Breaking News

বুর্জোয়ারা ইউরোপে আড়াইশো বছরে যা করতে পারেনি, সমাজতন্ত্র রাশিয়ায় দশ সপ্তাহে তা করেছেঃ লেনিন

এ বছর মহান নভেম্বর বিপ্লবের ১০৮তম বার্ষিকী। সেই উপলক্ষে বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকীতে (১৪ অক্টোবর ১৯২১) মহান লেনিন-এর ভাষণের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হল (১৩ ও ১৪ এই দুটি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়)

প্রথম পর্ব

রাশিয়ার বিপ্লবের প্রত্যক্ষ ও আশু লক্ষ্য ছিল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক, অর্থাৎ মধ্যযুগীয় আদর্শ ও চেতনাকে ধ্বংস করা, রীতিনীতিকে ঝেঁটিয়ে সম্পূর্ণ বিদায় করা। মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও তজ্জনিত অবমাননা ও গ্লানি থেকে রাশিয়াকে মুক্ত করা এবং এইসব বাধা যা আমাদের সকল সংস্কৃতি ও প্রগতির পথ আটকে দিয়েছিল, তা অপসারণ করা।

এবং আমরা ন্যায্যতই এ কথা জেনে গর্ববোধ করতে পারি সেই অপসারণের কাজটি আমরা, একশো কুড়ি বছর আগে সংঘটিত মহান ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও বেশি দৃঢ়তায় ও অনেক বেশি দ্রুততা, বলিষ্ঠতা ও সফলতার সাথে করতে পেরেছি এবং জনগণের উপর ফলাফলের দিক থেকে বিচার করলে ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও এই কাজ বেশি ব্যাপক ও গভীরভাবে ফলপ্রসূ হয়েছে।

নৈরাজ্যবাদীরা ও পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা (অর্থাৎ মেনশেভিক ও সোসালিস্ট রেভলিউশনারিরা) বরাবরের মতো আজও, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব (অর্থাৎ সর্বহারা বিপ্লব)-এর মধ্যে সম্পর্ক বিষয়ে অবিশ্বাস্য রকমের বাজে কথা বলে যাচ্ছে। গত চার বছর সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করেছে যে, এই বিষয়ে মার্ক্সবাদী দৃষ্টিকোণ সম্পর্কে আমাদের ব্যাখ্যা এবং পূর্বতন বিপ্লবগুলির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদের মূল্যায়ন কত সঠিক ছিল। আমরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে যে ভাবে সম্পূর্ণ করেছি, তা ইতিপূর্বে আর কেউ করেনি। আমরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে সচেতন, দৃঢ় ও অবিচল ভাবে এগিয়ে যাচ্ছি এ কথা জেনেই যে সমাজতান্ত্রিক ও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে কোনও চিনের প্রাচীর নেই, এবং এ কথাও আমরা জানি (শেষ বিচারে) একমাত্র সংগ্রামই স্থির করবে কত দূর আমরা অগ্রগতি ঘটাতে পারব, এই বিপুল ও মহৎ কাজের কতটা অংশ আমরা করতে পারব, আমাদের বিজয়গুলিকে আমরা কত দূর সংহত করতে সক্ষম হব। সময়ই তা বলবে। তবে এখনই আমরা দেখছি, সমাজের সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে, এই ধ্বংসপ্রাপ্ত, পরিশ্রান্ত ও পশ্চাদপদ দেশের মাপকাঠিতে, একটা বিশাল পরিমাণ কাজ সাঙ্গ করা হয়েছে।

যাই হোক, আমাদের বিপ্লবের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক মর্মবস্তু সম্পর্কে আগে বলে নেওয়া যাক। এর অর্থ কী, তা মার্ক্সবাদীদের অবশ্যই বুঝতে হবে। ব্যাখ্যা করার জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক।

বিপ্লবের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক মর্মবস্তু বলতে বোঝায়, দেশের সামাজিক সম্পর্কগুলির (ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান) মধ্য থেকে মধ্যযুগীয় রীতিনীতি, ভূমিদাস প্রথা, সামন্ততন্ত্রকে বিদায় করা।

