নির্ভয়া তহবিলের টাকার নয়ছয় চলছে

প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়তে বাধ্য অসংখ্য নারী নির্যাতনের ঘটনা। ছোট শিশু থেকে বৃদ্ধা কেউই রেহাই পাচ্ছে না। শ্লীলতাহানি, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, খুন, এমনকি বীভৎস অত্যাচার করে খুনের ঘটনা ঘটে চলেছে। এই সব খবর প্রতিটি সংবেদনশীল মানুষকে উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত করে। নারীরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় ভীষণভাবে আতঙ্কিত। প্রশাসন ও সরকার নারীদের নিরাপত্তা দিতে শুধু ব্যর্থ তাই নয়, অভাব তাদের সদিচ্ছা নিয়েই। যার প্রমাণ আবারও পাওয়া গেল ‘নির্ভয়া তহবিল’ নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অক্সফ্যাম’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে।

দেখা যাচ্ছে, গত তিন বছরে নির্ভয়া তহবিলের টাকা খরচই করা হয়নি। এই খাতে দেওয়া কেন্দ্রের টাকা কোথায় যাচ্ছে? সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদেরও কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। দেখা গেছে এই তহবিলের অর্থ এমন এমন খাতে ব্যবহার হয়েছে, যার সঙ্গে নারী কল্যাণের সরাসরি কোনও যোগই নেই। ২০১৯-‘২০ অর্থবর্ষের বাজেটে কেন্দ্র নির্ভয়া তহবিলের জন্য বরাদ্দ করেছিল ৪৩৫৭ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা। এর বেশিটাই বরাদ্দ হয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জন্য। ফরেন্সিক ল্যাবের উন্নয়ন, বিপর্যয় মোকাবিলা, সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো খাতে ব্যবহার করা হয়েছে টাকা। নারী ও শিশু কল্যাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, আইন ইত্যাদি মন্ত্রকের মাধ্যমে নির্ভয়া তহবিলের টাকা খরচ হওয়ার কথা। রিপোর্ট বলছে, বেশিরভাগ মন্ত্রকই সে টাকা খরচ করেনি। কিছু সিসিটিভি ও পথবাতির ব্যবস্থা করে দায় সেরেছে। পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে রিপোর্টে। দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্তদের ৬০ শতাংশের পাশে দাঁড়াতে গেলেও যে টাকা প্রয়োজন, তার ২৫ শতাংশও বরাদ্দ হয়নি। সরাসরি মহিলারা উপকৃত হবেন এমন প্রকল্প অর্থাৎ মহিলাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট, আশ্রয় শিবির বা হেল্পলাইন তৈরির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ নামমাত্র। এই খাতে বরাদ্দ এ’বছরের মোট বাজেট বরাদ্দের ০.০৭ শতাংশেরও কম। নির্যাতিতা মেয়েদের আশ্রয় শিবির থাকলেও সেখানে প্রশিক্ষিত কর্মী নেই। ‘রেপ কিট’, যা ধর্ষণের প্রমাণ সংগ্রহ করতে লাগে তা রাখার পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। এমন অবস্থা যে নির্যাতিতাকে ছিন্নভিন্ন পোশাকে উদ্ধার করা হলেও তাকে নতুন পোশাক পর্যন্ত দেওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে গেলে পুলিশের যে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন তাতেও বিরাট ঘাটতি রয়েছে। নারীদের কল্যাণে সরকার কতটা দায়সারা মনোভাব নিয়ে চলে, এ চিত্রেই তা পরিষ্কার।

২০১২ সালে দিল্লিতে এক প্যারামেডিকেল ছাত্রী ‘নির্ভয়া’কে পাশবিক অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন করেছিল একদল দুষ্কৃতী। দেশজোড়া লাগাতার আন্দোলনের চাপে কংগ্রেস সরকার বাধ্য হয়েছিল নির্ভয়া তহবিল ঘোষণা করতে। এই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, সেই তহবিলের অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে। এমনকি নির্ভয়ার মা আশাদেবীও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘মহিলাদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের বদলে রাস্তা তৈরির মতো কাজে ব্যবহার হচ্ছে নির্ভয়া তহবিলের টাকা।’

ন্যাশনাল ক্রাইম বুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী নারীর উপর অপরাধের ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। ২০১৮-১৯ সালে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বেড়েছে ৭ শতাংশ, ভারতে প্রতিদিন গড়ে ৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বাস্তব চিত্র যখন এইরকম ভয়াবহ, তখন যে কোনও গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত ছিল সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে নারীর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, সংবেদনশীল মন নিয়ে নির্যাতিতার পাশে দাঁড়ানো, পর্যাপ্ত সংখ্যায় আশ্রয় শিবির খোলা, সেখানে উপযুক্ত চিকিৎসা ও থাকার পরিকাঠামো রাখা, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা। নির্ভয়া তহবিলের টাকায় এ সবের কিছুটা হলেও করা যেত। সরকারি প্রশাসনের নির্লজ্জ উদাসীনতায় সেটুকুও করা হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী স্লোগান দিয়েছিলেন– ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’। ‘বেটি’দের কেমন বাঁচাতে চান তিনি, উত্তরপ্রদেশের হাথরসের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তা দেখেছে দেশের মানুষ। বিজেপি শাসনে নারীদের ভয়াবহ পরিস্থিতি এই ঘটনায় আরও একবার সামনে এসেছে। পুলিশের ভূমিকাও চূড়ান্ত ন্যক্করজনক। ঘটনার ১১ দিন পর তারা ফরেন্সিক নমুনা সংগ্রহ করছে, যাতে কিছু প্রমাণ করা না যায়। নির্যাতিতার মৃত্যুকালীন জবানবন্দিকে অস্বীকার করে বলেছে ‘ধর্ষণই হয়নি’। এমনকী ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নির্যাতিতার গোপন অঙ্গ ছিন্নভিন্ন থাকার কথা থাকলেও তা অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং শেষপর্যন্ত নির্যাতিতার মৃত্যু হলে তার মা-বাবা সহ পরিবারের লোকেদের ঘরে আটকে রেখে রাতের অন্ধকারে ডিজেল ঢেলে নির্যাতিতার দেহ পুড়িয়ে দিয়েছে পুলিশ। বিজেপি সরকারের পুলিশ এভাবেই ধর্ষকদের শাস্তি না দিয়ে তাদের রক্ষকের কাজ করেছে।

উত্তরপ্রদেশের উন্নাওয়ে বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গার নিজেই অভিযুক্ত ধর্ষণ ও খুনের একাধিক ঘটনায়। জম্মুর কাঠুয়ায় শিশুকন্যাকে ধর্ষণের ঘটনায় ধর্ষণকারীর পক্ষে মিছিল করতে দেখা গেছে বিজেপির মন্ত্রী-বিধায়ককে। আইনশৃঙ্খলায় ‘মডেল’ রাজ্য যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশ, যিনি আবার প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত, তাঁর রাজ্যে বেটিদের নিরাপত্তা নেই কেন প্রধানমন্ত্রী জবাব দেবেন কি?

নারী নিরাপত্তা হরণকারীদের আশ্রয়দাতা এবং নারী নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ এই বিজেপি সরকারের নেতা-মন্ত্রীরাই আবার এ রাজ্যে ভোটে জিতলে নারী নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এর থেকে বড় ‘জুমলা’ আছে কী? জনগণকে চিনে নিতে হবে এই ঘৃণ্য শক্তিকে।

(গণদাবী-৭৩ বর্ষ ২৬ সংখ্যা_১৯ মার্চ , ২০২১)