Breaking News

আর জি করঃ বিচার আর কবে?

‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘বিচার চাই’ – বিগত দুটি বছর ধরে শুধু স্লোগানে নয়, মানুষের মনে সর্বক্ষণের জন্য বারবার অনুরণিত হয়ে চলেছে এই দাবি। কিন্তু দু বছর পার করেও বিচার পেল না আর জি কর হাসপাতালের নিহত স্নাতকোত্তর ছাত্রী অভয়া। বিচার পেল না প্রতিবাদী মানুষ। ২০২৪-এর ৯ আগস্ট দুপুরে আর জি কর হাসপাতাল চত্বরে দাঁড়িয়ে যে আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ওই হাসপাতালের ছাত্র, জুনিয়র ডাক্তার এবং কয়েকজন প্রাক্তনী। মৃতদেহ আটকে রেখে তাঁরা দাবি তুলেছিলেন, ম্যাজিস্ট্রেট না এলে তা সরানো যাবে না। সেই আন্দোলন রাজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে। একে কেন্দ্র করে এক অভূতপূর্ব জনজাগরণের সাক্ষী থেকেছে সারা দেশ। অপরাধীদের আড়াল করতে চাওয়া তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের বিরুদ্ধে আছড়ে পড়া তীব্র জনরোষের ঢেউকে ভোটে কাজে লাগাতে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ক্ষমতায় বসার এক সপ্তাহের মধ্যে আর জি কর হত্যাকাণ্ডের দোষীদের ফাইল খুলবে তারা। দেখা গেল বিজেপির রাজ্য সরকার সশব্দে কিছু ফাইলে ধুলোটুলো ঝাড়ার ভঙ্গি করলেও বাস্তবে কোনও ফাইলই খোলা হয়নি। এর আগে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের পরিচালিত সিবিআই তৃণমূল সরকারের তাঁবেদার পুলিশের রিপোর্টে নিজেদের স্ট্যাম্প লাগিয়ে তদন্ত শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তীব্র গণবিক্ষোভের চাপে তারা সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট দেওয়ার কথা বলতে বাধ্য হয়। যদিও দু’বছর ধরে সে বস্তুটির দেখা পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, আইনজীবী, সমাজকর্মী সহ সাধারণ মানুষ ‘ভয়েস অফ অভয়া, ভয়েস অফ উইমেন’-এর পক্ষ থেকে বারবার সিবিআই দপ্তরে গিয়ে দাবি করেছেন, তদন্তের অগ্রগতি কী হল মানুষকে জানানো হোক। তাঁরা বারবার প্রশ্ন করেছেন, আর জি কর হাসপাতালে দীর্ঘদিন সিল করে রাখা ঘরে সিবিআই কেন খুঁটিয়ে তদন্ত করছে না! কেন সমস্ত সন্দেহভাজনকে সিবিআই জেরা করছে না! কারা প্রমাণ লোপাটের জন্য আর জি করে ভঙচুর করতে গিয়েছিল তাদের চিহ্নিত করে তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন!

জুনিয়র ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল ও নার্সিংয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বারবার দাবি তুলেছেন, যে দুর্নীতি চক্র ও থ্রেট কালচার অভয়ার নৃশংস হত্যা ও ধর্ষণের জন্য দায়ী মাথাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে। রাজ্যে সরকারি গদিতে পালা বদলের পর মানুষের এই আশা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু তিন পুলিশ অফিসারকে সাসপেন্ড করা ছাড়া নতুন কোনও পদক্ষেপ দেখাই যায়নি। তৃণমূল সরকারের আমলের স্বাস্থ্য সচিব বহাল তবিয়তে সেই চেয়ারেই আছেন। অথচ থ্রেট কালচার ও দুর্নীতি চক্রের মদতদাতা হিসাবে তাঁর অপসারণের দাবি ছিল আর জি কর আন্দোলনের অন্যতম দাবি। যে তিন পুলিশ অফিসারকে এখন বিজেপি সরকার সাসপেন্ড করেছে তাঁদের পূর্বতন পোস্ট থেকে সরাতে বাধ্য হয়েছিল তৃণমূল সরকারই।