১৯১৭ সাল পর্যন্ত রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার অবশেষগুলির প্রধান লক্ষণগুলি কী ছিল? সেগুলি ছিল রাজতন্ত্র, ভূসম্পত্তি, জমির মালিকানা ও জমি ভোগদখল ব্যবস্থা, সমাজে নারীর অধিকার, ধর্ম, জাতিগত উৎপীড়ন। এই যুগসঞ্চিত গ্লানিগুলির যে কোনও একটির কথা ধরুন, দেখবেন, আরও উন্নত রাষ্ট্রগুলি যারা একশো বা একশো পঁচিশ বছর, কি দুশো বা আড়াইশো বছর আগে তাদের দেশে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব করেছিল, (ইংল্যান্ডে হয়েছিল ১৬৪৯ সালে) তারা ওই একটিরও প্রায় অধিকাংশটাই ফেলে রেখেছে, কিছু করেনি। আমাদের ক্ষেত্রে ওই সব যুগসঞ্চিত গ্লানিগুলির যেটার কথাই বলুন, দেখবেন, আমরা তা পুরোপুরি পরিষ্কার করে দিয়েছি। বুর্জোয়া গণতন্ত্রী ও উদারবাদীরা (ক্যাডেটস) এবং পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা (মেনশেভিক ও সোস্যালিস্ট রেভলিউশনারি) তাদের ৮ মাস ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যা করতে পেরেছিল, আমরা অন্তত তার এক হাজার গুণ বেশি কাজ করেছি মাত্র ১০ সপ্তাহে, ১৯১৭-এর ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) থেকে ১৯১৮-র ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে যখন কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, ওই সব কাপুরুষ বাক্যবাগীশরা হাওয়ায় তাদের কাঠের তরোয়াল ঘুরিয়েছে, কিন্তু এমনকি রাজতন্ত্রকেও ধ্বংস করেনি।

আমরা যে ভাবে ওই সব রাজতন্ত্রীয় পাঁক ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছি, ইতিপূর্বে অন্য কেউ তা পারেনি। সোসাল এস্টেট ব্যবস্থার (জমির মালিকানা ও ভোগস্বত্বের একটি বিশেষ রুশীয় ব্যবস্থা) মতো প্রাচীন কাঠামোর এক টুকরো পাথর কিংবা একটা ইটও আমরা ছাড় দিইনি (এমনকি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো সবচেয়ে অগ্রসর দেশগুলিও আজও পর্যন্ত এই ব্যবস্থার অবশেষগুলিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারেনি)। জমির মালিকানা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সামন্ততন্ত্র ও ভূমিদাস প্রথার মধ্য দিয়ে ‘সোসাল এস্টেট সিস্টেম’-এর যে শিকড় সমাজের গভীরে প্রোথিত ছিল, আমরা তার গোড়া পর্যন্ত উপড়ে ফেলেছি। ‘‘কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে’’ (ক্যাডেট, মেনশেভিক ও সোসালিস্ট রেভলিউশনারিদের মধ্যে বিদেশে থাকা বিস্তর মানুষ রয়েছে এমন প্রশ্ন তোলার) যে, মহান অক্টোবর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কার্যকর করা কৃষি-সংস্কারের ‘শেষপর্যন্ত’ পরিণাম কী হবে। এই বিতর্কে সময় নষ্ট করার কোনও ইচ্ছা এই মুহূর্তে আমাদের নেই। কারণ এই বিতর্ক ও তার সঙ্গে আরও বহু অসংখ্য প্রশ্নের মীমাংসা আমরা সংগ্রামের দ্বারা করছি। কিন্তু এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না যে, পেটি বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা যে আট মাস ক্ষমতায় ছিল, তারা জমিদারদের সাথে, ভূমিদাসত্বের ঐতিহ্যের পাহারাদারদের সাথে ‘আপস’ করেছিল, যেখানে আমরা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জমিদারকুল ও তাদের ঐতিহ্যসমূহকে রাশিয়া থেকে পুরোপুরি বিদায় করে দিয়েছি।

