
স্থায়ী কাজই নেই
দেশে শ্রমজীবী মানুষের ৯০ শতাংশই অসংগঠিত বা ‘ইনফরমাল’ কাজ করে। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশের বেশি স্বনিযুক্ত, ১৮ শতাংশ বেতনহীন শ্রমিক হিসাবে পারিবারিক কোনও উৎপাদনে কাজ করেন। কারখানা শ্রমিকের ৪২ শতাংশই চুক্তি শ্রমিক। এ দিকে গিগ শ্রমিক অর্থাৎ নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের হয়ে কোনও নির্দিষ্ট চুক্তিতে অথবা শ্রমিকের স্বীকৃতিছাড়াই কর্মরত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এমনকি সেনাবাহিনীতেও স্থায়ী নিয়োগ তুলে দিয়ে, ‘অগ্নিবীর’ নামক গালভরা নাম দিয়ে মাত্র ৪ বছরের মেয়াদের চাকরির ব্যবস্থা করেছে মোদি সরকার। পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যার সঠিক হিসাব না থাকলেও তা ১৫ থেকে ২০ কোটির কম নয় (ইন্ডিয়াডাটাম্যাপ.কম, ০২.০৯.২০২৫)।
দেশে বেকারত্বের হারে সবচেয়ে এগিয়ে শহরাঞ্চলের ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব সমাজ। সামগ্রিক বেকারত্বের হারের থেকে তা অনেক বেশি। দেশে যখন ৬ বা ৭ শতাংশ বেকার দেখানো হয় সেই সময়ে শহরে যুব বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশের বেশি। পশ্চিমবঙ্গে তা ১৭.৯ শতাংশ। (ইন্ডিয়া টুডে, ১৭.০৬.২০২৫)
শিল্প বন্ধ
সারা দেশে ২ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি কারখানা গত পাঁচ বছরে বন্ধ হয়েছে। পাঁচ বছরে ‘এমএসএমই’ বা মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ হয়েছে ৭৫ হাজার। শুধু গত বছরই বন্ধ হয়েছে ৩৫ হাজার। রাজ্যসভায় সরকার জানিয়েছে ২০২৪-২৫-এ মহারাষ্ট্রে বন্ধ হয়েছে ৮৪৭২টি কারখানা, তামিলনাডুতে ৪৪১২, গুজরাটে ৩১৪৮, রাজস্থানে ২৯৮৯, কর্ণাটকে ২০১০টি, পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ ১৫৪৮টি এমএসএমই শিল্প। (দ্য ওয়্যার ১৯.০৩.২০২৫)
বিপুল ছাঁটাই
লোকসভায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পমন্ত্রী জিতনরাম মাঝি জানিয়েছেন, ২০২২-২৩-এ মহারাষ্ট্রে এমএসএমই শিল্পে কাজ গেছে ৫৪,০৫৩ জন শ্রমিকের, তামিলনাডুতে কাজ গেছে ৪৩,৩২৪ জনের, উত্তরপ্রদেশে কাজ গেছে ৩৩২৩০, গুজরাটে কাজ গেছে ২২৩৪৫ জনের। (দ্য মিন্ট ২৫ জুলাই ২০২৪)। গত ১০ বছরে আরও ৫০ হাজার কারখানা বন্ধের ফলে ৩ লক্ষ শ্রমিকের কাজ হারানোর কথা সংসদে স্বীকার করেছেন মন্ত্রী (দ্য ওয়্যার ১৯.০৩.২০২৫)
ন্যানো কারখানা ও শিল্পায়ন
বিজেপি এবং সিপিএম বলে সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হলেই নাকি শিল্প গড়গড় করে পশ্চিমবঙ্গে লাইন দিত! অথচ, গুজরাটের সানন্দে নরেন্দ্র মোদি সরকার ১ লক্ষ টাকা দামের ন্যানো গাড়ি পিছু প্রায় ৬০ হাজার টাকা ভর্তুকি দিলেও ন্যানো গাড়ি উৎপাদন বহু বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে! সেখানকার জমিদাতা কৃষকরা টাটার কারখানায় প্রথমে কিছু অস্থায়ী চাকরি পেলেও এক বছর পর তা চলে গেছে। সরকার জমির দাম দিয়েছিল ১২০০ টাকা প্রতি বর্গ মাইল, কোনও ক্ষেত্রে ৯০ টাকা বর্গ মিটার। পরে সেই জমি গুজরাট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন বিক্রি করেছে কোটি কোটি টাকা দরে (এনডিটিভি ৩.১২.২০১৭, দ্য টেলিগ্রাফ ২.৬.২০১০, ট্রিনিটি কলেজ স্টুডেন্ট আরবান রিসার্চ ১৫.২.২০১০)।
ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে স্কুলশিক্ষার সর্বনাশ
বিজেপি রাজত্বে উত্তরপ্রদেশে স্কুল ‘ক্লোজার অ্যান্ড মার্জার’ করছে ২৭ হাজার, রাজস্থানে ১৯ হাজার ৫০০, মহারাষ্টে্র ১৫ হাজার, গুজরাটে ৭ হাজার। সারা দেশে গত পাঁচ বছরে ৬৫ লক্ষ ৭০ হাজারের বেশি শিশু স্কুলছুট হয়েছে প্রাথমিক স্তরেই। তার মধ্যে শুধু গুজরাটে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ২.৪ লক্ষ শিশু স্কুল ছেড়েছে। আসামে এক বছরে স্কুলছুট ১.৫ লক্ষ শিশু, উত্তরপ্রদেশে ৯৯ হাজার। বিজেপি শাসিত এই তিনটি রাজ্যই শিশুদের বিশেষত মেয়েদের স্কুল ছুটে ভারতে প্রথম (আনন্দবাজার পত্রিকা ১৭.০১.২০২৬)।
ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে দুর্নীতির বহর
২০২৪-এ উত্তরপ্রদেশের ৬৯০০০ শিক্ষকের নিয়োগ লক্ষ্নৌ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ দুর্নীতির দায়ে বাতিল করে দিয়েছে। গোয়াতে বিজেপি নেতারা কী ভাবে টাকা নিয়ে চাকরি বেচেছে তা স্পষ্ট ভাবে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে (দ্য হিন্দু ১৭.০৮.২০২৪, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৫.১১.২০২৪)।
বিহারঃ পরীক্ষা ও চাকরি কেলেঙ্কারির তদন্তকারী সাংবাদিক সহ একাধিক ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু রহস্যের তদন্ত হয়নি।
মধ্যপ্রদেশঃ ব্যপম কেলেঙ্কারি– সরকারি চাকরি ও মেডিকেল সহ লোভনীয় পেশাগত শিক্ষায় সুযোগ পেতে বহু কোটি টাকার ঘুষের কারবারে অভিযুক্ত শিবরাজ সিং চৌহান সহ বহু বিজেপি নেতা।
ছত্তিশগড়ঃ ৩৬ হাজার কোটি টাকার রেশন কেলেঙ্কারিতে ছত্তিশগড়ের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ সহ অভিযুক্ত বহু বিজেপি নেতা।
রাজস্থানঃ ৪৫ হাজার কোটি টাকার খনি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হয়েছেন বিজেপি নেত্রী বসুন্ধরা রাজে ও ললিত মোদি। এই বসুন্ধরা রাজের সহযোগিতাতেই ব্যাঙ্ক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা ললিত মোদি বিদেশে পালাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
গুজরাটঃ স্টেট পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ২০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারিতে জড়িত গুজরাটের একাধিক বিজেপি নেতা ও মন্ত্রী। (সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ১০ জুলাই, ২০১৭) অভিযুক্তরা হয় সিবিআই থেকে ক্লিনচিট পেয়েছেন, নয়তো বহু বছর ধরে তদন্ত থমকে রয়েছে। ২০১৭ সালের পর থেকে বিজেপি শাসিত রাজ্যে সিবিআই ও ইডি আর কোনও দুর্নীতিগ্রস্ত বিজেপি নেতা ও মন্ত্রীর হদিশই পাচ্ছে না। আর অন্যান্য দলের দুর্নীতিতে অভিযুক্তরা বাঁচার জন্য বিজেপিতে ঠাঁই নিয়ে নিশ্চিন্তে দিন যাপন করছেন।