
প্রদীপের আলোর নিচে থাকে গভীর অন্ধকার– উপমাটা বৈষ্যমে ভরা ভারতের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ সত্য। অর্থনীতিতে বিশ্বে পঞ্চম স্থান অধিকার করতে চলেছে ভারত–১৭ অক্টোবর এক সভায় এমনই দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অথচ সম্প্রতি প্রকাশিত এনসিআরবি-র ২০২৩-এর রিপোর্টে দেশের সাধারণ জনগণের দুরবস্থার এক করুণ ছবি ফুটে উঠেছে– কৃষক ও কৃষিমজুর মিলে ১০,৭৮৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।
পারিবারিক অশান্তির কারণে কৃষকরা আত্মহত্যা করেন বলে নিজেদের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করে থাকেন সব জমানার নেতা-মন্ত্রীরাই। কিন্তু কৃষক পরিবারে এত অশান্তি হচ্ছে বা কেন– সে উত্তর তো সরকারকে দিতে হবে! আসলে অন্য ক্ষেত্রের মতো পুঁজিবাদী বাজার সংকটের শিকার হয়ে কৃষিজীবী মানুষও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, পরিণামে অনন্যোপায় হয়ে চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁদের একটা বড় অংশ।
সম্প্রতি জিএসটি কমানোর আওয়াজ তুলে বিজেপি সরকার দাবি করেছে, অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো কৃষি উপকরণের দাম কমে গেছে অনেকখানি। বাস্তবটা কী? বহুজাতিক কোম্পানিগুলির কব্জায় থাকা কৃষি উপকরণ সার-বীজ-কীটনাশকের অস্বাভাবিক দামবৃদ্ধির পর ছিটেফোঁটা দাম কমা কৃষকদের সমস্যার সমাধান দূরে থাক, তার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারে না। এর সাথে যুক্ত হচ্ছে সেচের জন্য বিদ্যুৎ ও ডিজেলের দাম বাড়া, বর্তমানে অবশ্যপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠা নানা যন্তে্রর ভাড়া বৃদ্ধি ফসলের উৎপাদন ব্যায় প্রচুর বাড়িয়েছে। এ ছাড়া আছে ফসলের এমএসপি না পাওয়া। সর্বোপরি সরকারের কৃষি ও কৃষক স্বার্থবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি– সব কিছু মিলিয়ে ক্ষুদ্র ও মধ্য চাষি আজ চরম বিপন্ন। আর কৃষিমজুররা তো অন্যের জমিতে জনমজুরি করে, কৃষকের আয় কমলে তাদের কাজও থাকে না।
সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়কড়ি বলেছিলেন, কৃষকরা কৃষিপণ্যের সঠিক দাম পাচ্ছেন না। এর জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি বলেছেন, ২০২৬-২৭ সালের রবি শস্যের জন্য এমএসপি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রিসভায়। কৃষকদের জন্য মন্ত্রীদের এত চোখের জল সত্ত্বেও চাষির জীবনে সুরাহা আসছে না কেন? এর আগে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এ ২০২৫-২৬ সালের খরিফ শস্যের জন্যও এমএসপি বৃদ্ধির ঘোষণা হয়েছিল, প্রচারও হয়েছিল অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে। ১৪টি ফসলের জন্য নূ্যনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। চাল ও গমে মূল্য বেড়েছিল সামান্য। রাগি, জোয়ার, বাজরা, তিল, সয়াবিন, ভুট্টা প্রভৃতিতে একটু বেশি। অথচ স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ ছিল, উৎপাদন খরচের দেড়গুণ এমএসপি দিতে হবে। সেই অনুসারে ধানে এমএসপি হয় প্রতি কুইন্টালে অন্তত তিন হাজার টাকা, সেখানে সরকার ধার্য করেছে মাত্র ২৩৬৯ টাকা। একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থে ভারতে বেশিরভাগ মানুষের মৌলিক খাদ্য ধান-গমের বদলে রপ্তানি-বাজারের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য শস্য উৎপাদন করতে উৎসাহিত করছে। সেই অঞ্চলের আবহাওয়া, মাটি, জলসেচ ব্যবস্থা কেমন তা বিচার না করে বহু সময়েই অবৈজ্ঞানিক ভাবে চাষের বন্দোবস্ত হচ্ছে। ফলে বহু সময়েই ফসলের গুণমান ভাল হচ্ছে না, ন্যায্য দামও পাচ্ছে না চাষিরা।