ধর্মের কথা অথবা নারীদের অধিকার অস্বীকার করার কথা, অথবা অ-রুশীয় ন্যাশনালিটিগুলির প্রতি উৎপীড়ন ও অসাম্যের কথাই ধরুন। এগুলি সবই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমস্যা। বাক্যবাগীশ পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা এ বিষয়ে আট মাস ধরে কেবল কথাই বলে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে অগ্রসর দেশগুলির কোনও একটিতেও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক আইনে এইসব প্রশ্নগুলির সম্পূর্ণ মীমাংসা করা হয়নি। আমাদের দেশে অক্টোবর বিপ্লবের আইন দ্বারা এগুলির সম্পূর্ণ মীমাংসা করা হয়েছে। আমরা ধর্মের বিরুদ্ধে আন্তরিকভাবে লড়াই করেছি ও করে যাচ্ছি। আমরা সকল অ-রুশ জাতিগুলির জন্য তাদের নিজস্ব প্রজাতন্ত্র অথবা স্বশাসিত অঞ্চল অনুমোদন করেছি। নারীদের অধিকারগুলি বাতিল করার বা নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের কুখ্যাত ব্যবস্থা, যা সামন্ততন্ত্র ও মধ্যযুগীয় রীতিনীতির অরুচিকর অবশেষ, তা টিকে থাকার মতো সমাজভিত্তি ও উপায় রাশিয়ায় আর নেই। অথচ এই কুৎসিত ব্যবস্থাগুলিই এখন অতিলোভী বুর্জোয়া শ্রেণি এবং নির্বোধ ও ভয়ার্ত পেটিবুর্জোয়ারা বিশ্বের অন্যান্য প্রতিটি দেশেই নতুন চেহারায় খাড়া করছে।

এগুলিই হল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মর্মবস্তু। একশো, দেড়শো, দুশো বা আড়াইশো বছর আগের ওই বিপ্লবের (অথবা যদি আমরা একই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে এক একটি দেশের জাতীয় বৈচিত্র্য অনুযায়ী আলাদা আলাদা হিসাবে ধরি, তবে ওই বিপ্লবগুলির) প্রগতিশীল নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁরা মানবজাতিকে মধ্যযুগীয় সুবিধা ভোগের অন্যায় ব্যবস্থা থেকে মুক্ত করবেন, নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করবেন, কোনও না কোনও ধর্মের প্রতি (বা সাধারণভাবে ধর্মীয় ধ্যানধারণা, চার্চ প্রভৃতির প্রতি) রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার অবসান ঘটাবেন। প্রতিশ্রুতি দিলেও ওই নেতারা তা পালন করেননি বা করতে পারেননি। তাঁদের বাধা হয়েছে ‘‘ব্যক্তিসম্পত্তির পবিত্র অধিকার’’-এর প্রতি ‘‘সম্মান’’। কিন্তু বারবার অভিশাপগ্রস্ত মধ্যযুগীয় ব্যবস্থাদির প্রতি, ‘‘ব্যক্তিসম্পত্তির পবিত্র অধিকারে’’-র প্রতি ‘‘সম্মান’’ প্রদর্শনের অভিশাপ আমাদের সর্বহারা বিপ্লবকে ক্লিষ্ট করতে পারেনি। কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যগুলিকে রাশিয়ার জনগণের জন্য সংহত করতে আমাদের আরও পথ পাড়ি দিতে হত এবং আমরা তা দিয়েছিও। আমাদের প্রধান কর্তব্য তথা যথার্থ সর্বহারা বৈপ্লবিক, সমাজতান্ত্রিক কার্যাবলি পূরণ করার পথে, তার (‘বাই প্রোডাক্ট’) উপজাত বিষয় হিসেবেই আমরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমস্যাগুলির সমাধান করেছি। আমরা বরাবর বলেছি, সংস্কার (রিফর্মস) হচ্ছে বিপ্লবী শ্রেণিসংগ্রামেরই একটি ‘বাই প্রোডাক্ট’।

