বিশ্ব বিপ্লবই শোষণমুক্তির একমাত্র পথ (২) — কমরেড অসিত ভট্টাচার্য

২৪ এপ্রিল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর ৭৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো আসামেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। এই উপলক্ষে দলের আসাম রাজ্য কমিটির উদ্যোগে গুয়াহাটির রবীন্দ্রভবনে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত এক সভায় দলের পলিটবুরোর প্রবীণ সদস্য কমরেড অসিত ভট্টাচার্য নিচের বক্তব্য রাখেন। বত্তৃতাটি তিনি অসমিয়া ভাষায় দেন। অনুবাদজনিত যে কোনও ত্রুটির দায়িত্ব আমাদের। – সম্পাদক, গণদাবী

(২)

সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন শুধু সোভিয়েতের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর জনগণের জীবনে সর্বনাশ নিয়ে আসেনি, সারা বিশ্বের শোষিত নির্যাতিত জনগণের জীবনে সর্বনাশ ডেকে এনেছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক সব দিক থেকেই বিশ্বের সব দেশই যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের মুখে পড়েছিল, সেই অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী সুপার পাওয়ার আমেরিকার বিরুদ্ধে সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নই ছিল একমাত্র ভরসার স্থল। অর্থনীতির দিক থেকে খুবই সমৃদ্ধ এ রকম সুন্দর আকর্ষণীয় একটি রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন, যা শুধু নিজের দেশের মানুষকেই নয়, সারা বিশ্বের মানুষকেই আনন্দ দিয়েছে, তৃপ্তি দিয়েছে, সুখ দিয়েছে, শান্তি দিয়েছে। সেই মহান দেশটিই আধুনিক শোধনবাদের খপ্পরে পড়ে তার সমস্ত সৌন্দর্য এবং শক্তি হারিয়ে ফেলল। শেষ পর্যন্ত প্রতিবিপ্লবের মুখে পড়ে সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ল।

আর একটা কথা, যা সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষের ভিতরে গভীর গৌরববোধ সঞ্চার করেছিল, সেটা হল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের থেকে বড় নয়। এটা সোভিয়েত ইউনিয়নের জনগণকে খুবই আনন্দ দিয়েছিল। এই সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পতন বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনকে খুব দুর্বল করেছে ঠিক, কিন্তু এই পতনের কারণ সেদিন সেখানকার জনসাধারণ ধরতে পারেনি। যদিও ইতিমধ্যে তারা এ কথা বুঝতে শুরু করেছে। জনসাধারণ যখনই ধরতে পারল যে গরবাচেভ, ইয়েলৎসিন, পুতিনরা আসলে সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রতিবিপ্লবী শক্তি, তখন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসাধারণ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার বিরুদ্ধে এখন রাশিয়ার মাটিতে আন্দোলন চলছে। মহান লেনিন-স্ট্যালিনের ছবি বুকে নিয়ে ওখানকার জনগণ প্রতিদিন রাস্তায় বেরিয়ে আসছে। তারা স্লোগান দিচ্ছে– মহান লেনিন জিন্দাবাদ, মহান স্ট্যালিন জিন্দাবাদ, আমাদের সোভিয়েত ইউনিয়ন ফেরত চাই, আমাদের সমাজতন্ত্র ফেরত চাই। অন্য দিকে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশে আন্দোলন, মিটিং-মিছিল কিছুই উল্লেখ করার মতো বিশেষ হত না, সেখানেও আওয়াজ উঠছে, সমাজতন্ত্র চাই, কমিউনিজম চাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন মার্কসবাদের বইপত্র ছাপা হচ্ছে। চিন দেশে সেখানকার পুঁজিবাদী শাসকরা অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কমিউনিজম নামটি ব্যবহার করছে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে। কিন্তু আসলে তারা চূড়ান্ত কমিউনিস্ট বিরোধী। চিন এখন পুরোপুরি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। তারা প্রথম দিকে মানুষের চিন্তাকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক উন্নতির আশ্বাস দিয়েছিল। এখন চিন দেশেও পুঁজিবাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছে। চিনে ক্ষমতাসীন প্রতিবিপ্লবীরা মাও সে তুঙ-এর ছবি ব্যবহার করে নিজেদের কমিউনিস্ট হিসেবে দেখাতে চাইছে। কিন্তু এরাও কম্পিত। এই শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিনের জনগণের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়ে আছে এবং তাকে তারা প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

