Breaking News

সিপিআই-এমএল লিবারেশনের রাজ্য সম্মেলনে কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য

সিপিআইএমএল(লিবারেশন)-এর ত্রয়োদশ রাজ্য সম্মেলন উপলক্ষে ২০ নভেম্বর নৈহাটির ঐকতান মঞ্চে এক আলোচনা সভায় এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য যে বক্তব্য রাখেন তা সম্পাদিত আকারে প্রকাশ করা হল।

কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, আজকের আলোচ্য বিষয়, ‘বাংলা চায় বামপন্থার পুনর্জাগরণ’। একদিন বামপন্থী আন্দোলনকে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সমর্থন করেছিলেন। এ কথা বেদনার সঙ্গে সকলকেই বলতে হবে যে, বাংলার বামপন্থী আন্দোলন তার গৌরব এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন অনেকখানি হারিয়েছে। আজকের সভায় আপনারা যাঁরা উপস্থিত এবং আমাদের দল সহ বিভিন্ন বামপন্থী দলের নেতৃবৃন্দ সকলকেই এর কারণ গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। ভাবতে হবে, এই ঘটনাটি ঘটতে পারল কেন?

এর কারণ অনুসন্ধান না করে, তার থেকে শিক্ষা না নিয়ে যদি আমরা শুধু বলি যে, ‘আমরা এক হয়ে যাব’ বা ‘আমাদের এক হতে হবে’, তা হলে তা বাস্তবে সম্ভব হবে কি? আমার এই কথায় যদি কেউ আহত হন, মাপ করবেন। ‘পুনর্জাগরণ’ বলতে হচ্ছে কেন? কারণ, কোনও না কোনও ভাবে বা সাময়িক ভাবে তার অনুপস্থিতি খানিকটা হলেও ঘটেছে।

সাথে সাথে এ প্রশ্ন আসছে, বামপন্থার পুনর্জাগরণ বলতে কোন বামপন্থার কথা আমরা বলব। যে বামপন্থা কংগ্রেস শাসনে তাদের নেতা জওহরলাল নেহেরুর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল, কলকাতাকে ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’, ‘মিছিল নগরী’ বলতে বাধ্য হয়েছিল কংগ্রেস নেতৃত্ব, যে বামপন্থী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাংলা সেই বামপন্থার পুনর্জাগরণ চাই তো! গত শতকের পঞ্চাশের দশকে, ষাটের দশকে ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন, যেখানে অসংখ্য মানুষ শহিদ হয়েছিলেন, ১৯৬৬ সালের আন্দোলন– যেখানে আনন্দ হাইত, নুরুল ইসলাম শহিদ হয়েছিলেন– তার গৌরবই তো বামপন্থী আন্দোলনের গৌরব। বাংলার এই আন্দোলন গোটা ভারতকে আন্দোলিত করেছিল। এটা ছিল গণআন্দোলনের তেজোদীপ্ত ধারা। এই আন্দোলন ছিল রক্তস্নাত। আপনারা সকলেই একমত হবেন, কমিউনিস্টদের আদর্শ এবং সুস্পষ্ট বক্তব্য হল, পুঁজিবাদী এই সমাজের মৌলিক অর্থাৎ বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই একদিন শোষণমুক্তি ঘটবে। এটি কেবলমাত্র মার্ক্সের পুঁথিগত তত্ত্বকথা নয়। সমাজ বিজ্ঞানের অনিবার্য বাস্তব। যাই হোক, বাংলার গণআন্দোলনের ধারা, অতীতের এই আন্দোলনের গৌরব আমরা রক্ষা করতে পারিনি। তাই পুনর্জাগরণের প্রশ্ন এবং সেই কারণেই তার গভীর অনুসন্ধান।