আমরা বলেছিলাম এবং কাজের দ্বারা প্রমাণ করেছি– বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সংস্কারগুলি হচ্ছে সর্বহারা বিপ্লব, অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের একটি বাই-প্রোডাক্ট। কিন্তু কাউটস্কি, হিলফারডিং, মার্টভ, চারনভ, হিলকুইটস, লঙ্গেটস, ম্যাকডোনালডস, তুরাটিস ও অন্যান্যদের মতো ‘‘আড়াই হাত’’ মার্ক্সবাদের বীর প্রতিনিধিরা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও সর্বহারা-সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যকার সম্পর্ক বুঝতে অপারগ ছিলেন। প্রথমটা বিকাশের পথে দ্বিতীয়টায় পরিণত হয়। দ্বিতীয়টা এগোবার পথে অনুষঙ্গের মতো প্রথমটার সমস্যাগুলির সমাধান করে। দ্বিতীয় বিপ্লব প্রথমটাকে কতদূর ছাপিয়ে যেতে পারবে, একমাত্র সংগ্রামই তা নির্ধারণ করে দেবে।

দ্বিতীয় পর্ব

একটি বিপ্লব কীভাবে আর একটি বিপ্লবে বিকশিত হয়, তার পরিষ্কার প্রমাণ বা প্রকাশ হচ্ছে সোভিয়েট ব্যবস্থা। সোভিয়েট ব্যবস্থা শ্রমিক ও কৃষকদের সবচেয়ে বেশি গণতন্ত্র দেয়, আবার একই সাথে তা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সঙ্গে একটা ছেদও ঘটায় এবং একটি নতুন, যুগান্তকারী ধরনের গণতন্তে্রর সূচনা করে, যাকে সর্বহারার গণতন্ত্র বা সর্বহারার একনায়কত্ব বলা হয়। সোভিয়েট ব্যবস্থা গড়তে গিয়ে যে সব দুর্বিপাকে আমরা পড়েছি এবং ভুলত্রুটি করেছি, তা নিয়ে মৃত্যুমুখী বুর্জোয়ারা ও তাদের লেজুড় পেটিবুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা আমাদের যত ইচ্ছে অভিশাপ ও গালাগালি দিক, আমরা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে যেতে পারি না যে, সত্যিই আমরা ভুল করেছি, এখনও অসংখ্য ভুল করছি ও অসংখ্য পরাজয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। বিশ্বের ইতিহাসে এরকম একটি নতুন ও অভূতপূর্ব ধরনের রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলার পথে বিপর্যয় ও ভুলভ্রান্তি এড়ানো অসম্ভব। আমাদের পরাজয় ও ভুলভ্রান্তিগুলি সারিয়ে তোলার জন্য আমরা দৃঢ়তার সাথে কাজ করে যাব। সোভিয়েট ব্যবস্থার নীতিসমূহ বাস্তবে নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে আমরা এখনও বহু যোজন পিছিয়ে আছি, একেও উন্নত করার জন্য আমরা অবিচলভাবে কাজ করে যাব। কিন্তু এ কথা বুঝে গর্বিত হওয়ার অধিকার আমাদের আছে এবং আমরা গর্ববোধও করি এ জন্য যে, একটি সোভিয়েট রাষ্ট্র গঠনের কাজ শুরু করতে পারার সৌভাগ্য আমাদের উপর বর্তেছে। এ কাজের দ্বারাই বিশ্ব ইতিহাসে একটি নতুন যুগের, এক নতুন শ্রেণির দ্বারা শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যুগের উন্মেষ ঘটানো যাবে। এই নতুন শ্রেণি হচ্ছে সেই শ্রেণি যারা প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশেই নিপীড়িত, কিন্তু যারা সর্বত্রই দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলে এক নতুন জীবনের দিকে, বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের দিকে, সর্বহারার একনায়কত্বের দিকে, পুঁজির শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জাঁতাকল থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে।

সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রশ্ন মানে, বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে আধিপত্যকারী ফিনান্স পুঁজির আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্ন। এই নীতি অনিবার্যভাবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্ম দেয়, জাতিগত উৎপীড়নকে চরম করে তোলে এবং মুষ্টিমেয় ‘অগ্রসর’ শক্তিমান রাষ্ট্রগুলির হাতে দুর্বল, পশ্চাদপদ ক্ষুদ্র ন্যাশনালিটিগুলির শ্বাসরুদ্ধ হওয়ার কারণ হয়। ১৯১৪ সাল থেকে এই প্রশ্নটাই সকল দেশের সকল নীতির মূল কথা হয়েছে। কোটি কোটি মানুষের কাছে এ হল জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন। (১৯১৪-১৮ সালের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ও এখনও চলমান ‘ছোটখাটো’ যুদ্ধগুলিতে ১ কোটি মানুষ নিহত হয়েছিল); পরের যে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্য বুর্জোয়ারা প্রস্তুতি নিচ্ছে, যে যুদ্ধের উদ্ভব আমাদের চোখের সামনে পুঁজিবাদ থেকেই ঘটছে, ভবিষ্যতের সেই অনিবার্য যুদ্ধে এবার ২ কোটি মানুষকে বলি দেওয়া হবে কি না, এটাই প্রশ্ন। এই প্রশ্নেও আমাদের অক্টোবর বিপ্লব বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। আমরা স্লোগান তুলেছিলাম ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে গৃহযুদ্ধে রূপান্তরিত করো’। সোসালিস্ট রেভলিউশনারিজ ও মেনশেভিকদের মতো বুর্জোয়াদের দালালরা, ‘সমাজতন্ত্রী’-র পোশাক পরা পেটিয়াবুর্জোয়া ও দুনিয়ার সকল দেশের গণতন্ত্রীরা আমাদের ওই স্লোগানকে উপহাস করেছে। কিন্তু ঐ স্লোগানই সত্য বলে প্রমাণ হয়েছে– যতই অপ্রিয়, সূক্ষ্মতাবর্জিত ও নির্মম হোক, সেটাই যুদ্ধবাজ ও শান্তিবাদীদের অসংখ্য মিথ্যার বিরুদ্ধে একমাত্র সত্য কথা বলে প্রমাণিত হয়েছে, ঐ মিথ্যাগুলির স্বরূপ প্রকাশিত হচ্ছে। ব্রেস্ট শান্তির স্বরূপ উদঘাটিত হচ্ছে। একটি করে দিন যাচ্ছে, আর ব্রেস্ট চুক্তির থেকেও খারাপ যে ভার্সাই চুক্তি, তার চেহারা ক্রমাগত উন্মোচিত হয়েই চলেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ যারা সাম্প্রতিক যুদ্ধের ও আসন্ন ভবিষ্যৎ যুদ্ধের কারণগুলি নিয়ে ভাবছেন, তারা ক্রমাগত বেশি মাত্রায় সেই ভয়ানক ও অলঙ্ঘনীয় সত্যকে পরিষ্কার উপলব্ধি করছেন যে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্যবাদী শান্তি যা অনিবার্যভাবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের জন্ম দেয়, তার থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব। বলশেভিক সংগ্রাম ও বলশেভিক বিপ্লব ব্যতিরেকে ঐ নরক যন্ত্রণা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না।

বুর্জোয়া শ্রেণি ও শান্তিবাদীরা (প্যাসিফিস্টস্), সেনানায়ক ও পেটিবুর্জোয়ারা, পুঁজিপতি ও তাদের দালালরা, ধার্মিক খ্রিস্টবাদীরা এবং দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বীরেরা এই বিপ্লব নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত। যতই তারা অভিশাপ, কুৎসা ও মিথ্যার বন্যা বইয়ে দিক, কোনও কিছুর দ্বারাই এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে গোপন করা যাবে না যে, হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে দাসমালিকদের পারস্পরিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে এই প্রথম জবাব দিয়ে দাসেরা ঘোষণা করেছে– ‘‘লুটের ভাগ নিয়ে দাসমালিকদের পারস্পরিক যুদ্ধকে পরিণত করো সকল জাতির দাসমালিকদের বিরুদ্ধে সকল জাতির দাসদের যুদ্ধে।’’

