
প্রাক্তন সাংসদ ডাক্তার তরুণ মণ্ডল সহ লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাতিলের প্রতিবাদে এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে ২৮ মার্চ রাজ্য নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলে ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দেবাশিস রায়, রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ডাক্তার তরুণ মণ্ডল ও রাজ্য কমিটির সদস্য অজয় চ্যাটার্জী। অতিরিক্ত প্রধান নির্বাচনী আধিকারিক এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ওএসডি-র সাথে তাঁদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। স্মারকলিপির প্রতিলিপি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, লোকসভার স্পিকার ও রাষ্ট্রপতির কাছেও পাঠানো হয়।
বৈধ সমস্ত নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও এক মাস বিবেচনাধীন রাখার পর জয়নগরের প্রাক্তন সাংসদ ডাক্তার তরুণ মণ্ডলের নাম ২৭ মার্চ প্রকাশিত অতিরিক্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমনটি হয়েছে দলের অসংখ্য নেতা-কর্মী-সংগঠক-সমর্থক সহ রাজ্যের লক্ষ লক্ষ নাগরিকের ক্ষেত্রে। বিধানসভা নির্বাচনের প্রক্রিয়া যখন রাজ্যে শুরু হয়ে গেছে তখন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, এখনও পর্যন্ত ১৫.৭৫ লক্ষ নাগরিকের নাম ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। ৬৩ লক্ষ এ রকম বিচারাধীনের মধ্য থেকে এই সংখ্যাটা প্রায় ৩০ লক্ষে গিয়ে পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা। ফলে বিপুল সংখ্যক নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেই নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচন ‘নির্বিঘ্নে’ সারতে চাইছে। এর আগে এনুমারেশন প্রক্রিয়াতে বাতিল হয়েছে প্রায় ৫৮ লক্ষ, যাদের নাম ২০২৫-এর ভোটার তালিকায় ছিল। বিএলওদের এই কাজের পরেই শুরু হয়ে যায় নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পদক্ষেপ ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ যা কমিশনের ইতিহাসে এর আগে কখনও শোনা যায়নি এবং তার বিধিতেও নেই। সেই অজুহাতে নির্বাচন কমিশন আট হাজার মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করে ৬৩ লক্ষের বেশি মানুষকে ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতের মধ্যে ‘বিচারাধীন’ তকমা এঁটে ২৮ ফেব্রুয়ারি ফাইনাল ভোটার লিস্ট বের করে দেয়। এদের সকলের নামই ১৬ ডিসেম্বরে প্রকাশিত খসড়া ভোটার লিস্টে ছিল। এই সমস্ত কাজটি নাকি হচ্ছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে একপ্রকার অন্ধকারে রেখে দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে। বাদ পড়া তালিকায় প্রধানত মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, আদিবাসী মানুষরা, প্রান্তিক সমাজের মানুষেরা এবং তার সাথে বিপুল সংখ্যায় মহিলারা আছেন। এদের প্রত্যেকেই আজ নাগরিকত্ব হারানোর আশঙ্কায় দিশাহারা। এই সমস্ত অসহায় মানুষদের ন্যায়ের দাবি নিয়েই এ দিন যাওয়া হয়েছিল রাজ্য নির্বাচন কমিশনে। অন্য দিকে দক্ষিণ ২৪ পরগণার জয়নগর, কুলতলি সহ বহু এলাকায় শাসক দলের পক্ষ থেকে দেওয়াল লেখা মোছা সহ যে হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে তা বন্ধ করতে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয় নির্বাচন কমিশনকে। অবজার্ভার সহ সমস্ত স্তরের আধিকারিকদের নাম ও ফোন নম্বর রাজনৈতিক দলগুলিকে জানানো এবং সমস্ত ভোটার যাতে ভোট দিতে পারেন তার ব্যবস্থা করারও দাবি জানানো হয়।
ডাক্তার তরুণ মণ্ডল যিনি পঞ্চদশ লোকসভায় নির্বাচিত সাংসদ ছিলেন এবং তার আগে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগে ইউপিএসসি পরীক্ষায় নির্বাচিত হয়ে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে ২১ বছর কাজ করেছেন এবং বর্তমানে পেনশন প্রাপক। তাঁর প্রাক্তন সাংসদের পরিচয়পত্র, সরকারি আধিকারিকের নথিপত্র ছাড়াও বৈধ পাসপোর্ট আছে যা নাগরিকত্বের অন্যতম দলিল। এ সব সত্তে্বও তাঁর নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়, কোন অভিসন্ধি থেকে এ ঘটনা ঘটতে পারল?