পুঁজিবাদী দেশে কোথাও গণতন্ত্র নেই

আজ সব পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশেই মূল সমস্যা শোষণ। চাকরি-বাকরি কিছু নেই, কাজ করে, শ্রম শক্তি বিক্রি করে কোনওমতে বেঁচে থাকার নূ্যনতম ব্যবস্থাটুকুও নেই– চূড়ান্ত মূল্যবৃদ্ধি, চূড়ান্ত মুদ্রাস্ফীতি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বৈরতান্ত্রিক, ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা। সারা বিশ্বে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে কোথাও গণতন্ত্র নেই। যে গণতন্ত্র সম্পর্কে একটা সময় বলা হয়েছিল যে, শাসন-ব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রই সবচাইতে ভাল। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে ‘ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, অফ দ্য পিপল’। বুর্জোয়া শাসকরা জোর দিয়ে বলে, তাদের প্রবর্তন করা শাসনব্যবস্থা সর্বোত্তম। কারণ সেটা হচ্ছে সমস্ত জনগণের মুক্ত এবং স্বচ্ছ ভোটে নির্বাচিত ব্যবস্থা বা নির্বাচিত সরকার। এই ধরনের কথা তারা দিনরাত প্রচার করছে। কিন্তু বাস্তবে কী দেখতে পাওয়া যাচ্ছে? রাজনৈতিক সংকট কী রূপ নিয়ে আসছে? শুধু ভারতেই নয়, সারা পৃথিবীতে পার্লামেন্টের স্বরূপ কী? আগে বলা হত পার্লামেন্ট সার্বভৌম, পার্লামেন্ট নির্বাচিত হয় জনসাধারণের ভোটে ৪-৫ বছরের মাথায়। নির্বাচনে জনগণ রায় দেয় শাসনে কাকে রাখবে এবং কাকে উচ্ছেদ করবে। বলা হত, এই হচ্ছে আদর্শ ব্যবস্থা। অতীতে এর প্রবক্তারা বলেছেন গণতন্তে্র জনগণ সুপ্রিম। নির্দিষ্ট সময়ের পরে পরে নির্বাচন হবে, তোমরা ভোট দিয়ে শাসক নির্বাচন করবে, আর যদি কেউ ভাল কাজ না করে, সেই দলগুলোকে বর্জন করে তোমরা নতুন দলকে বেছে নেবে। এটাই ছিল বুর্জোয়া গণতন্তে্রর শুরুর দিকের কথা। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হল না। যখনই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অর্থনৈতিক সংকটের ভিতরে ঢুকল, তখন থেকেই আরম্ভ হল সকল প্রকারের অবক্ষয়–সর্বপ্রকারের সংকট, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংকট পুঁজিবাদকে ঘিরে ধরল। অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হতে হতে আজ এরকম একটা অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, এই সংকট এখন এ বেলা-ও বেলার সংকট। এই অবস্থায় আজ মানুষ ঠিক থাকতে পারছে না। বেঁচে থাকার কোনও উপায় না পেয়ে মানুষ কুকুর-বেড়ালের মতো মরছে। আমাদের দেশেও একই অবস্থা চলছে নিঃশব্দে নীরবে।