হাজার হাজার বছরের ইতিহাসে ঐ স্লোগান ভাসাভাসা ও নিরন্তর অপেক্ষার আবর্ত থেকে এই প্রথমবার একটি স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ পেয়েছে; সর্বহারার নেতৃত্বে কোটি কোটি নিপীড়িত জনগণের কার্যকরী সংগ্রামে পরিণতি পেয়েছে; সর্বহারার প্রথম বিজয়ের রূপে দেখা দিয়েছে। এ ছিল যুদ্ধকে বিলোপ করার, বিভিন্ন দেশের ঐক্যবদ্ধ বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সকল দেশের শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার সংগ্রামের বিজয়। পুঁজির গোলাম মজুরি শ্রমিক, চাষি ও শ্রমজীবী জনগণের প্রাণের বিনিময়ে যে বুর্জোয়া শ্রেণি শান্তি ও যুদ্ধ নামক খেলা চালায়, এ হল সেই বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিজয়।

এই প্রথম বিজয় এখনও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন নয় এবং অক্টোবর বিপ্লবের দ্বারা এই বিজয়ের জন্যও মূল্য হিসাবে অবিশ্বাস্য রকম অসুবিধা, কষ্ট ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, পরপর অনেক গুরুতর বিপর্যয় ও আমাদের ভুলভ্রান্তি ঘটেছে।

বিশ্বের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও সর্বাপেক্ষা উন্নত দেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে, একটিমাত্র দেশের পশ্চাদপদ জনগণ, কোনও পরাজয়-বিপর্যয় ও ভুলভ্রান্তি ছাড়াই ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হবে, এ কথা কীভাবেই বা আশা করা যায়! ভুল স্বীকার করতে আমরা ভীত নই এবং কী উপায়ে এইসব ভুল শোধরানো যায়, তা শেখার জন্য আমরা আবেগমুক্ত ভাবে ভুলগুলি বিচার করছি। তৎসত্তে্বও বাস্তব হিসাবে যা থাকছেই, তা হল, বিশ্বের সকল দেশের দাসমালিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিপ্লবের দ্বারা দাসেরা একদিন দাসমালিকদের মধ্যকার পারস্পরিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে ‘‘জবাব দেবে’’ এই মর্মে হাজার হাজার বছর ধরে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এই প্রথম বিশ্বে সম্পূর্ণভাবে পূরিত হয়েছে এবং পূরিত হচ্ছে নানা বাধা-বিপত্তি সত্তে্বও।

আমরা সূচনাটা করেছি। কবে ও ঠিক কোন সময়ে এবং কোন দেশের সর্বহারারা এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। বড় কথা হল, বরফ ভাঙা হয়েছে, পথ খুলে গেছে, পথের নিশানা দেখানো হয়েছে।

সকল দেশের পুঁজিপতি ভদ্রমহোদয়রা, ‘পিতৃভূমি রক্ষার’ নামে ভণ্ডামি আপনারা চালিয়ে যান। আমেরিকানদের পিতৃভূমি রক্ষার বিরুদ্ধে জাপানিদের পিতৃভূমি রক্ষা, আবার জাপানিদের বিরুদ্ধে আমেরিকানদের পিতৃভূমি রক্ষা, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের– এই ভাবে চলুক। আড়াই আন্তর্জাতিকের বীর, পেটিবুর্জোয়া শান্তিবাদী ও সমগ্র বিশ্বের ভোঁতা বুদ্ধির ভদ্রমহোদয়রা, কী উপায়ে নতুন ‘বাসলে ইস্তেহার’ (১৯১২ সালের বাসলে ইস্তাহারকে মডেল করে) জারি করার দ্বারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়া যায়, সেই প্রশ্নকে ‘পাশ কাটিয়ে’ যেতে থাকুন। প্রথম বলশেভিক বিপ্লব এই পৃথিবীর প্রথম ১০ কোটি জনগণকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ও সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের কrা থেকে ছিনিয়ে এনেছে। পরবর্তী বিপ্লবগুলি মানবজাতির বাকি অংশকে এই ধরনের যুদ্ধ ও এই জাতের বিশ্বব্যবস্থা থেকে মুক্ত করবে।