আর জি কর আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সারা ভারতে তা ছড়িয়ে পড়তে দেখে আন্দোলনের গতিতে কিছুটা রাশ টানার উদ্দেশ্যে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত মামলা শুরু করে। সেই মামলায় সিবিআই তৎকালীন প্রধান বিচারপতির কাছে একটি মুখ বন্ধ খামে রিপোর্ট জমা দেয়। যা পড়ে নাকি বিচারপতি শিউরে উঠেছিলেন! পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্ট মামলা থেকে সরে যায়, কলকাতা হাইকোর্টের হাতেই আসে এই মামলা। কিন্তু সেই শিউরে ওঠা রিপোর্টের ভিত্তিতে সিবিআই কী করল? আর জি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ, টালা থানার তৎকালীন ওসি, তাদের চক্রের যারা অংশীদার কারও বিরুদ্ধেই সিবিআই খুন ও ধর্ষণের চক্রান্ত, প্রমাণ লোপাটের কোনও প্রমাণই কার্যত পেশ করেনি। দুর্নীতির প্রশ্নে কিছু কথা সিবিআই বললেও সে তদন্তও চলছে শামুকের গতিতে। রাজ্যে সরকারি গদিতে পালা বদলের পর রাজ্য সরকার সিবিআইকে তৎপর হওয়ার জন্য কোনও কথা বলেনি। বিজেপির রাজ্য নেতারা তাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে সিবিআইয়ের অপদার্থ ভূমিকা নিয়ে কোনও কথা বলেছে এমনটা শোনা যায়নি। সিবিআইকে অপদার্থতার জন্য তিরস্কার করেছে কলকাতা হাইকোর্ট।

আদালতের পর্যবেক্ষণ বলছে, এতগুলো দিন ধরে সিবিআই আদৌ কোনও তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়নি। তীব্র ভৎর্সনার পর সিবিআই তাদের তদন্তকারী অফিসার বদল করেছে। কিন্তু ৬ আগস্টেও হাইকোর্ট বলেছে, আগের তদন্তের রাস্তাতেই চলেছে সিবিআই। রাজ্য সরকার ৯ আগস্ট অভয়ার স্মরণে সব হাসপাতালে নীরবতা পালন করেছে, মুখ্যমন্ত্রী পানিহাটিতে অভয়ার বাড়ির এলকায় গিয়ে তাঁর মা ও বাবার উপস্থিতিতে বলেছেন, রাজ্য সরকার নাকি পুনর্তদন্ত চাইছে! এমনকি জনমতের সামনে মুখ্যমন্ত্রী সিবিআইয়ের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে বাধ্য হয়েছেন পানিহাটিতে দাঁড়িয়ে। তা হলে, তিনি তো তাঁর দলের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে পারতেন– কার নির্দেশে সিবিআই অভয়ার তদন্ত কার্যত না করে বসে রইল? কেন হাইকোর্ট বলার আগে সিবিআই আর জি করেও গেল না? কেন এখনও কাউকে নতুন করে জেরা করল না? এই নিষ্ক্রিয়তার জন্য কি কোনও সিবিআই অফিসারকে নরেন্দ্র মোদি কিংবা অমিত শাহের মন্ত্রক জবাবদিহি করতে বলেছে?

মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, পুনর্তদন্তের কাজে রাজ্য পুলিশের জন্য সিবিআইয়ের থেকে আলাদা কিছু বিষয় নাকি তিনি নিজে খুঁজে খুঁজে বার করেছেন। এ জন্য তিনি গর্ব করে এসেছেন অভয়ার বাবা মায়ের সামনে। কিন্তু প্রশ্ন হল এই বিষয়গুলি মূল তদন্তে তিনি যুক্ত করতে চাইছেন না কেন? এখন তো তাঁদের ডবল ইঞ্জিন সরকার, তা হলে সিবিআইকে এই তথ্যগুলো খতিয়ে দেখতে তিনি বলতে পারছেন না কেন? বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারকে তিনি কি সত্য উদঘাটনে চাপ দিয়েছেন? এমন কথা তো তিনিও বলছেন না! তবে কি সিবিআই কিছু করবে না, এ কথা তিনিও বুঝে গেছেন? অথচ অভয়ার মাকে এমএলএ বানানোর পর বিচারের কিছু প্রতিশ্রুতি না দিতে পারলেই নয়, তাই তদন্তের নামে আবার কিছুটা সময় কাটানো! এটাই কি উদ্দেশ্য? এ দিকে দেখা যাচ্ছে, যে থ্রেট কালচার ও দুর্নীতি অভয়ার খুনের সাথে যুক্ত তা নির্মূল করার চেষ্টা দূরে থাক, মেডিকেল কলেজে দেখা যাচ্ছে প্রভাবশালীদের নির্দেশে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার চক্র বহাল তবিয়তে কাজ করছে। সম্প্রতি বর্ধমান মেডিকেল কলেজে এই চক্র কী ভাবে তৃণমূলের পরিবর্তে বিজেপির হাত ধরে নির্বিঘ্নে চলছে, তাও পরিষ্কার দেখা গেল।

মুখ্যমন্ত্রী ৯ আগস্ট পানিহাটিতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেছেন, মদ ও মাদকের বিস্তারই ধর্ষণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কিন্তু এই সামাজিক ব্যাধি দূর করতে বিজেপি পরিচালিত সরকারগুলির ভূমিকা কী? সম্প্রতি বারুইপুরে দেখা গেছে নাবালিকাকে খুন ও ধর্ষণের সাথে অভিযুক্ত সকলেই এই চক্রে যুক্ত শুধু নয়, তারা প্রায় সকলেই বিজেপির ঘনিষ্ঠ বলেও স্থানীয় মানুষ অভিযোগ করেছেন। যে যুবক গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, তাঁর সম্বন্ধেও এমন অভিযোগ স্থানীয় মানুষ করেছেন।

এ রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার মদ বেচাকেই কোষাগারের প্রধান আয়ের উৎস করে ফেলেছিল, বিজেপি সেই নীতি পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেনি। অন্য রাজ্যে বিজেপি শাসনে মদ এবং মাদকের রমরমা খুবই সাধারণ ঘটনা। গুজরাটে বিজেপি ঘনিষ্ঠ আদানিদের বন্দরে কিছুদিন অন্তরই বিপুল পরিমাণ মাদক ধরা পড়ার সংবাদ শোনা যায়। তারা এর জন্য কী ব্যবস্থা নিয়েছে? এ রাজ্যে বিজেপি সরকার অন্য রাজ্যের বিজেপি থেকে আলাদা হবে এমন ভরসা কোথায়? এই জন্যই সম্ভবত মুখ্যমন্ত্রী বারুইপুরে পুলিশের এনকাউন্টারে হত্যাকেই বাহবা দিয়ে বলেছেন, বিচারে দেরি হয়, আমি পুলিশকে বলেছি যা করার করে দেবেন! পুলিশের কাজ যদি এটাই হয়, কিছুদিন পর সম্ভবত বিচার ব্যবস্থাটা রাখার দরকারও তাঁরা অনুভব করবেন না! বারুইপুরে যেমন ফাঁস হওয়া ভিডিওতে দেখা গেছে যে অভিযুক্ত যুবক অনেক কথা বলে দিচ্ছিলেন, তিনিই এনকাউন্টারে প্রাণ হারালেন, ফলে অনেক সত্যই চাপা পড়ে গেল। তেমন ‘বিচার’ই কি এখন বিজেপি রাজত্বে ঘটতে থাকবে!

অভয়ার ন্যায় বিচারের দাবিতে যে মানুষ বলেছিল, ‘অভয়ার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’– তাঁরা আজও পথ ছাড়েননি। তাঁরা যত দিন বিচারের দাবিতে লড়বেন তত দিন এই দাবিকে একেবারে উপেক্ষা করা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হবে।

মানুষ রাজপথে শুধু অভয়ার বিচার চাইছেন তা নয়, তাঁরা বারুইপুরের নাবালিকাসহ রাজ্যে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের বিচারের দাবিতেও সোচ্চার হয়েছেন। বিচার ছিনিয়ে নিতে গেলে আন্দোলনই একমাত্র ভরসা।