
বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’?
এমনই সমীকরণ দাঁড় করিয়েছে বিজেপি। আর তারই ভিত্তিতে বিজেপি শাসিত গুজরাট, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ওড়িশা, আসাম, দিল্লি ইত্যাদি রাজ্যগুলিতে শয়ে শয়ে বাংলাভাষী এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গরিব মানুষকে কেবলমাত্র সন্দেহের বশে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করা হচ্ছে, নয়তো সীমান্তের ওপারে স্রেফ ঘাড় ধরে বের করে দেওয়া হচ্ছে। বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বৈধ নাগরিক পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও উত্তর ২৪ পরগণার স্থায়ী বাসিন্দা ফজের মণ্ডলকে সস্ত্রীক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে মহারাষ্ট্র পুলিশ। একই অভিজ্ঞতা মুর্শিদাবাদের মিনারুল শেখ, নিজামুদ্দিন শেখ, পুর্ব বর্ধমানের মোস্তাফা কামাল শেখদের। মিনারুল বলছেন, ‘বিএসএফ জওয়ানরা বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়েছিল। কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বের করে দিয়ে বলেছিল ফিরে যদি তাকাস তা হলে গুলি করব।’ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে দেশে ফেরার পর আপাতত স্বস্তি মিললেও আচমকা দেশহীন হয়ে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে তাঁরা গভীর বিপন্নতার সম্মুখীন। বীরভূমের মুরারই ১ ও ২ নং ব্লকের ৮ শ্রমিককে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিশ। ওড়িশার বিজেপি সরকার বাংলাভাষী ৪৪৪ জন শ্রমিককে আটক করে ডিটেনশন ক্যাম্পে চালান করেছে। এই শ্রমিকরা মুর্শিদাবাদ, মালদা, বীরভূম, নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান জেলা থেকে প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশায় কাজে গিয়েছিলেন।
শুধু পশ্চিমবঙ্গের মানুষই নন, ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ড প্রভৃতি রাজ্যের একটা বড় অংশের মানুষ বাংলায় কথা বলেন। পশ্চিমবঙ্গ ভারতেরই একটি অঙ্গরাজ্য। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে চাকরি-বাকরি, ব্যবসা প্রভৃতি নানা কারণে যাতায়াত এবং বসবাসের অধিকার প্রতিটি ভারতবাসীর রয়েছে। এই অবস্থায় বাংলায় কথা বললেই কাউকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়? দাগিয়ে দিলে তা প্রমাণের কোনও প্রয়োজন নেই? তিনি যে ভারতেরই নাগরিক তা প্রমাণের দায় কেন অভিযুক্তের ঘাড়ে চাপবে! এই দায় তো অভিযোগকারীর নেওয়ার কথা! কাউকে বাংলাদেশি সন্দেহ হলে তিনি ‘প্রকৃতই বাংলাদেশী’ কি না তার বিচার তো আইনি পথেই করতে হবে। পুলিশ বা বিজেপি-আরএসএসের গেস্টাপো বাহিনীকে এই অধিকার কে দিয়েছে? তাদের ভাবটা এমন, যেন সমস্ত পশ্চিমবঙ্গবাসীর সব পরিচয়পত্রই জাল। বাংলায় কথা বললেই গভীর রাতে হানা দিয়ে গ্রেপ্তার করে, টাকা-নথিপত্র, মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে কোনও বিচার ছাড়া বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়াই কি এখন বিজেপি রাজত্বের আইন? বিজেপি পরিচালিত সরকারগুলি সংবিধানের নামে শপথ নিয়ে এই বেআইনি কাজটিই করে চলছে।
কেন শুধু বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতেই এমন গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে? স্রেফ ভোটের জন্য। যাদের বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে ধর্ম পরিচয়ে তাঁদের অধিকাংশই মুসলমান। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের একটা বিরাট অংশ আর্থিক ভাবে অনুন্নত। দশকের পর দশক ধরে কর্মসূত্রে ভিন রাজ্যে তাঁদের যাতায়াত। ঠিক যেমন দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকেও এ রাজ্যে মানুষ আসেন রুজির সন্ধানে। গত বেশ কিছু দিন ধরে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে তাঁদের উপর পুলিশ প্রশাসনের হামলা ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলাদেশি রটনা বহুক্ষেত্রে উগ্র হিন্দুত্ববাদী দুষ্কৃতীদের এঁদের উপর আক্রমণে প্ররোচিত করছে। ফলে তাঁরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। একটি সরকার বা দল ভোটের স্বার্থে কতটা হীন কাজ করতে পারে এ ঘটনা তা দেখিয়ে দিচ্ছে।
