
আমি একজন নির্মাণ শ্রমিক।
আগস্ট ১৯৯১-এর আগে আমরা এক দেশে বাস করতাম এবং তারপর বাসিন্দা হয়েছি আর এক অন্য দেশের। সেই আগস্টের আগে আমাদের দেশের নাম ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
আমি কে? আমি হচ্ছি সেই মূর্খদের একজন যারা বরিস ইয়েলৎসিনকে সমর্থন করেছিল। আমি রুশ হোয়াইট হাউস-এর সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলাম, ট্যাংকের পথ অবরোধ করে দাঁড়িয়েছিলাম। তখন রাস্তা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে, ঢেউয়ের চূড়ায় শুধু মানুষের মাথা। সে ঢেউ যেন আছড়ে পড়েছিল। সেই মানুষগুলো মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত ছিল স্বাধীনতার জন্য, পুঁজিবাদের জন্য নয়। আজ নিজেকে এক প্রতারিত মানুষ বলে মনে হয় আমার। ভুল পথে চালিত করে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা সেই পুঁজিবাদ আমরা চাইনি। না, … মার্কিন কিংবা সুইডিশ, পুঁজিবাদের কোনও মডেলই আমাদের প্রয়োজন নেই। অন্যের সম্পত্তি হাতানোর জন্য আমি সে দিন বিদ্রোহ করিনি। আমরা সে দিন চিৎকার করেছিলাম– ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’ নয়, ‘রাশিয়া’! আমার আফসোস হয়, কেন ওরা সেই দিন আমাদের ওপর জলকামান চালায়নি বা গোটা দুই মেশিনগান নিয়ে আসেনি। ওদের উচিত ছিল দুশো বা তিনশো জনকে গ্রেপ্তার করে রাখা, বাকিরা এমনিতেই তা হলে গা ঢাকা দিত।
সেই সব লোকগুলো যারা সেদিন আমাদের রাস্তায় নামিয়েছিল, তারা আজ কোথায়? সেই ‘ক্রেমলিন মাফিয়া নিপাত যাক। আগামী দিন হল স্বাধীনতার’ বলা লোকগুলো! আজ তাদের মুখে কোনও কথা নেই! তারা সব পশ্চিমে পালিয়েছে, এখন তারা শিকাগোর ল্যাবরেটরির আDায় বসে সমাজতন্ত্রকে গালি দেয়। আমরা এখন বসে আছি ‘রাশিয়াতে’। এখন তারা এ সব থেকে নিজেদের হাত ধুয়ে ফেলেছে। আজ এই রাশিয়ার মুখের ওপর যে কেউ একটা থাপ্পড় মেরে যেতে পারে। ওরা আমাদের দেশটাকে বিদেশের ছেঁড়া কাঁথা, নষ্ট হওয়া ওষুধের আঁস্তাকুড়ে পরিণত করেছে।
পাত্রভর্তি কাঁচামাল, প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইপ … এটুকুই কি ছিল সোভিয়েত শাসন ব্যবস্থা? হয়তো সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন ছিল না, কিন্তু এখন যা চলছে তার থেকে শতগুণ ভাল ছিল, উন্নত ছিল। সবচেয়ে বড় কথা সমাজতন্ত্র নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম। কেউ মাত্রাতিরিক্ত ধনী কিংবা দরিদ্র ছিল না। কোথাও কোনও আশ্রয়হীন মানুষ বা পরিত্যক্ত শিশু ছিল না। বয়স্ক লোকেরা নিজেদের পেনশনের টাকায় জীবন কাটাতে পারতেন। কাউকে বেঁচে থাকার জন্যে রাস্তার আবর্জনা বা ফেলে দেওয়া খাবার কুড়োতে হত না। তারা ভিক্ষার আশায় হাত বাড়িয়ে সজল চোখে তাকিয়ে থাকত না। … পেরেস্তে্রাইকার কারণে কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক হিসেব আমরা এখনও জানি না।
আমাদের আগের সেই জীবনধারা একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। খুব শীঘ্রই হয়ত দিন আসবে যে দিন আমার ছেলের সাথে আমার কথা বলার কোনও বিষয় থাকবে না। আমার ছেলে স্কুল থেকে ফিরে আমাকে বলে, ‘বাবা, পাভলিক মোরোজভ একটা মূর্খ। মারাট একজন কিম্ভূত। কিন্তু তুমি যে আমাকে শিখিয়েছিলে…।’ আমি তাকে সেই শিক্ষাই দিয়েছিলাম যা আমি নিজে পেয়েছিলাম। সঠিক শিক্ষা– সেই ‘জঘন্য সোভিয়েত’ জীবনধারা। সেই ‘জঘন্য সোভিয়েত’ জীবনধারা আমাকে শিখিয়েছিল শুধু নিজের কথা না ভেবে অন্যদের জন্য ভাবতে। শিখিয়েছিল দুর্বল, পীড়িত মানুষকে নিয়ে ভাবতে। এখনকার মতো দামি পোশাক পরা, কেবল রূপ আর টাকার থলি নিয়েই ব্যস্ত তারকারা আমাদের হিরো ছিল না। বরং নিকোলাই গ্যাস্টেলোর (সোভিয়েত লাল ফৌজের একজন সৈনিক যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ করতে গিয়ে শহিদ হন) মতো বীর ছিল আমাদের হিরো। ‘বাবা, তুমি দয়া করে আর তোমার ওই মানবতাবাদী বড় বড় কথা শুরু কোরো না, ওসব হাবিজাবি দরকার নেই।’ এ রকম কথাবার্তা আমার সন্তান শিখল কোথা থেকে? ওর বয়স মাত্র ১২ বছর, কিন্তু জানেন তো, আজকাল মানুষ পাল্টে গেছে পুঁজিবাদী প্রভাবে। আমার ছেলের চোখে আমি আর উদাহরণ নই।
