Breaking News

তৃণমূল কংগ্রেসের ‘সোনার বাংলা’

সরকারি স্কুল বেহাল

রাজ্যের ৬৬ হাজার ৭৪৪টি প্রাথমিক স্কুলের মধ্যে ১১ হাজার ৫১৫টি প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রসংখ্যা ৩০ জনেরও কম। ৩ হাজার ৬৬৯টি স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ১৫ জনের কম। ৭৪৭ স্কুলে নেই কোনও ছাত্র। ৫ হাজার ১৪৯টি স্কুল চলছে একজন শিক্ষক দিয়ে। সূত্রঃ সমগ্র শিক্ষা মিশন, ২০২৪-২৫ উচ্চ প্রাথমিকে মোট ৬ হাজার ৪২৬টি স্কুলের মধ্যে ৮৯১টিতে একজন শিক্ষক, ১ হাজার ৪৭৫টি স্কুলে ৩০ জনের কম ছাত্রছাত্রী, ৭২০টিতে ১৫ জনের কম ছাত্রছাত্রী এবং ২৫৯টি স্কুলে কোনও ছাত্র নেই। (সূত্রঃ সমগ্র শিক্ষা মিশন, ২০২৪-২৫)

মিড ডে মিলের ৮৩ শতাংশ টাকা খরচ হয়নি

২০২৩-২৬ এই তিন বছরে মিড ডে মিল প্রকল্পে রাজ্য সরকার বরাদ্দ করেছিল ৬৩৪৯ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা। খরচ হয়েছে ১০৭৭ কোটি ১ লক্ষ টাকা। বরাদ্দ হলেও খরচই হয়নি ৮৩.৪ শতাংশ টাকা। ২০২৬-২৭-এ মিড ডে মিল প্রকল্পে তৃণমূল সরকার বরাদ্দ নামিয়ে এনেছে ১১৫০ কোটি ৯০ লক্ষ টাকায়। ২০২৩-২৪-এর বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম। গত বাজেট বরাদ্দের থেকে কম ৫০০ কোটি টাকা। (সূত্রঃ তৃণমূল সরকারের বিধানসভায় পেশ করা রিপোর্ট)

বেড়েছে ড্রপ আউট

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলছুট ৪২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে ভর্তি হয়েছিল ৪০ লক্ষ ৮১ হাজার ৬৬৬ জন ছাত্রছাত্রী। বছর শেষে রাজ্য সরকার জানিয়েছে, মিড ডে মিল দেওয়া হয়েছে ২৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ২৩২ জনকে।

মাধ্যমিক স্তরে ড্রপ আউটে পশ্চিমবঙ্গ সর্বোচ্চ। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির মধ্যে ২০ শতাংশ ছাত্র, ১৭.৮ শতাংশ ছাত্রী স্কুল ছেড়েছে। রাজ্যে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মেয়েদের ৪৯ শতাংশই লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারে মন দিতে বাধ্য হয়েছে (এডুকেশনওয়ার্ল্ড.ইন ১৫.০১.২০২৫, দ্য ওয়্যার ২৩.০৩.২০২৫, দ্য ইন্ডিয়া ফোরাম ১৫.০১.২০২৬)।

সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বিলোপ ঘটছে

২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল শুধু নয়, সরকার দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে নিয়োগের পরীক্ষাটাই নিচ্ছে না। লোকবলের অভাবে মিড ডে মিল, সরকারের নানা পোর্টালে অসংখ্য আপলোডের চাপ, নির্বাচনের নানাবিধ কাজ, বিএলও হওয়া থেকে গ্রামের পশুপাখি সেন্সাস ইত্যাদি সব দায়িত্ব সামলে শিক্ষকদের পক্ষে শিক্ষাদানের সময়টাই মেলা দুষ্কর।

পশ্চিমবঙ্গে প্রাথমিক স্তরে ড্রপ আউট নেই বলে সরকারের দাবি হলেও ভোটের আগে মিড ডে মিলে বাড়তি ডিম ও ফল বরাদ্দ করতে গিয়ে রাজ্য সরকারই জানিয়েছে বহু ছাত্র-ছাত্রী স্কুলে আসে না বলে তাদের জন্য বরাদ্দ খরচই হয় না।

উচ্চশিক্ষায় ছাত্র কমছে

এই রাজ্যে উচ্চশিক্ষায় ছাত্রছাত্রী কমেছে প্রায় ৭ লক্ষ। বাজেট নথিতে সরকার জানিয়েছে, ২০২৪-২৫-এ উচ্চশিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ছিল ২৭ লক্ষের বেশি। ২০২৫-২৬-এ তা হয়েছে ২০ লক্ষ ৫৩ হাজার।