এই অবস্থায় গণতন্ত্র– যাকে বুর্জোয়ারা বলেছে তাদের গৌরব, অর্থাৎ নাগরিকরা ভোট দিয়ে সরকার গঠন করে, ফলে সেই সরকার জনগণের সরকার। সেই সরকার জনসাধারণকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সমস্ত প্রকারের সুরক্ষা দেবে– সেই কথাগুলো আজ অলীক কল্পনায় পর্যবসিত হয়েছে। যে নির্বাচন নিয়ে তারা গর্ববোধ করেছিল তার অবস্থা কী পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, তা আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচন তো ৪-৫ বছর পর পর হয়ে আসছে এবং তার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন হয়ে আসছে। কখনও কখনও একটা দলের পরিবর্তে নতুন আর একটা দল জয়ী হচ্ছে। দেশে মোট জনসংখ্যার ৯০-৯৫ ভাগ মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে যতটুকু বিষয় সম্পত্তির অধিকারী ছিল, সেটুকুও ক্রমান্বয়ে হারিয়ে সর্বহারাতে পরিণত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত অসহায়তার মুখে পড়ে বেঘোরে মরছে।

আমাদের দেশই শুধু নয়, একই অবস্থা সারা বিশ্বের। সব পুঁজিবাদী দেশেই সাধারণ মানুষ ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ঘরবাড়ি হারিয়ে ফুটপাতে আশ্রয় নিচ্ছে এবং তাদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই অবস্থা থেকে এমনকি তথাকথিত ধনীতম দেশ বলে খ্যাত আমেরিকাও বাদ নয়। একদিন এদের প্রত্যেকের ঘর-বাড়ি ছিল, কিন্তু পুঁজিবাদী শোষণের কবলে পড়ে এখন সেখানকার শোষিত জনসাধারণ নিঃস্ব হয়ে ভিক্ষে করছে বেঁচে থাকার জন্য। যত দিন যাচ্ছে এই অবস্থা তীব্র রূপ নেওয়ার কারণ হচ্ছে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ। ফলে এই মূল কারণটা আমাদের ধরতে হবে, যার ব্যাখ্যা একমাত্র মার্কসবাদ দিয়েছে। মার্কসবাদ হচ্ছে পরিপূর্ণ বিজ্ঞান। এই নির্ভুল বিজ্ঞানই হচ্ছে একমাত্র অবলম্বন। যার মাধ্যমে কেমন করে এই সমস্যার প্রতিকার হবে, সেটা আমরা খুঁজে পাই।

আজ যুদ্ধাস্ত্রই প্রধান ব্যবসা

সমস্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সমস্যার প্রকৃতি মূলত একই। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ যেখানেই আছে, সেখানেই গভীর অর্থনৈতিক সংকট মারাত্মক রূপ নিয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে আসার অন্য কোনও রাস্তা না পেয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সহ সমস্ত পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা মিলিটারাইজেশন অফ ইকনমি বা অর্থনীতির যুদ্ধনির্ভর পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো বিশ্বযুদ্ধ না হলেও আঞ্চলিক যুদ্ধের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। একটি দেশ অন্য একটি দেশকে আক্রমণ করার জন্য প্ররোচনা দিচ্ছে। সারা বিশ্বে যুদ্ধের পরিবেশ বহাল রাখার জন্য চেষ্টা করছে– এমনকি একটার পর আর একটা দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইরানে প্রত্যক্ষ আক্রমণ চালিয়েছে। যুদ্ধের পরিবেশ তারা প্রতিদিন সৃষ্টি করছে। আর এই সুযোগে তারা ক্রমাগত সামরিক খাতে খরচের পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। অথচ এই টাকা তো জনসাধারণেরই টাকা। আজ নানা দেশে একচেটিয়া পুঁজিপতিরাই অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম তৈরির জন্য সরকারের সাহায্যে জনগণের টাকা বিনিয়োগ করছে। তারপর সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা জনগণের টাকাই বিনিয়োগ করে তাদের উৎপাদন করা জিনিস কিনে নিয়ে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের মুনাফা লাভের সুবিধা করে দিচ্ছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তাদের সহযোগী অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো এই ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিচ্ছে।