দ্বিতীয়ত, এই আন্দোলনের পথে ষাটের দশকের শেষ দিকে বামপন্থীরা যখন পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ক্ষমতায় এল তখন প্রশ্ন এসেছিল, একটা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে সরকারে এলে বামপন্থীদের সরকার পরিচালনার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে। তারা কি অন্যান্য দক্ষিণপন্থী দলগুলির মতোই সরকার পরিচালনা করবে? এসইউসিআই(সি) দলের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় এ প্রসঙ্গে বলেছিল, যুক্তফ্রন্ট সরকারকে নীতি হিসাবে ঘোষণা করতে হবে যে, ন্যায়সঙ্গত গণআন্দোলনে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না। আবারও আপনাদের কাছে আবেদন করব, এ সম্পর্কে মতভেদ থাকতে পারে। তবে নিশ্চয়ই তা কাউকে আঘাত করবার জন্য নয়। প্রসঙ্গত, একটা কথা এখানে পরিষ্কার করে রাখা দরকার যে, বামপন্থীদের কাছে ঐক্য কথাটির সত্যিকারের কোনও মানে নেই যদি তার মধ্যে মতাদর্শগত সংগ্রাম জীবন্ত না থাকে। হয় ‘গলাগলি না হলে গালাগালি’– এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি মার্ক্সবাদীদের কাছে বা বামপন্থীদের কাছে পরিত্যাজ্য। বামপন্থীদের ঐক্যের ধারণা হল, ঐক্য-সংগ্রাম-ঐক্য। আমরা এ দেশের পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একত্রিত হতে চাই, ঐক্য গড়ে তুলতে চাই। যখন আমরা পাঁচটি দল, সাতটি দল বা তার অধিক কয়েকটি দল একত্রিত হচ্ছি, তখন আমরা যেমন একটা লড়াইয়ের জন্য একত্রিত হচ্ছি তেমনই সেই ঐক্যের মধ্যেও মতের কিছু ফারাক তো আছেই। এই ফারাক আছে বলেই প্রতিটি দল আলাদা, তাদের অস্তিত্ব আলাদা। তাই, এই ঐক্যের মধ্যে মতাদর্শগত সংগ্রাম অবশ্যম্ভাবী রূপে চলে এবং সেই সংগ্রামের ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনাও ক্রমাগত উন্নত হয়। এই মতাদর্শগত সংগ্রাম না থাকলে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক চেতনার দিক থেকে এগিয়ে যেতে পারে না। এই রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধির দ্বারা বামপন্থী ঐক্য মজবুত এবং দৃঢ়তর হয়। এই শিক্ষা তো লেনিনের। এ কথা তো মাও সে তুং-ও বারবার বলেছেন। সমস্ত মার্ক্সবাদী দার্শনিক এই মতাদর্শগত সংগ্রামের কথা বলেছেন। আপনারা সকলে এই সব কথা ভাল ভাবেই জানেন।

এ কথা তো অত্যন্ত পরিষ্কার যে, আমরা একত্রিত হতে চাই, লড়তে চাই। এ লড়াই কার বিরুদ্ধে? এ লড়াই এ দেশের পুঁজিপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে। এ দেশের পুঁজিপতি শ্রেণিকে যারা রক্ষা করছে, তাদের বিরুদ্ধে। বামপন্থী আন্দোলনের গৌরবকে যদি সত্যিই জাগরিত করতে চাই, তা হলে বামপন্থী ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে এ-ও মার্ক্সবাদী শিক্ষা যে, তার মধ্যে থাকবে মতাদর্শগত সংগ্রাম। যেমন দেখুন, এই আলোচনা সভায় নানা দলের নেতাদের কথা আপনারা শুনছেন। এখানে একের সাথে অপরের মতের তো কিছু পার্থক্য রয়েছে। তাতে তো কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যে আমরা গণআন্দোলনকে জোরদার করতে চাই। তার গৌরবকে আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। আর একটা ছোট্ট কথা। এখানে যে বলা হয়েছে, বাংলা চায়– আসলে চায় বাংলার বামমনস্ক মানুষ। চায়, আন্দোলনের সংগ্রামী স্মৃতি বিজড়িত গৌরবকে স্মরণ করতে।

তৃতীয়ত, আগেই বলেছি বামপন্থী আন্দোলনের সেই গৌরব দীর্ঘ সরকারি ক্ষমতায় থাকার সময় রক্ষিত হয়নি। সরকারি ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকায় আন্দোলনের গৌরবের ধারা থেকে কিছুটা সরে আসা হয়েছে। বামমনস্ক মানুষের মানসিকতায় তার প্রভাব পড়েছে। তাই, আজ জনসাধারণের কাছে এই ভুলের স্বীকৃতি না দিলে জনসাধারণের আস্থা এবং বিশ্বাস অর্জন করা সম্ভব হবে না। যদি কোথাও ভুল থাকে তা হলে সেই ভুলের স্বীকৃতি দেওয়াটা যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ– আপনারা সকলেই জানেন, এটি লেনিনের একটি অমূল্য শিক্ষা। এই স্বীকৃতি দিতে পারলে তখনই একমাত্র জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া যাবে এবং কার্যকরী বামপন্থী আন্দোলন গড়ে উঠবে। বামপন্থী এই আন্দোলন গড়ে উঠলে সেই আন্দোলনের পথে কখনও নির্বাচনের প্রশ্ন আসতে পারে। কিন্তু বামপন্থার পুনর্জাগরণ ঘটাতে হবে আন্দোলনের ভিত্তিতে, নির্বাচন তার ভিত্তি নয়। সেটাই বাংলার মানুষের চাহিদা। বিশেষ করে বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষ সেটাই চান।