পাশফেল তুলে দেওয়া সহ ভ্রান্ত শিক্ষানীতি এবং চার বছরের ডিগ্রি কোর্সের ধাক্কায় কলেজগুলোতে ছাত্র ভর্তি মারাত্মক ভাবে কমে গেছে। রাজ্যে সরকার পোষিত ৩১টি এবং অন্যান্য মিলিয়ে ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় থাকার গর্ব করে সরকার। কিন্তু সরকার পোষিত এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অবস্থা শোচনীয়। বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বাড়িটাও নেই। শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগ হয়নি। একটা দুটো বিষয়ে অতিথি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালিয়ে কোনও রকমে অস্তিত্ব রক্ষা করছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি।

এগিয়ে শিশু-মৃত্যুতে

২০১০ সালে ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ছিল ১৫তম। ২০২৫-এ তা হয়েছে ১৯তম, অর্থাৎ শিশুমৃত্যুর হার কমার বদলে বেড়েছে। তথ্যঃ কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস অব দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অব ইন্ডিয়া

কর্মসংস্থানের বেহাল দশা, বেকারি বাড়ছে

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দাবি রাজ্যে বেকার মাত্র ২.১ শতাংশ। যদিও লেবার ফোর্স পার্টিশিপেশন রেট দেখাচ্ছে, এই রাজ্যে ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর এই তিন মাসে কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক কোনও কাজ পায়নি। ২০২৫-২৬-এর আর্থিক সমীক্ষা দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের হার ২০২৫-এর জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ছিল ৬.১ শতাংশ, সর্বভারতীয় গড় যেখানে ৫.২ শতাংশ। (সংসদে পেশ করা ২০২৫-২৬-এর আর্থিক সমীক্ষা রিপোর্ট)

পশ্চিবঙ্গের ৪৪ শতাংশ মহিলা খাতায়-কলমে কর্মরত হলেও তার বেশির ভাগই (৭৫ শতাংশ) স্বনিযুক্ত। স্বনিযুক্তিতে যারা যুক্ত বাস্তবে তাদের নির্দিষ্ট কোনও আয় নেই। অনেকেরই আয় নামমাত্র। নিয়মিত বেতন পাওয়া মহিলাদের সংখ্যা কমে ২০২৩-২৪-এ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। টেলারিং, জরি, পাট, বিড়ি, তাঁতের কাজ সর্বত্রই মহিলাদের মজুরি ঘণ্টায় ১০ থেকে ২৫ টাকা। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে, মফসসলে শহরেও এখন বেসরকারি সংস্থার থেকে ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পেরে মহিলাদের ঘরবাড়ি ছাড়ার ঘটনা ঘটছে। (স্বাতী ভট্টাচার্যের প্রতিবেদন, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮. ১২. ২০২৫)

চা শ্রমিকরা রয়েছেন সেই তিমিরে

২০১৫ সালে চা বাগান শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি চালু করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার। তারপর থেকে এক দশক অতিক্রান্ত। রাজ্যের লক্ষাধিক চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। ২০২১ সালে আলিপুরদুয়ারে সরকারের মিনিমাম ওয়েজ অ্যাডভাইজারি কমিটি শেষ বৈঠকে বসেছিল। সেখানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল ৬৬০ টাকা। সেই মজুরি এখনও চালু হয়নি।

এখন দৈনিক মজুরি মাত্র ২৫০ টাকা, সেই টুকুও সব শ্রমিক পায় না। চা-বাগানে স্থায়ী শ্রমিক কথাটাই আজ প্রায় নেই। পিএফ, ইএসআই, স্বাস্থ্য পরিষেবা সবই অনিশ্চিত। মালিকরা চা বাগান চালানোর বদলে ফড়েদের মাধ্যমে চা চাষিদের কাছ থেকে পাতা কিনে তা ফ্যাক্টরিতে প্রসেসিংয়ের দিকেই ঝুঁকছে। চাষিরা কাঁচা পাতা বিক্রি করার সময় ফড়েরা তার দাম প্রতিদিন কমায়। বহু ক্ষেত্রে চাষিদের চা পাতা তোলার খরচও এই দামে ওঠে না।

কৃষকের আয়ে রাজ্য পিছিয়ে

পশ্চিমবঙ্গে কৃষিজীবী পরিবারগুলির গড় মাসিক আয় ১১ হাজার ৪৫৬ টাকা। এই ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে ২৪তম স্থানে রয়েছে। (তথ্যঃ নাবার্ড সমীক্ষা)

নাবালিকা বিয়েতে এগিয়ে বাংলা

পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের আগে ছিল বিহার। এখন পশ্চিমবঙ্গ এগিয়ে। রাজ্যে গত দু-তিন বছরে ৪১.৬ শতাংশ নাবালিকার বিয়ে হয়েছে। বিহারে তা ৪০.৮ শতাংশ।