আমাদের সর্বশেষ, কিন্তু সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাপেক্ষা অসুবিধাজনক কাজ– যে কাজ এখনও পর্যন্ত আমরা সবচেয়ে কম করেছি, তা হল অর্থনৈতিক উন্নয়ন – ধ্বংসপ্রাপ্ত সামন্তী কাঠামো ও অর্ধ ধ্বংসপ্রাপ্ত পুঁজিবাদী কাঠামোর স্থানে নতুন সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর অর্থনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার কাজ। এই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে কষ্টসাধ্য কাজটির ক্ষেত্রেই আমরা সর্বাপেক্ষা বেশি বিপর্যয়ে পড়েছি ও ভুল করেছি। কেউ কীভাবেই বা আশা করতে পারে যে, সমগ্র বিশ্বের ক্ষেত্রে একেবারেই নতুন এই কাজ বিপর্যয় ও ভুলভ্রান্তি ছাড়াই শুরু করা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমরা সেটা শুরু করেছি। কাজটা আমরা চালিয়ে যাব। কিন্তু এই মুহূর্তে, আমরা নিউ ইকনমিক পলিসির দ্বারা আমাদের ভুলগুলি শোধরাচ্ছি। ক্ষুদ্র কৃষক-অর্থনীতি বিশিষ্ট একটি দেশে কী ভাবে এই ধরনের ভুল না করে, সমাজতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে তোলার কাজটি চালিয়ে যাওয়া যায়, তা আমরা শিখছি।

অসুবিধা অনেক। কিন্তু বিস্তর বাধা বিপত্তি সামলানোর কাজে আমরা অভ্যস্ত। শাসকরা আমাদের যে, ‘পাথরের মতো কঠিন’ ও ‘নীতিতে দৃঢ়বদ্ধ’ বলে অভিহিত করে, সেটা তো কোনও কারণ ছাড়াই নয়। কিন্তু আমরা, বিপ্লবের ক্ষেত্রে অবশ্যপ্রয়োজনীয় অপর একটি শিল্পকলা, অন্তত বেশ কিছুদূর পর্যন্ত যেটা শিখেছি, তা হচ্ছে নমনীয়তা। পরিবর্তিত বাস্তব পরিস্থিতি যদি দাবি করে তবে সেই অনুযায়ী দ্রুত ও আকস্মিকভাবে কৌশল পাল্টে ফেলতে পারা, লক্ষে্য পৌঁছানোর জন্য আগে যে পথে চলা হচ্ছিল, যদি সেটা একটা বিশেষ মুহূর্তে অসুবিধাজনক বা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তবে তৎক্ষণাৎ অন্য পথ বেছে নিতে পারাটা হচ্ছে নমনীয়তা। জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনার ঢেউয়ে চড়ে আমরা এগিয়েছি। প্রথমে রাজনৈতিক উদ্দীপনা ও পরে সামরিক উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলে ও তার উপর সরাসরি নির্ভর করে আমরা রাজনৈতিক ও সামরিক বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাপন করে আশা করেছিলাম, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জনউদ্দীপনার উপর ভর করেই সম্পন্ন করা যাবে।

আমরা আশা করেছিলাম, বা সম্ভবত এ কথা বলাই অধিকতর সত্য হবে যে আমরা যথেষ্ট বিচার-বিবেচনা না করে ধরেই নিয়েছিলাম, রাশিয়ার মতো ক্ষুদ্র-কৃষক অধ্যুষিত দেশে, সর্বহারা রাষ্টে্রর আদেশের উপর নির্ভর করেই আমরা রাষ্ট্রীয় উৎপাদন সংগঠিত করতে ও উৎপাদিত দ্রব্যের রাষ্ট্রীয় বণ্টন কমিউনিস্ট লাইন অনুযায়ী করতে সক্ষম হব। অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে, আমাদের ভাবনা ভুল ছিল। এখন বোঝা যাচ্ছে যে, অনেকগুলি অন্তর্বর্তী পর্যায় পেরোবার প্রয়োজন ছিল।

