
প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর রাতারাতি নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে ব্যাঙ্কে নোট বদলানোর দীর্ঘ লাইন, আর সেই লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শতাধিক মানুষের মৃত্যু। করোনার সময়ে প্রয়োজনীয় খাবার জোগাড়ের জন্য উদ্বিগ্ন মানুষের ছোটাছুটি। গ্যাসের দোকানে গ্যাসের সঙ্গে আধারের সংযোগের জন্য দীর্ঘ লাইন। তারপর এসআইআরে প্রথমে নাম তুলতে নথি জমা দেওয়ার লাইন, তারপর লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে নামের বানান সংশোধন করতে দীর্ঘ লাইন। সব শেষে খালি সিলিন্ডার নিয়ে গ্যাসের দোকানের সামনে নাগরিকদের দীর্ঘ লাইন।
বাস্তবিক প্রতিটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের চরম পরিকল্পনাহীনতাই দেশের মানুষকে চরম দুর্ভোগে ফেলেছে। এ বারের গ্যাস-সংকটেও সরকারের পরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট। ভারতের গ্যাস সরবরাহের বেশির ভাগটাই আমদানি-নির্ভর। তা আসে মূলত পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। ইজরায়েল-আমেরিকার ইরানে হামলার এই পরিস্থিতিতে তা প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হলে, দূরদৃষ্টি থাকলে সরকারের মন্ত্রীরা আগে থেকেই বাড়তি গ্যাস মজুত করার কথা ভাবতেন। সে সব কোনও কিছু না করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মন্ত্রীরা শুধু বিবৃতি দিয়ে গেছেন যে, গ্যাস কিংবা তেল কোনও কিছুরই কোনও সমস্যা নেই।
বাস্তবে কী ঘটছে? সাধারণ মানুষ প্রয়োজন মতো গ্যাস পাচ্ছেন না। ডিলাররা বুকিং নম্বর অফ করে রেখেছে। গ্যাসের দোকানে বুকিংয়ের লম্বা লাইন। কোথাও খালি সিলিন্ডারের দীর্ঘ লাইন। ঠিক তখনই কেন্দ্রের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের থেকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, গ্যাস বুকিংয়ের জন্য লাইন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। গৃহস্থের জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের কোনও অভাব নেই। যদি সত্যিই কোনও অভাব না থাকে তবে সিলিন্ডারের জোগানে সরকার রাশ টানছে কেন? কেন প্রথমে ২১ দিন, পরে ২৫ দিনের আগে বুকিং না নেওয়ার কথা বলা হল? গ্রামাঞ্চলে সেই সময়কাল ৪৫ দিন করা হল কেন? গ্রামাঞ্চলে ৪-৫ জনের পরিবারে একটা সিলিন্ডারে কি দেড় মাস চলবে? তার পর কী দিয়ে রান্না হবে? কাঠ, কয়লা কিংবা খড়কুটো দিয়ে? প্রধানমন্ত্রীই তো এক সময়ে দাবি করেছিলেন, উজ্জ্বলা প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি গ্রামের মানুষকে ধোঁয়ার হাত থেকে রক্ষা করেছেন। সরকার এখন মানুষকে কেরোসিনে রান্নার কথা বলছে। অথচ এই সরকারই রেশনে কেরোসিন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। খোলা বাজারেও তা অমিল এবং দাম প্রায় ১০০ টাকার উপর। সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা তো দূরের কথা, তা ছোঁয়াও সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের ব্যাপক ভোগান্তি ছাড়াও এই সবের ফল কী হয়েছে? প্রথমত, বড় বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির কালোবাজারে অনেক বেশি দাম দিয়ে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। ক্ষুদ্র সংস্থাগুলি মার খাচ্ছে। কেউ কেউ গৃহস্থের ব্যবহারের সিলিন্ডার বেশি দাম দিয়ে কিনে ব্যবহার করছে। ছোট হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফুটপাথের খাবারের দোকানগুলি সিলিন্ডার জোগাড় করতে না পেরে কার্যত বন্ধ হওয়ার মুখে। ফলে দেশ জুড়ে অসংখ্য শ্রমিক-কর্মচারী কাজ হারানোর মুখে। স্কুলগুলিতে গ্যাসের অভাবে মিড ডে মিল বন্ধ হতে চলেছে। হাসপাতালগুলিতেও গ্যাসের জোগানে সংকট দেখা দিয়েছে। গৃহস্থ এবং ছোট সংস্থাগুলির এই সংকটের সময়ে সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা কার্যত ঠাণ্ডা ঘরে বসে বাণী দিচ্ছেন, বুকিংয়ের আড়াই দিনের মধ্যেই গ্যাস পেয়ে যাবেন। এই শুকনো আশ্বাসে কিছুতেই যে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ সিলিন্ডার হাতে লম্বা লাইনই তার প্রমাণ। অশক্ত দেহ বৃদ্ধ থেকে সাধারণ মানুষ কাজকর্ম বন্ধ রেখে গ্যাসের দোকানের সামনে লাইন দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বাস্তবে বর্তমান গ্যাস-সংকট মোদি সরকারের অপদার্থতার এক বিরাট নজির হয়ে থাকবে।
কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ইরানে মার্কিন-ইজরায়েল হামলা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই গৃহস্থের গ্যাসের দাম সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা বাড়িয়ে দিল। মাত্র ১১ মাস আগেই সরকার তা বাড়িয়েছিল ৫০ টাকা। যে রান্নার গ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অজুহাতে একটা গণতান্ত্রিক সরকার সঙ্গে সঙ্গে তার দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের উপর তার বোঝা চাপাতে পারে? একটা গণতান্ত্রিক সরকার প্রথমে তো চেষ্টা করবে যাতে জনগণের উপর বোঝা চাপাতে না হয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর সময় থেকেই রাশিয়া থেকে ভারত অতি সস্তা দরে জ্বালানি তেল নিয়ে আসছে। ফলে বিপুল টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সেই কম দামের কোনও সুবিধা দেশের সাধারণ মানুষকে পেতে দেওয়া হয়নি। সরকার অজুহাত দিয়েছিল, কোনও কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে যাতে দেশীয় বাজারে দাম বাড়াতে না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। অথচ আজ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা বাড়তেই সরকার তার সব প্রতিশ্রুতি ভুলে গিয়ে বাড়তি দামের বোঝা সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিল। তা ছাড়া সরকার জানিয়েছে, দেশে এলপিজি-র উৎপাদন ৫ মার্চের পর থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। তা হলে দেশে উৎপাদিত সেই গ্যাস কেন সাধারণ মানুষ আগের দামে পাবে না? দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকার গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বৃহৎ পুঁজিপতিদের ৬ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কঋণ হিসাবের খাতা থেকে মুছে দিয়েছে। সেই সরকার দেশের মূল্যবৃদ্ধি-বেকারি জর্জরিত সাধারণ মানুষের জন্য সামান্য ভরতুকিটুকু কোষাগার থেকে দেবে না কেন?
হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান তার বিরোধী দেশগুলির জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ভারতের তেল-গ্যাসের জাহাজগুলিও আটকে পড়েছে। ইরান ভারতের বহু দিনের মিত্র। তা হলে ভারতের প্রতি সে দেশের এই শত্রুতামূলক আচরণ কেন? বাস্তবে ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে আমেরিকা এবং ইজরায়েলকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে ইরানকে শত্রু দেশে পরিণত করেছে ভারত নিজেই। আমেরিকা এবং ইজরায়েলে দেশীয় একচেটিয়া পুঁজির ব্যবসায়িক স্বার্থে এক দিকে স্বৈরাচারী ট্রাম্প এবং অন্য দিকে প্যালেস্টাইনে যুদ্ধাপরাধী হিসাবে আন্তর্জাতিক ভাবে সাব্যস্ত এবং আগ বাড়িয়ে ইরানে হামলা চালানো ইজরায়েলকে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে ভারত। আম্বানিদের বিপুল ব্যয়ে তৈল শোধনাগার তৈরির খবর এবং ইজরায়েলে আদানি সহ দেশীয় একচেটিয়া পুঁজিমালিকদের বিপুল বিনিয়োগই প্রমাণ করে যে ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে ভারতের সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির স্বার্থের পায়ে বলি দিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ভারতের সাধারণ মানুষ কি মোদি সরকারের এই স্বেচ্ছাচার চুপচাপ মেনে নেবে?