২০২১ সালের পর থেকে ২০২৪-২৫-এ সর্বাধিক ৩৩.৩ মিলিয়ন টন গম উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু এই ‘বাম্পার’ ফলনেও সরকার ঘোষিত এমএসপি পাচ্ছেন না চাষিরা। এ ভাবে বহু সময়ে উৎপাদন বেশি হলেও উৎপাদন ব্যয়ের থেকে এমএসপি কম হওয়ায় লোকসানে পড়ছে চাষি। সরকারি উদ্যোগে কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনার ব্যবস্থা না থাকায় ফড়ে ও ব্যবসায়ীরা নানা টালবাহানা দেখিয়ে চাষিদের উৎপাদন খরচের থেকে কম টাকা দেয়। উৎপাদিত ফসল মজুত করার পরিকাঠামো আদানি থেকে শুরু করে বৃহৎ কর্পোরেট কোম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছে সরকার। এমনিতেই আলু, সবজি ইত্যাদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা সরকারি তরফে অত্যন্ত কম। ফলে বারবার চাষিরা মার খায়। ধান-গম সহ অন্যান্য শস্যের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। সরকার চাষির স্বার্থ না দেখে কর্পোরেট পুঁজিপতিদের স্বার্থে কাজ করছে। মহাজনের কাছে চড়া সুদে ঋণ করতে বাধ্য হয় চাষি। ফসলের উৎপাদন ব্যয়ের থেকে এমএসপি কম হলে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হলে সেই ধার শোধ করতে পারে না। সে সময় ঋণ মকুব করতে সরকারের কোনও ভূমিকাই দেখা যায় না।
তা হলে চাষিদের স্বার্থে সরকারের প্রচারই সার, না তারা সত্যিই দরিদ্র, নিরন্ন কৃষকদের কথা ভাবে? সরকার যদি সত্যিই চাষির স্বার্থ দেখত, তা হলে ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার ব্যবস্থা করত। এমএসপি আইনসিদ্ধ করত। উৎপাদনের খরচের দেড়গুণ হিসাবে ফসলের দাম নির্ধারণ করত।
এই কাজটি বিজেপি নেতারা করছে কেন? দেশের কৃষিক্ষেত্রকে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে– কৃষির উৎপাদন, মজুত এবং বিক্রি সবটাই একচেটিয়া ধনকুবেরদের হাতে তুলে দিতে চাইছে। এ ভাবে আদানি ও অন্যান্য একচেটিয়া পুঁজিপতিদের হাতে গোটা কৃষিক্ষেত্র ও খাদ্যের ব্যবসাকে তুলে দিতে চাইছে সরকার। কারণ সরকারি দল এবং সংসদীয় বিরোধী দল সকলেই পুঁজিপতি শ্রেণির রাজনৈতিক ম্যানেজার হিসাবে কাজ করে চলেছে। তার হাত থেকে বাঁচতে হলে কৃষিজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফসলের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে এবং কৃষিতে কর্পোরেট মালিকদের আক্রমণের প্রতিবাদে ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনের মতো ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দিল্লির ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন সরকারের কৃষক মারা নীতিকে যেমন ভাবে প্রতিহত করেছিল, তেমনই কৃষিক্ষেত্রকে একচেটিয়া পুঁজির হাতে পুরোপুরি বিকিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনকেই হাতিয়ার করতে হবে। এই লড়াইয়ের পথে কৃষকদের সামনে উদভাসিত হবে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কৃষকদের এই সমস্যার মৌলিক সমাধান নেই। পুঁজিপতিদের এই শোষণ-বঞ্চনা থেকে বাঁচতে হলে এই অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে হবে।