বর্তমান যুগে ফ্যাসিবাদের স্বরূপ উদঘাটন করেন কমরেড শিবদাস ঘোষ

এই মারাত্মক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতির আর একটা বিস্ফোরক দিক হল, আজ বিশ্ববাজারে পুঁজিপতি শ্রেণি মুখে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার– এই কথাগুলো আওড়ে ভোটসর্বস্ব রাজনীতির বাহ্যিক রূপ সাজিয়ে জঘন্য ফ্যাসিবাদী পথ অনুসরণ করছে। মহান চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ সর্বপ্রথম আমাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ফ্যাসিবাদ মানেই যে সামরিক একনায়কত্ব তা নয়, তিনি বলেছেন– মুখ্যত ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য তিনটি। প্রথমটা হচ্ছে, একটি দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে দেশের সমস্ত অর্থনৈতিক সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়া। দ্বিতীয় হচ্ছে জনগণের সমস্ত রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নিয়ে দেশের মুষ্টিমেয় একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে রাষ্ট্রের সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা এবং তৃতীয় হচ্ছে বিজ্ঞান এবং ধর্মের একটা বিচিত্র ফিউশন বা সংমিশ্রণ ঘটানো। মহান লেনিন দেখিয়েছেন, সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় এবং তাকে অবলম্বন করে মহান চিন্তাবিদ কমরেড শিবদাস ঘোষ দেখালেন, পুঁজিবাদের চূড়ান্ত ক্ষয়িষ্ণু যুগে পুঁজিবাদ সব দেশেই বাইরে বুর্জোয়া সংসদীয় রূপ অক্ষুণ্ন রেখেই ক্রমে ফ্যাসিবাদী রূপ পরিগ্রহ করে এবং তার মাধ্যমে জনসাধারণের ন্যায়সঙ্গত অধিকারগুলো কেড়ে নিয়ে আরও তীব্রভাবে তাদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে শোষণ করছে। সর্বহারার মহান নেতা, কমরেড স্ট্যালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্বের ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদী অর্থনীতির যতটুকু আপেক্ষিক স্থায়িত্ব অক্ষুণ্ন ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেটুকুও স্থায়ী হল না। বিশ্ব পুঁজিবাদের তৃতীয় তীব্র সাধারণ সংকট এখন তাকে ঘিরে ধরেছে। পুঁজিবাদী সংকটের মাত্রা মারাত্মক বৃদ্ধি পেয়েছে। তীব্র বাজার সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, তীব্র বেকার সমস্যা, মারাত্মক ধরনের মন্দা, ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই ইত্যাদি সমস্ত পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোকে ঘিরে ধরেছে। উপনিবেশিক দেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর এই সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে, তার হুঁশিয়ারি মহান কার্ল মার্ক্সই দিয়ে গেছেন। তার পর মহান লেনিন তা আরও প্রাঞ্জলভাবে দেখিয়েছেন। তাঁদের এই হুঁশিয়ারি কত সঠিক ছিল, অভ্রান্ত ছিল– আজকের অবস্থা সেটা দেখিয়ে দিচ্ছে।