ডাঃ তরুণ মণ্ডলের মতো বিশিষ্ট নাগরিকদের যদি এই অবস্থা হয় তা হলে অন্য সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে কী বিচার হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন উঠেছে, কমবেশি যে ৩০ লক্ষ লোকের নাম বাদ পড়তে চলেছে তাদের ভোটাধিকার এবং বিচারকদের বয়ানে ‘নাগরিক অধিকার’ কী ভাবে রক্ষিত হবে? কমিশনের এ কোন ধরনের ন্যায়বিচার? রাজ্য নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে কিছু বলতে অপারগ। তারা নির্লিপ্ত ভাবে বলছে, এখন আর তাদের কিছু করণীয় নেই। এখন যা করার তা করবে ট্রাইবুনাল। একজন বৈধ ভোটারও যাতে তালিকা থেকে বাদ না যায় এবং ভোটাধিকার পায় এই কি তার নমুনা! সমস্ত দায় অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালের বিচারপতিদের উপর তাঁরা ঠেলে দিচ্ছেন। কী কারণে নাম বাতিল করা হল তাও বিচারকরা নির্ধারণ করে দেখাননি। ভোটাররা জানতে পারছেন না কী কারণে তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেল। কবে কোথায় এই ট্রাইবুনাল তৈরি হবে এবং কোথায় কারা আপিল করবেন তার তালিকা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। শুধু জানা গেছে, একটি মাত্র আপিল পোর্টাল খোলা হয়েছে অনলাইনে আবেদন করার জন্য। কী ভাবে বিচারকরা মীমাংসা করে রায় দেবেন, সেটা কবে হবে, কমিশনের কর্তারা সুনির্দিষ্ট ভাবে তা বলতে পারছেন না। নিজেরা শুনানিতে থাকবেন, না উকিল লাগবে, তার খরচ কে জোগাবে– কমিশন এ বিষয়ে নির্বিকার।
ফলে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়েই কি এ বারের নির্বাচন হবে? এ ভাবে কেন লক্ষ লক্ষ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হত্যা করা হবে? এত দিন নির্বাচন কমিশনের কাজ ছিল ভোটার লিস্টে নতুন ভোটার যুক্ত করা। এ বারের এসআইআর দেখিয়ে দিল, কী ভাবে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হয় এবং যে কোনও উপায়ে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করে ইচ্ছামতো কাজে লাগিয়ে বিশেষ রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় আসার রাস্তা পরিষ্কার করা যায়। এটা চলতে দেওয়া কি গণতন্ত্রের পক্ষে বিপদ নয়?
নির্বাচন কমিশন এসআইআরেরনামে এনআরসিকেই আসলে কার্যকরী করছে যেটা কেন্দ্রীয় বিজেপির সরকারের অন্যতম অ্যাজেন্ডা। এর বিরুদ্ধে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) প্রতিবাদ জানিয়ে বারবার বিক্ষোভ দেখিয়েছে, প্রতিবাদে একাধিকবার কমিশনকে স্মারকলিপি দিয়েছে। জেলায় জেলায় সাধারণ মানুষকে নিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়েছে এবং এই প্রতিবাদ আগামী দিনেও চলতে থাকবে, যত দিন না মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা যায়।