বেড়েছে মাতৃত্বকালীন মৃত্যু

মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর হার রাজ্যে গত দেড় দশকে বেড়েছে। পুষ্টির অভাব, অল্প বয়সে বিয়ে, রক্তাল্পতা এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে সরকারি অবহেলা প্রভৃতি প্রসূতি মৃত্যুর কারণ। ১৫-৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের রক্তাল্পতা বেড়ে চলেছে ভয়ঙ্কর হারে। ৭১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে ২০২৩ সালে। (রিসার্চ গেট, ফেব্রুয়ারি ২০২৫)

মদ বিক্রি বেড়েছে ৮৩২ শতাংশ

২০১১-য় মদ বিক্রি করে বামফ্রন্ট সরকারের আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৪১৮ কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা। গত দেড় দশকে রাজ্যে মদ বিক্রির পরিমাণ পৌঁছেছে ২২ হাজার ৫৫০ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকায়। বৃদ্ধি ৮৩২.২৩ শতাংশ।

স্বাস্থ্যখাতে মাথাপিছু খরচে রাজ্য ২৬তম

স্বাস্থ্যখাতে জাতীয় স্তরে মাথাপিছু সরকারের খরচ ৩১৬৯ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে মাথাপিছু ২৪৫৪ টাকা খরচ করছে সরকার। দেশের ৩১টি রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ২৬তম।

স্বাস্থ্য পরিষেবা, নাকি লাভজনক ব্যবসা

একদিকে ঝাঁ চকচকে ‘সুপার স্পেশালিটি’ হাসপাতালের বিল্ডিং, অন্য দিকে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ কার্ডে’ কত লোকের চিকিৎসা হল তার হিসাব। অথচ, এই সমস্ত তথাকথিত সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে কোনও একজন স্পেশালিস্ট দূরের কথা, বেশিরভাগ পোস্টে ডাক্তারই নেই। নেই নার্স, টেকিনিশিয়ান বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। স্বাস্থ্য ব্যবসায়ীদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে আছে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অধিকাংশটাই। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ভেজাল ওষুধ, নিম্নমানের ওষুধের সমস্যা। ভেজাল স্যালাইনে একাধিক প্রসূতির মৃত্যু ঘটেছে। ভেজাল ওষুধের কারবারিরা অন্য রাজ্যে কালো তালিকায় থাকলেও এই রাজ্যে বিপুল সরকারি অর্ডার পেয়ে গেছে।

আর জি কর হাসপাতালে অভয়ার খুন-ধর্ষণের ঘটনার পর জানা গেছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যকে বাজি রেখে মৃতদেহ পাচার, অঙ্গ পাচার, বিষাক্ত ওষুধের কারবার, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি থেকে সমস্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে জালিয়াতির এক ভয়ঙ্কর চক্রের কথা।

রাজ্যে ৯৯ শতাংশ প্রসব হাসপাতালে হওয়া এবং প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর হার কমার কৃতিত্বের সিংহভাগ দাবিদার রাজ্যের আশাকর্মী, পৌরস্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি কর্মীর স্বীকৃতিটুকু দিতেও সরকার নারাজ।

২০১১ সালে মাথাপিছু ধার ৭৭, ১৭৭ টাকা

তৃণমূল আসার আগে রাজ্যের মোট ঋণ ছিল ১ লক্ষ ৯২ হাজার ৯১৯.৯ কোটি টাকা। এখন রাজ্যের ধার পৌঁছেছে ৭,৭১,৬৭০ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা (২০২৬-এর ৩১ মার্চ ধরে)। অর্থাৎ মাথাপিছু ধার ৭৭ হাজার ১৭৭ টাকা।

আশাকর্মীদের বেতন নামমাত্র

আশাকর্মীদের বেশ কিছু দাবি আদায় হলেও বহু দাবি অপূরিত। মাতৃত্বকালীন ছুটি, ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা ভাতা, ভাতা নিয়মিত দেওয়া সহ বিভিন্ন দাবিতে লাগাতার কর্মবিরতি চালিয়েছেন আশাকর্মীরা। মাত্র ১ হাজার টাকা ভাতাবৃদ্ধি, মাতৃত্বকালীন ছুটি গ্রাহ্য হলেও গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা টিকিয়ে রাখার কারিগর আশাকর্মীরা বঞ্চিতই রয়েছেন।

শিল্প বন্ধ

রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে ২০২৪-২৫-এ পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ হয়েছে ১৫৪৮টি ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প, কাজ গেছে ৮৮৫৬ জনের। (সূত্রঃ দ্য ওয়্যার ১৯.০৩.২০২৫)