নির্বাচনের মোহে ফাঁসলে সর্বনাশ

যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দুশো বছর শাসন করেছে, শোষণ করেছে, সে আজ তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। এই হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের অবস্থা। মহান মার্ক্স-এঙ্গেলস এবং পরে মহান লেনিন পরিষ্কার ভাবে বলেছেন, পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ যেখানে থাকবে- মানুষের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত শুষে নিয়ে যাবে। মহান মার্কস যা বলেছিলেন আজ সেরকমই হচ্ছে। তাঁর দেখানো সিদ্ধান্তগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই পুঁজিবাদকে ধ্বংস করতে না পারলে শোষিত মানুষের বেঁচে থাকার কোনও পথই আজ আর নেই। পুঁজিবাদের শোষণ-শাসনকে উচ্ছেদ করার লক্ষ্য স্থির না করলে কোনও আন্দোলনই শ্রমিক শ্রেণির জন্যে কিছু এনে দিতে পারবে না। কিন্তু ধুরন্ধর পুঁজিপতি শ্রেণি শোষিত জনসাধারণকে নির্বাচনের মোহে অবিষ্ট করে রেখেছে। তারা দিবারাত্র প্রচার করছে যে নির্বাচনের মাধ্যমেই জনসাধারণের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আপনারা জানেন সংসদীয় গণতন্ত্র, নির্বাচন এই ধ্যান-ধারণাগুলো এসেছে ইউরোপ থেকে। কিন্তু আজ সেই ইউরোপে নির্বাচনের নামে কী চলছে? সেখানেও নির্বাচন চূড়ান্ত প্রতারণায় পর্যবসিত হয়েছে। লক্ষ করবেন সে দেশগুলোতে যখনই অত্যাচার অবিচার সহ্য করতে না পেরে জনসাধারণ বিক্ষোভে সামিল হচ্ছে, তখনই পুঁজিবাদী শাসকরা তাদের তাঁবেদার একটা দলকে বিকল্প বলে খাড়া করে আবার আরও একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। এভাবে তারা জনগণের আন্দোলনকে বিপথগামী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনে এক দলের বদলে অন্য দলের নতুন যে সরকার গঠিত হয়, সেই পুঁজিবাদী সরকারও জনগণের দাবি পূরণে ব্যর্থ হয়। যখন তার বিরুদ্ধে জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে, তখন পুঁজিবাদী শ্রেণি আবার একটা নির্বাচনের প্রহসন করে জনগণের যে বিক্ষোভ বারুদের মতো ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছে, তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করে। এই ভাবেই তারা তাদের স্বার্থরক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ক্ষমতায় বহাল থাকার জন্য দিনরাত তারা এ রকমই প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে যে নির্বাচন হচ্ছে, একটা প্যানাসিয়া (সর্বরোগ নিবারক ওষুধ)।

কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে, একটা নির্বাচন একটা দলকে ক্ষমতায় বসায়, আবার পরের বার তাকে বাদ দেওয়া হয় কেন? পৃথিবীর সব প্রকৃত বিপ্লবীরা দৃঢ়তার সাথে বলেছে যে বুর্জোয়া শ্রেণির আয়োজিত নির্বাচন হচ্ছে, মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণির হাতিয়ার। মহান লেনিন বলেছেন, ৪-৫ বছর অন্তর অন্তর বুর্জোয়া শ্রেণি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে তার মর্মার্থ হচ্ছে, সেই ৪-৫ বছর জনসাধারণকে কে শোষণ-শাসন করবে, তা বেছে নেওয়া। তা হলে কী করতে হবে? এর সমাধান মহান কার্ল মার্কস প্রায় দুশো বছর আগে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, এই বুর্জোয়া নির্বাচনের মোহ থেকে শোষিত জনগণকে মুক্ত করতে হবে। এই নির্বাচন জনগণকে কোনও কিছু দেবে না, বরং তাদের যেটুকু সম্পদ অবশিষ্ট আছে সেটুকুও কেড়ে নিয়ে যাবে, জনগণকে সর্বহারায় পরিণত করবে।

দেখতে অনেকগুলো দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও মনে রাখতে হবে যে, প্রকৃত বিপ্লবী দলের বাইরে বাকি সব দলই হচ্ছে জনগণকে টুঁটি চেপে মারার দল। তা হলে এই নির্বাচন তো আসলে টুঁটি চেপে মারার কোনও একটি দলকে বেছে নেওয়া। আমাদের দেশ সহ সব পুঁজিবাদী দেশেই সংসদীয় গণতন্তে্রর নামে পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের সৃষ্টি করা দলগুলোকে টাকা-পয়সা, প্রচার দিয়ে জনগণের সামনে নিয়ে এসেছে। বলছে– তোমরা ইনিয়ে-বিনিয়ে কথা বলতে থাকো, যে কোনওভাবে হোক না কেন, গরিব মানুষের বন্ধু সাজো এবং তাদের পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা চালিয়ে যাও। রেডিও, টেলিভিশন, খবরের কাগজ ইত্যাদি সমস্ত প্রচারযন্ত্র আমাদের হাতে। তোমাদের জেতানোর জন্য সব প্রচারযন্ত্রকে আমরা যথাযথভাবে ব্যবহার করব।

