জনগণের টাকা আত্মসাৎ করা তা হলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা!

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ব্যাঙ্কের আমানতের উপর সুদ কমিয়েই চলেছে। একবার স্থগিত করে দেওয়ার পরেও আবার বিল নিয়ে আসছে, যাতে কোনও ব্যাঙ্ক অনাদায়ী ঋণের দায়ে ফেল করলে সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষা দেওয়া আর সরকারের দায়িত্ব থাকবে না। ব্যাঙ্কের সাধারণ আমানতে কারা টাকা রাখে? কোনও শিল্পপতি বা পুঁজিপতি? না, রাখেন সাধারণ মানুষ, কয়েক কোটি পেনশনভোগী–যাঁদের এর উপরেই নির্ভর করে দিন চলে। কেন সরকার এ ভাবে সুদ কমাচ্ছে?

কেন সরকার আমানতের দায়িত্বটুকুও নিতে চাইছে না? সরকার নাকি নিরুপায়। আর্থিক পরিস্থিতি এত খারাপ যে সরকারকে কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ নাকি নিতেই হচ্ছে। সরকারের এই সব যুক্তি শুনে অনেকে মনে করেন, সত্যিই তো, এতে সরকার কি করতে পারে? সরকার তো আর দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জন্য দানছত্র খুলতে পারে না!

না। সাধারণ মানুষের জন্য দানছত্র কেউ সরকারকে খুলতে বলছে না। কিন্তু জনগণ তাদের কঠোর পরিশ্রমে অর্জন করা অর্থ যা ব্যাঙ্কে রাখেন, তা তো ব্যাঙ্কগুলি বিনিয়োগ করে মোটা রোজগার করে। তা হলে তা থেকে দেওয়া সামান্য সুদটুকুও ক্রমাগত কমাবে কেন? দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের কি কোনও দায়িত্ব নেই?

তা ছাড়া দানছত্র কি সরকার সত্যিই খোলেনি? জনগণের জন্য না হোক, দেশের পুঁজিপতিদের জন্য? দেশের বেশিরভাগ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে থাকলেও যাদের পুঁজির পরিমাণ প্রতি বছর লাফিয়ে বেড়ে চলেছে তাদের জন্য? দেখা যাক।

‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি ছোট সংবাদ বেরিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ‘ক্রেডিট স্যুশি এ জি’-র একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টকে উদ্ধৃত করে ‘দ্য হিন্দু’ লিখেছে, গত পাঁচ বছরে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ৭,৭৭, ৮০০ কোটি টাকার অনাদায়ী ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করে দিয়েছে। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী রাজ্যসভায় সদর্পে জানিয়েছেন, ২০১৮-‘১৯ অর্থবর্ষেই এই ঋণমকুবের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান আর্থিক বছরের দুটি ত্রৈমাসিকেই এই মকুবের পরিমাণ ৮০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা (বিজনেস টু ডে, ০৩-১১-১৯)।

কৃষিক্ষেত্রে সরকারের ঋণছাড়ের পরিমাণ মাত্র ৩৯,১৮৬ কোটি টাকা। জনগণের জন্য ১ শতাংশ সুদ বেশি দিলেও না হয় সরকারের গায়ে খুব লাগে। কিন্তু কারা এই সৌভাগ্যবান যাদের সরকার লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা এ ভাবে হেলায় ছেড়ে দিচ্ছে? দেশের মানুষ কি তাদের পরিচয় জানতে পারে না? না, পারে না। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, জাতীয় স্বার্থে এটা একটি গোপনীয় তথ্য। কেন? যারা জনগণের কষ্টার্জিত লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা ঋণ হিসাবে নিয়ে শোধ করার ক্ষমতা থাকা সত্তে্বও তা শোধ করল না, পুরো গায়েব করে দিল, সেই সব প্রতারকদের নাম গোপন রাখাটা জাতীয় স্বার্থ হয়ে গেল কোন যুক্তিতে? তা হলে জাতীয় স্বার্থ মানে কি শুধু এই মুষ্টিমেয় সংখ্যক পুঁজিপতিদের স্বার্থ? দেশের বাকি ৯৯.৯৯ শতাংশ সাধারণ মানুষের স্বার্থ তা হলে জাতীয় স্বার্থ নয়?

আসলে এরা হল সেই কর্পোরেট ধনিক শ্রেণি, যারা বিজেপি-কংগ্রেসের মতো দলগুলি চালানোর, ভোটে দেদার ওড়ানোর সব টাকা জুগিয়ে থাকে। বিনিময়ে এই দলগুলি যে যখন সরকারে যায়, এই সব পুঁজিপতিদের অবাধ মুনাফা লোটার, সব রকমের জাতীয় সম্পত্তি আত্মসাৎ করার সুযোগ করে দেয়।

এই নির্লজ্জ কর্পোরেট তোষণের লজ্জা থেকে মুখ ঢাকতে অর্থ প্রতিমন্ত্রী অবশ্য রাজ্যসভায় বলেছেন, ‘এই ঋণ ছাড় ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স সিটকে পরিষ্কার রাখতে করা হয়ে থাকে। তার মানে এই নয় যে, ঋণগ্রহীতাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইবুন্যাল আছে, তারা যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। ব্যবস্থা কী নেওয়া হয় তা দেশের মানুষ দেখতেই পাচ্ছে। বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি, মেহুল চোস্কিরা তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। কেমন করে সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে বিপুল পরিমাণের ঋণ অনাদায়ী রেখে এদের একের পর এক বিরাট অঙ্কের ঋণের আবেদন মঞ্জুর হয়ে যায়, কেমন করে ঘটনা প্রকাশ্যে এসে গেলে মন্ত্রীরা তাদের পালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন, মানুষের কাছে তা-ও স্পষ্ট। আসলে সরকারি মসনদে যারা বসে আছে, তারা ভাল করেই জানে কর্পোরেট সংস্থাগুলির আশীর্বাদেই তারা ক্ষমতায় বসতে পেরেছে। অর্থ জুগিয়ে, মিডিয়ার প্রচারের ব্যবস্থা করে ভোটের বৈতরণী তারা পার করেছে। ক্ষমতায় গিয়ে তাদের স্বার্থ তো দেখতেই হবে। আজ বিজেপি যা করছে, এক সময় কংগ্রেস তাই করেছে।

দেশটা যে ধনী-দরিদ্রে, শোষক-শোষিতে বিভক্ত, রাষ্ট্রটা যে একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং এর লক্ষ্য যে পুঁজিপতি শ্রেণিরই স্বার্থ রক্ষা করা, রাজনৈতিক দল মানেই যে কোনও না কোনও শ্রেণির দল, সরকার মানে যে আসলে পুঁজিপতি শ্রেণির পলিটিক্যাল ম্যানেজার, তাদের কাজ সরকারে বসে পুঁজিপতিদের স্বার্থ দেখা– এই কথাগুলো এমনিতে অনেকে মানতে চান না। দেশের একচেটিয়া পুঁজির মালিকদের এভাবে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করে দেওয়ার ঘটনা তাদের এই কঠোর সত্যিগুলো সহজে ধরতে সাহায্য করবে।

(গণদাবী : ৭২ বর্ষ ৩২ সংখ্যা)