
ভোটের দামামা বাজতেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের অ্যাজেন্ডায় চা-শ্রমিকদের জীবন-মানের উন্নয়নের ঘোষণা করে পাতার পর পাতা বিজ্ঞাপন দিয়েছে। ‘পিএমটি ওর্য়ার্কার ইনসেনটিভ স্কিম’-এ চা শ্রমিকদের উন্নয়নের লক্ষে্য আবাসন ও জমির অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। রাজ্য সরকার ‘চা সুন্দরী’ প্রকল্পের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের পাকা বাড়ি প্রদান ও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চা বাগান এলাকায় স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি এবং শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য ভাল ভাল উদ্যোগের কথাও রয়েছে তাতে। এর আগেও ভোটে শাসক দলগুলি নানা প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছে। বাস্তবে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকার চা-বাগান শ্রমিকরা কেমন আছেন?
দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, কোচবিহার, উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুর, আলিপুরদুয়ারের বহু বাগান বন্ধ। এলাকায় অন্য কোনও কাজ নেই। দৈনিক মাত্র ২৫০ টাকা মজুরিতে সংসার চালানো দায় এই ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধির বাজারে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সন্তানদের নিয়ে কোনও রকমে বাগান লাগোয়া বস্তির অন্ধকার ঘরে বাস করেন চা-শ্রমিকরা। বর্হিজগতের আলো যেমন, তেমনই শিক্ষার আলোও পৌঁছয় না বেশির ভাগ ঘরে। বাগান মালিকের শোষণ, ঠিকাদারদের অত্যাচার গরিব-অসহায় চা-শ্রমিকদের জীবনে নামিয়ে এনেছে গাঢ় অন্ধকার। মহিলা শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ। তাঁরা বাগান মালিক বা ঠিকাদারদের যৌন নির্যাতনের শিকার হন বহু সময়। পরিবারের সদস্যরা অনাহারের হাত থেকে বাঁচাতে বহু সময় নিজের সন্তানদের বাইরে কাজ করতে পাঠাতে বাধ্য হন। কেউ কেউ আড়কাঠিদের টোপে পড়ে মেয়েদেরও বাইরে পাঠান ভাল থাকা-খাওয়ার কথা ভেবে। শুধু ডুয়ার্স নয়, সিকিমেরও এমন পরিবারের ছেলে-মেয়েরা দালালের মাধ্যমে অন্য রাজ্যে কখনও কাজের লোক হিসাবে, কখনও যৌনপল্লিতে বিক্রি হয়ে যায়। চোখের জল ফেলেও কোনও সুরাহা দেখতে পান না বাবা-মা।
চা বাগানের ‘ওপেন সিক্রেট’ হল কাজ করতে যাওয়া মেয়েরা পাচার হয়, বিক্রিও হয়ে যায় অনেকে। পুলিশ, প্রশাসন সবই জানে। তা সত্ত্বেও এই সব মেয়েদের নাম শুধু নিখোঁজের তালিকাতেই স্থান পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে মামলা লঘু করার জন্য পাচারের পরিবর্তে অপহরণের মামলা দায়ের হয়। জীবনযুদ্ধে লড়াই করতে করতে বহু বাবা-মায়ের জন্য সম্বল হারিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্য শুধুই দীর্ঘশ্বাস।
এরকম অসংখ্য পরিবারে নতুন করে যুক্ত হয়েছে এসআইআর তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার ভাবনা। অনেক আদিবাসী, রাজবংশী চা শ্রমিক কয়েক প্রজন্ম ধরে বাগানে কাজ করেন, লাগোয়া বস্তি এলাকায় থাকেন বছরের পর বছর। সকলের জমির পাট্টা না থাকলেও তারা যে সেখানকার আদি বাসিন্দা তা প্রশাসন জানে। তাঁরা যে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা নন, তা নিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যেও কোনও সন্দেহ নেই। সব নথিপত্র দেওয়া সত্তে্বও ভোটার তালিকা বেরনোর পর দেখা গেছে তাদের অনেকেরই নাম নেই বা বিচারাধীন রয়েছে। এ রকম অসংখ্য মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশন চা শ্রমিক ও সিঙ্কোনা শ্রমিকদের নিজস্ব যে পরিচয়পত্র রয়েছে, তা শুনানিতে গ্রাহ্য হবে বললেও হয়রানি চলছে তাদের।
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছেন, তৃণমূল সরকার রাজ্যের ৩.৭ লক্ষ চা-শ্রমিকের সাথে অন্যায় করেছে। তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিক বরাইক বলেছেন, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী কি বলতে পারবেন, পশ্চিমবঙ্গের জন্য তিনি কোনও অর্থ বরাদ্দ করেছেন, তিনি কি কোনও বিজ্ঞপ্তি দেখাতে পারবেন? এ কথা বলে তিনি মুখ্যমন্ত্রী চা-শ্রমিকদের জন্য কী করেছেন তার লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছেন (আবপ-২৬ মার্চ,২৬)। মহিলা চা শ্রমিকদের জন্য ২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৩১৩ কোটি টাকা রাজ্য সরকার খরচ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৫ সালে চা-শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি চালু করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্যের তৃণমূল সরকার। তারপর পেরিয়ে গেছে এক দশক। রাজ্যের লক্ষাধিক চা-শ্রমিকের নূ্যনতম মজুরি নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। ২০২১ সালে আলিপুরদুয়ারে সরকারের ন্যূনতম মজুরি অ্যাডভাইজারি কমিটি শেষ বৈঠকে বসেছিল। সেখানে চা-শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল দৈনিক ৬৬০ টাকা। সেই মজুরি এখনও চালু হয়নি। এখন দৈনিক মজুরি মাত্র ২৫০ টাকা।
এই রকম পরিস্থিতিতে নির্বাচন এসেছে। দুয়ারে দুয়ারে শাসক-বিরোধী নানা দলের প্রাথ¹রা যাচ্ছেন। অন্য বারের মতো প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন চা-শ্রমিকদের উন্নয়ন করার। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দলের প্রার্থীরাও যাচ্ছেন তাদের কাছে। কিন্তু এই দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সচেতন করছেন চা-শ্রমিকদের। তারা বোঝাচ্ছেন, তাদের দুরবস্থার জন্য দায়ী বাগান মালিকদের দোসর হিসাবে কাজ করা শাসক দলগুলি। তারাই মালিক-শ্রমিকের মধ্যে আপসকামী শক্তি হিসাবে চা-শ্রমিকদের জীবনকে করে তুলছে আরও দুর্বিষহ। বিপরীতে আজকের শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চা-শ্রমিক সহ সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হচ্ছেন একমাত্র এস ইউ সি আই (সি) প্রার্থীরা– তা বিধানসভার ভিতরে হোক বা রাস্তায়।