নির্বাচনে কে জিতবে তা বুর্জোয়ারাই ঠিক করে

মহান লেনিন বিপ্লবী আন্দোলনের নেতা এবং কর্মীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, বিপ্লবী আন্দোলন যারা গড়ে তুলবে, তারা যেন মনে রাখে, যে পুঁজিবাদকে তারা উচ্ছেদ করতে চায়, সেই পুঁজিপতি শ্রেণি কিন্তু বিরাট এক প্রচারযন্ত্রের মালিক হয়ে বসে আছে। শোষিত জনসাধারণের চেতনার মান যথেষ্ট উন্নত না হলে তার সুযোগ নিয়ে তাদের এই প্রচারযন্ত্র ইচ্ছা করলে সাময়িকভাবে হলেও দিনকে রাত, আর রাতকে দিন করতে পারে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, বিপ্লবী জনগণ কোনও ভাবেই যেন এটা ভুলে না যায়। সুতরাং বিপ্লব করতে হলে শ্রমিক শ্রেণির বিকল্প প্রচার যন্ত্র গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেছিলেন–এ কমিউনিস্ট মাস্ট বি এ গুড প্রপাগান্ডিস্ট।

এই পুজিপতিরা রাজনৈতিক দলগুলোকে টাকা-পয়সা দিয়ে, প্রচার দিয়ে বলছে–তোমরা জনসাধারণের সামনে গিয়ে একজন অন্যজনকে অল্প-স্বল্প গালি-গালাজ করবে, প্রয়োজন হলে এখানে-সেখানে অল্প-স্বল্প মারামারি করবে। জনগণকে বিভ্রান্ত করবে। কাগজে পড়েছিলাম যে, আজ থেকে ২০ বছর আগে ইংল্যান্ডের একটা নির্বাচনে হেরে যাওয়া একটা পার্টির নেতা বলেছিল, মিডিয়া অর্থাৎ প্রচারমাধ্যমের মালিক পুঁজিপতিরা, তাদের বিরুদ্ধাচরণের জন্যই তাদের হারতে হয়েছে। তারপর সেই মিডিয়া মালিকরা, তাদের শাসিয়ে বলল, বেশি কথা বলবে না, তোমাদের ক্ষমতায় এনেছিলাম আমরাই আবার তোমাদের সরিয়ে দিলাম আমরাই। তা হলে সমস্ত দিক থেকে চিন্তা করে দেখুন, নির্বাচনের নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে কে?

আগে ছিল ব্যালট বক্স, নির্বাচনে রিগিং করতে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে ছাপ দিয়ে ব্যালট-বাক্স ভরিয়ে দিয়ে রিগিং করা হত, তার প্রতি মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার ফলে, বুর্জোয়া শাসকরা এখন ইভিএম নিয়ে এসেছে। তারা বলল, এবার আর রিগিং করা যাবে না। কিন্তু, বাস্তব সত্যটা হল এই ইভিএমের সাহায্যে এখন রিগিং করাটা যেন আরও সহজ হয়ে হয়ে গেছে। এখন ফ্রি এবং ফেয়ার ইলেকশনের নাম-গন্ধ নেই। নির্বাচনের নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে পুঁজিপতিদের টাকা, পুলিস-গুন্ডা বাহিনীর পেশিশক্তি এবং শক্তিশালী প্রচারযন্ত্র। নির্বাচন পুঁজিপতি শ্রেণির কাছে একটা খেলা হয়ে গেছে। পুঁজিপতিরা তাদের কালো টাকা তাদের অতি বিশ্বস্ত দলগুলোর হাতে পৌঁছে দিচ্ছে। এই টাকায় বুর্জোয়া দলগুলো হতদরিদ্র জনগণের ভোট কিনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন আবার টাকার সাথে যুক্ত হয়ে আছে অন্য ধরনের রিগিং। আজকাল পোলিং সেন্টারে যে সব পুলিশ এবং সরকারি-কর্মচারী ডিউটিতে থাকেন, তাদের টাকায় কিনে নিয়ে তাদের নিষ্ক্রিয় করে রেখে বাইরের গুন্ডা দিয়ে মানুষকে সন্ত্রস্ত করে বেছে নেওয়া ভোট কেন্দ্রের নির্দিষ্ট বুথগুলির সমস্ত ভোট ইভিএমের সুইচ টিপে বুর্জোয়া দলগুলোর পক্ষে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আবার ভোটারদের ভয় দেখিয়ে বলা হয়– আপনারা বুথের ভিতর যেতে পারবেন না, গেলে বিপদ হবে। তবুও কেউ ভিতরে গেলে অফিসাররা বলে দিচ্ছে আপনার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। সব রাজ্যে এ সব দিন দিন বাড়ছে। জনগণের চিন্তা-চেতনার মান আপেক্ষিক অর্থে উন্নত না হওয়ার জন্য ইউরোপ, আমেরিকার মতো পুঁজিবাদী দেশগুলোতেও এই ধরনের লজ্জাজনক রিগিং, কারচুপি এতটা ব্যাপক না হলেও হচ্ছে। সেখানেও কিন্তু ভোট আজ আর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নয়। সেখানেও জাল ভোট শুরু হয়েছে। এখন তো, পশ্চিমের দেশগুলোতে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে রিগিং শুরু হয়েছে।