পরিশেষে বলি, আজ মানবসভ্যতার ঘৃণ্যতম শত্রু ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, ফ্যাসিবাদ কী? ফ্যাসিবাদ হচ্ছে চরম সংকটগ্রস্ত পুঁজিপাদী ব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য পুঁজিপতি শ্রেণির হাতে শেষ আশ্রয়। কমরেড শিবদাস ঘোষ দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমস্ত পুঁজিবাদী দেশে ফ্যাসিবাদ সাধারণ বৈশিষ্টে্য পরিণত হয়েছে। পুঁজিপতি শ্রেণি ফ্যাসিবাদ আনে নানা ভাবে, নানা কৌশলে। একটা দলের মাধ্যমে ঘটলেও সেটা শ্রেণির আকাঙক্ষা। ভারতবর্ষে ফ্যাসিবাদের কালো ছায়া ক্রমাগত ঘনীভূত। এ কথা ঠিক। তার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণি যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে, সে কারণে আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার আদর্শে বিশ্বাসী বিজেপি ধর্ম-বর্ণ-জাতপাতকে ভিত্তি করে বিভাজন আনছে। কিন্তু বিজেপির মতো এত নগ্ন ভাবে না আনলেও এ দেশে সবচেয়ে বেশি দিন ধরে পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করছে যারা, তারা কি এ কাজ করেনি? আমরা বামপন্থী নাম পেয়েছি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সি পি আই-এর রাজ্য সম্পাদক কমরেড স্বপন ব্যানার্জী তেভাগা আন্দোলন, তেলেঙ্গানা আন্দোলনের কথা বললেন। স্বাধীনতা পরবর্তী কালে বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী ধারাবাহিকতায় ‘৫৩, ‘৫৯ ও ‘৬৬ সালে কোন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে? কে জরুরি অবস্থা জারি করেছিল? উত্তর তো, কংগ্রেস। দর্শনের প্রশ্ন বাদ দিলে ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল পুঁজির কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের কেন্দ্রীকরণ। একচেটিয়া পুঁজির জন্ম হওয়ার পর তাকে রক্ষা করার হাতিয়ার তো ফ্যাসিবাদ। আমাদের দেশে ১৯৫৮ সালে মহলানবিশ কমিটির রিপোর্টে পুঁজিবাদের কেন্দ্রীকরণের বিষয় উল্লেখ ছিল। আমাদের দেশে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ আজ হঠাৎ দেখা যাচ্ছে তা তো নয়। পুঁজিপতি শ্রেণি ক্রমাগত তাকে জোরদার করছে। পুঁজিপতি শ্রেণি ফ্যাসিবাদকে আনে। বিশেষ কোনও দল আনে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পার্লামেন্টকে বজায় রেখে, কোথাও দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য হল তার শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্য। একচেটিয়া পুঁজি, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজি এগুলি ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি। ফলে বিশেষ কোনও দল নয়, পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে যে দল, ভারতবর্ষের একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করে যে দল সেই ফ্যাসিবাদকে আনে। সেই দলের দ্বারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা কি সম্ভব? বিষয়টি খোলা মনে ভেবে দেখতে অনুরোধ করব। এর জন্য চাই বামপন্থীদের ঐক্য। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী বামপন্থী ঐক্য। পুঁজিপতি শ্রেণি সমস্ত দিক থেকে যে আক্রমণ চালাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নানা বামপন্থী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও এই ধরনের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে মতাদর্শগত সংগ্রামের পথ ধরে আমরা যদি এগিয়ে যেতে পারি, সংগ্রামী বামপন্থার চর্চা করতে পারি তাহলেই সেই গৌরবোজ্জ্বল বামপন্থার পুনর্জাগরণ সম্ভব। সেই ক্ষেত্রে সিপিআই-এমএল (লিবারেশন)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির উদ্যোগ কার্যকরী। ইতিমধ্যে আপনারা এ-ও দেখেছেন, অ্যান্টি ইম্পিরিয়ালিস্ট ফোরাম নামে একটি সংগঠন ধারাবাহিক ভাবে পর পর দু’বার এই সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল এবং সেখানে এখানে উপস্থিত সকল বামপন্থী দলের সঙ্গে আরও কয়েকটি বামপন্থী সংগঠনের নেতারা অংশগ্রহণ করেছিলেন। মতের পার্থক্য কিছু থাকলেও এই উদ্যোগ চলতে থাকুক। নিশ্চয়ই আমরা এগোতে পারব।