যদি কেউ অবৈধ অভিবাসী বলে প্রমাণিত হন তবে তাঁকে ফেরত পাঠানোর কিছু নিয়ম আছে। প্রথমে তাঁকে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। বিদেশি আইনের ১৪ নং ধারা অনুযায়ী মামলা হবে। মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে সাজা হবে। সাজার মেয়াদ শেষে আদালতের মাধ্যমেই যে ব্যক্তি যে দেশ থেকে এসেছেন সেখানকার সরকারের সাথে কথা বলে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রশ্ন উঠছে বিজেশি শাসিত রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশি বলে যাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে, তা কোন নিয়মে করা হচ্ছে? কোন আইনে তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে অথবা দেশের বাইরে বের করা হচ্ছে? ১১ জুলাই কলকাতা হাইকোর্টের এক ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তুলেছে, এই আটক কোর্টের নির্দেশে কি? কেন আটক? আটকের কারণ ওই শ্রমিকদের পরিবারকে জানানো হয়েছিল কি না, কে এ ব্যাপারে তদন্ত করেছিল? এ ব্যাপারে দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে তথ্য আদানপ্রদান হয়েছিল কি না? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিজেপি সরকারের পুলিশ আইনের কোনও তোয়াক্কা করছে না।
দিল্লির বসন্তকুঞ্জের বাংলাভাষী জয়হিন্দ কলোনিতে দীর্ঘ দিন বসবাসকারী দরিদ্র নাগরিকদের দিল্লি মিউনিসিপ্যাল প্রশাসন যে ভাবে জল এবং বিদ্যুতের লাইন কেটে দিয়ে বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তা শুধু চরম অমানবিকই নয়, সম্পূর্ণ বেআইনি।
বিজেপি নেতারা তোতাপাখির মতো অনুপ্রবেশের তত্ত্ব আওড়ে চলেছেন। বলছেন, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীতে নাকি দেশ ছেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই কি বিজেপি নেতারা এটাকে সত্যি বলে মনে করেন? তা হলে কেন্দ্রীয় সরকার সীমান্তের একটা বিরাট অংশ খোলা রেখে দিয়েছে কেন? দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রের অধীন বিএসএফ-এর নজরদারি এড়িয়ে তা ঘটতে পারছে কী করে? কেন সরকার বিএসএফের কাছে এর জন্য জবাবদিহি চাইছে না? কম-বেশি অনুপ্রবেশ গোটা বিশ্বের সমস্যা। যুদ্ধ, বন্যা, ভাঙন, উচ্ছেদ, বেকারত্ব ইত্যাদি নানা কারণে অপেক্ষাকৃত উন্নত অর্থনীতির দেশে অনুপ্রবেশ দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে। গুজরাট থেকেও বহু সংখ্যক মানুষ যে এমনকি আমেরিকায় বেআইনি অনুপ্রবেশ করেছিলেন সম্প্রতি আমেরিকা তাঁদের হাত-পা বেঁধে ফেরত পাঠানোয় আজ তো আর কারও অজানা নয়।
বিজেপি শাসিক রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষীদের উপর বাংলাদেশি বলে হেনস্থার ঘটনা অনেক দিন ধরেই ঘটছে। দায়িত্বশীল হলে এর বিরুদ্ধে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের তো অনেক আগেই তৎপর হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা তারা হয়নি। এখন যখন সমস্যা গুরুতর আকার নিয়েছে এবং বিধানসভা নির্বাচনও কাছাকাছি এসে গেছে, তখন হঠাৎ-ই তাদের তৎপরতা চোখে পড়ছে। তারা এত দিন তৎপর হয়নি কেন? কেন রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের কাছে এর তীব্র প্রতিবাদ করেনি? এখন হঠাৎ তারা নিজেদের ত্রাতা হিসাবে তুলে ধরতে তৎপর হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এই নীরব থাকা এবং তৎপর হওয়ার পিছনেও কাজ করছে প্রাদেশিক সেন্টিমেন্ট তুলে ভোট-ব্যাঙ্কের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু ভোট রাজনীতির ময়দানে যুযুধান দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে আছেন যাঁরা, সেই দিশেহারা রাজ্যের হাজার হাজার গরিব মানুষ, দিন গুজরান করতে প্রতিনিয়ত কাজ খুঁজতে পরিবার-পরিজনকে ছেড়ে ভিন রাজ্যে যেতেই হয় যাঁদের, তাঁরা কী ভয়ঙ্কর আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, তা কি অনুভব করতে পারেন ভোটের হিসাব কষা রাজ্যের এই সব নেতা-মন্ত্রীরা, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা? পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারাও তাঁদের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুকরণে অনুপ্রবেশের বুলি কলের পুতুলের মতো আউড়ে যাচ্ছেন। এ রাজ্যের গরিব পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনযন্ত্রণা, বাংলাভাষী রাজ্যবাসীদের অপমান তাঁদের গায়েই লাগছে না। বাস্তবে এই অনুপ্রবেশ তত্ত্ব মানুষকে বিশ্বাস করাতে পারলেই যেন তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরিত হয়। এঁরাও কি কোনও ভাবে এ রাজ্যের মানুষের প্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য?
সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে তাঁদের মধ্যে অন্য ধর্মের মানুষের সম্পর্কে বিদ্বেষ তৈরি ও তা জিইয়ে রেখে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করা বিজেপি রাজনীতির অন্যতম অঙ্গ। অনুপ্রবেশ তাদের পুরনো ইস্যু। বাস্তবে জনগণের সামনে তুলে ধরার মতো কোনও সাফল্যই বিজেপি শাসনে ঘটেনি। বরং জনজীবনের সমস্যাগুলি বিজেপি শাসনে গুরুতর আকার ধারণ করেছে। তাই দেশজুড়ে জনমানসে বিজেপি বিরোধী মানসিকতা দেখে ভীত বিজেপি নেতৃত্ব। তাই অনুপ্রবেশের জুজুই এখন তাদের একমাত্র হাতিয়ার। বিজেপির যুক্তি ধারাটা হল– দেশে চাকরি নেই কেন? দায়ী অনুপ্রবেশ। দেশের মানুষের খাদ্য নেই কেন? কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণ কী? বাইরে থেকে আসা মুসলমানরা দেশটা ছেয়ে ফেলেছে। চাকরি বা অন্য কোনও ক্ষেত্রে আর হিন্দুদের প্রাধান্য থাকবে না। বাস্তবে তাদের এই সব মনগড়া তত্ত্বের সাথে এমনকি সরকারি তথ্য পরিসংখ্যানেরও কোনও মিল নেই। ২০১১-র জনগণনায় বিজেপি-কথিত লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর কোনও তথ্য মেলেনি। গোটা দেশে মুসলিম জনসংখ্যার হার বেড়েছে এমন কোনও পরিসংখ্যা কোনও সমীক্ষাতেই মেলেনি। ২০২১-এর জনগণনা তারা ঝুলিয়ে রাখল কি তাদের মনগড়া অভিযোগ ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে?
দারিদ্র-বেকারি-অপুষ্টি-শিশুমৃত্যু-অশিক্ষা, শিক্ষা-চিকিসার সংকট ইত্যাদির প্রকৃত কারণ যে এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী শোষণ এবং পুঁজিবাদের সেবাদাস হিসাবে প্রথমে কংগ্রেস, বর্তমানে বিজেপি সরকারের জনবিরোধী নীতি তা তারা দেশের মানুষের থেকে আড়াল করতে চায়। কিন্তু দেশের শোষিত-বঞ্চিত মানুষকে তাঁদের জীবন-যন্ত্রণা থেকে সত্যিকারের রেহাইয়ের প্রয়োজনেই এই ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়া চলবে না। এই সব মিথ্যা প্রচারের ঢক্কানিনাদ থেকে বেরিয়ে চোখ খোলা রেখে, যুক্তি-বিজ্ঞানের আলোয় সত্যের পথ খুঁজে নিতে হবে জনসাধারণকেই। সত্যচর্চার মধ্যেই নিহিত আছে মিথ্যার কারবারিদের মুখোশ খুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন। একই সঙ্গে রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষকে তৃণমূল-বিজেপির এই ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। মাথা উঁচু করে মর্যাদার সঙ্গে দেশের যে কোনও রাজ্যে বসবাসের গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখতে সংঘবদ্ধ ভাবে রাজ্যে তৃণমূল সরকার এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের উপর চাপ তৈরি করতে হবে।