একদিকে উন্নত প্রযুক্তি ইভিএম-এর সহায়তা নিয়ে ভোটের ফলাফল নিয়ন্ত্রণের কাজ আরম্ভ হয়েছে, আর অপর দিকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সেই দেশগুলোর একচেটিয়া পুঁজিপতিরা তাদের অনুগত সমস্ত বুর্জোয়া দলগুলোকেই ‘প্রগতিশীল’, ‘উদারনৈতিক’, বলে উপস্থাপনা করে ঢালাও টাকা দিচ্ছে। এই টাকা দেওয়ার ঘটনা আজ আর লুকিয়ে রাখার মতো ঘটনা নয়। এ সব প্রকাশ্যেই হচ্ছে, এমনকি পত্রিকাতেও সেই সব সংবাদ ছাপা হচ্ছে। আমাদের দেশেও পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের নির্দেশ মেনে চলা বড় বড় দলগুলোকে, এমনকি বামপন্থী নামধারী দলগুলো যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে মেনে নিয়েছে, তাদের ঢালাও টাকা দিচ্ছে। এইসব সংবাদ টিভি, পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে। এই ঘটনাগুলো নিঃসংশয়ে আর একবার প্রমাণ করছে সেই সত্যটা–যাদের হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে, রাজনৈতিক ক্ষমতাও তাদের হাতে–অর্থাৎ শাসক-পুঁজিপতিদের হাতেই থাকে। অর্থাৎ বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে তাদের ভৃত্য, বুর্জোয়ারা যেমন করে চালায় সেই দলগুলো তেমন করেই চলে।

এই যে দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি এল, জনসাধারণের এত ক্ষোভ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে পুঁজিপতি শ্রেণি বুঝল যে, কোনও দিক দিয়েই কংগ্রেসকে আর সামনে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। সেই অবস্থাতেই তারা টাকা-পয়সা দিয়ে, প্রচার দিয়ে বিজেপিকে ক্ষমতায় নিয়ে এল। একইভাবে যদি কোনও দিন বিজেপিকে দিয়ে না চলে, তা হলে আবার কংগ্রেস বা এই যে বিভিন্ন দল গড়ে উঠছে, এইগুলোর কোনও একটাকে বা কয়েকটি দলকে তারা কোনও না কোনও উপায়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। ‘আপ’ নামের দল, বুর্জোয়াদের সাহায্যে সামনে এসেছে। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, এই বুর্জোয়া দলগুলি একে অন্যকে গালি দিচ্ছে, তীব্র কটু কথা বলছে। কিন্তু অবশ্যই মনে রাখবেন তাদের মধ্যে আবার গোপন বোঝাপড়াও রয়েছে। কারণ এটা তারা সকলেই বোঝেন যে, তাদের সবার মালিক এক। (চলবে)