কেন আমরা ইয়েলৎসিনকে সমর্থন করেছিলাম? লক্ষ লক্ষ লোক তাকে সমর্থন করেছিল, যখন সে বলেছিল যে, পার্টি কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধে বন্ধ হবে। আমি প্রস্তুত ছিলাম যে কোনও মুহূর্তে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মেশিনগান ধরতে, তাদের দিকে গুলি চালাতে। আমি বিশ্বাস করেছিলাম … আমরা আসলে তখন বুঝিনি আসলে তারা আমাদের জন্য কী তৈরি করছিল। ভিতরে ভিতরে ইয়েলৎসিনরা আসলে আমাদের কোন দিকে ঠেলছিল, সেটা আমরা কেউ টের পাইনি। এ এক মস্ত প্রতারণা। ইয়েলৎসিন লালের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে শ্বেতরক্ষীদের দলে নাম লিখিয়েছে। এক মস্ত বিপর্যয় ঘটে গেল। … প্রশ্ন হল, আমরা কী চেয়েছিলাম? সুন্দর, সভ্য, মানবিক সমাজতন্ত্র। … আর আমরা কী পেলাম? রক্তপিপাসু পুঁজিবাদ এখন রাস্তায় দাপিয়ে বেড়ায়– গোলাগুলি, বোমাবাজি চলে। ব্যবসায় কারখানায় কারা সব মালিক হয়েছে! গুণ্ডারা, কালোবাজারিরা সবার ওপরে বসে আছে। তাদের হাতে সব ক্ষমতা। জনগণের শত্রু, শিকারি শেয়ালের দল!
আমি কোনও দিন ভুলব না। আমি ভুলতে পারব না, কী ভাবে আমরা হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। কার সুবিধের জন্যে আমরা সেদিন দাঁড়িয়েছিলাম?
আমার বাবা একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট ছিলেন। ছিলেন একজন নৈতিক চরিত্রের মানুষ। তিনি একটি বড় কারখানার পার্টি সংগঠক ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লড়েছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘এটাই স্বাধীনতা। আমরা স্বাভাবিক সভ্য দেশ হতে চলেছি।’… উনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘তোমার সন্তানেরা পরিণত হবে চাকরে। এ কি তুমি সত্যিই চাও’? আমার বয়স এবং বুদ্ধি, দুই-ই তখন অল্প ছিল। … আমি তাঁর মুখের ওপর হেসেছিলাম। আমরা অতিরিক্ত বোকা ছিলাম। আমি সত্যিই জানি না কেন সব এ রকম হয়ে গেল। আমরা কেউই এ রকমটা হোক চাইনি। পেরেস্ত্রোইকা সম্বন্ধে আমাদের সকলের ধারণা সম্পূর্ণ অন্য রকম ছিল। আমরা ভেবেছিলাম এ বুঝি এক অভিনব জিনিস।
এক বছর পর ওরা আমাদের ডিজাইন বুরো বন্ধ করে দেয় এবং আমি ও আমার স্ত্রী কর্মহীন হয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াই। কী ভাবে আমরা বেঁচে থাকলাম? প্রথমে, আমাদের সমস্ত মূল্যবান সম্পত্তি, আমাদের সব বই, আমাদের সোভিয়েত সোনা, মূল্যবান যা কিছু ছিল সব বাজারে বিক্রি করে দিই। সপ্তাহের পর সপ্তাহ আমরা কাটিয়েছি কেবল আলু সিদ্ধ খেয়ে। তারপর আমাকে ব্যবসায় নামতে হল। আমি পোড়া সিগারেট বিক্রি করা শুরু করি– এক লিটার অথবা তিন লিটারের কৌটো ভর্তি পোড়া সিগারেট। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি (পেশায় কলেজ শিক্ষক ছিলেন) রাস্তা থেকে পোড়া সিগারেট কুড়িয়ে আনতেন, আর আমি সেগুলো বিক্রি করতাম। আর লোকে এগুলো কিনত, সেবন করত। আমি নিজেও করেছি। আমার স্ত্রী অফিস ঝাঁট দিত। এক সময়ে তাকে কোনও এক তাজিকিস্তানী ব্যবসায়ীর হয়ে পেলমেনি (এক ধরনের খাবার) বিক্রি করতে হয়েছিল। মূর্খামির ফল আজও ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের সকলকে। … এখন আমি ও আমার স্ত্রী দুজনে মিলে মুরগি পালন করি, কিন্তু দুঃখের কান্না তার আজও থামেনি। কোনও ভাবে যদি সময়কে পিছিয়ে দিয়ে আবার অতীতে ফিরে যেতে পারতাম!
(সেতলানা অ্যালেক্সেইভিচ-এর ‘সেকেন্ড হ্যান্ড টাইমঃ দ্য লাস্ট অফ দ্য সোভিয়েটস’ বই থেকে)