিধাবোধ করে না। এরা পুঁজির সেবক। এই পুঁজির আক্রমণের বিরুদ্ধেই কৃষকদের বাঁচার সংগ্রাম।