কমিউনিজমে উত্তরণের প্রস্তুতি গড়ে তোলার জন্য, বহু বছরের চেষ্টার দ্বারা তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের পর্যায় পার হওয়ার। শুধুমাত্র জনউদ্দীপনার উপর নির্ভর করে হবে না, মহান বিপ্লব যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে, তার সহায়তা অবশ্যই চাই। এর সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থ, ব্যক্তিগত ইনসেনটিভ ও ব্যবসায়িক নীতির সহায়তা নিয়ে এই ক্ষুদ্র-কৃষক অধ্যুষিত দেশে সর্বপ্রথম হাত দিতে হবে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ ও সমাজতন্তে্রর মধ্যে শক্ত সেতুবন্ধন তৈরির কাজে। অন্যথায় আমরা কমিউনিজমে যেতে পারব না, কোটি কোটি জনগণকে কমিউনিজমের মধ্যে আনতে পারব না। এ কথাই অভিজ্ঞতা ও বিপ্লবের বাস্তব গতিধারা আমাদের শিখিয়েছে। এবং আমরা এই তিন-চার বছরে অল্প হলেও শিখেছি কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে (ফ্রন্ট) আকস্মিক পরিবর্তন ঘটাতে হয় (অবশ্যই যদি তার প্রয়োজন দেখা দেয় তবেই)। সেইরকম ভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে আমরা একটি নতুন পরিবর্তন, যথা নিউ ইকনমিক পলিসি প্রয়োগের কাজ উৎসাহ-উদ্দীপনা ও একাগ্রতার সাথে (যদিও এখনও তা যথেষ্ট মাত্রায় ঘটেনি) শুরু করেছি। সর্বহারা রাষ্ট্রকে অবশ্যই একজন সাবধানী, একনিষ্ঠ ও সুকৌশলী ‘‘ব্যবসায়ী’’ হতে হবে, একজন যত্নবান পাইকারি ব্যবসায়ী হতে হবে– অন্যথায় তা কখনই এই ক্ষুদ্র-কৃষক অধ্যুষিত দেশকে আর্থিকভাবে নিজের পায়ের উপর দাঁড় করাতে পারবে না।

বর্তমান অবস্থায়, যখন আমরা পশ্চিমের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির পাশাপাশি অবস্থান করছি, তখন এই পথ ছাড়া কমিউনিজমের দিকে এগোবার অন্য কোনও পথ নেই। কমিউনিজম ও পাইকারি ব্যবসায়ীর মধ্যে দূরত্ব বা ফারাক আসমান-জমিন। কিন্তু এটাই হল একটি অন্যতম দ্বন্দ্ব, যা বাস্তব জীবনে ক্ষুদ্র-কৃষক অর্থনীতি থেকে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রে যাওয়ার পথ করে দেয়। ব্যক্তিগত ইনসেনটিভ উৎপাদন বাড়াবে। আমাদের যে কোনও মূল্যে সর্বাগ্রে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে হবে। পাইকারি বাণিজ্য লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র-কৃষককে অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে দেয়, এটা তাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ইনসেনটিভ হয়ে কাজ করে, এটা তাদের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেয় এবং তাদের নিয়ে যায় পরের ধাপে– যথা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত নানা ধরনের সমিতি বা সংঘের মধ্যে। আমাদের আর্থিক নীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করার কাজ আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করেছি এবং আমাদের ঝুলিতে কিছু সাফল্যও জমা হয়েছে। সাফল্যগুলি অবশ্যই অল্প ও আংশিক, তা হলেও তা সাফল্যই। ‘‘শিখবার’’ এই নতুন ক্ষেত্রে আমরা প্রিপারেটরি শ্রেণির শিক্ষা শেষ করতে চলেছি। অধ্যাবসায়ের সাথে পড়াশুনা চালিয়ে, বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে যাচাই করে, আমাদের শুরু করা কাজের কোনও কিছুকে প্রয়োজনে বারবার বদল করতে ভয় না পেয়ে, আমাদের ভুল-ভ্রান্তিকে শুধরিয়ে এবং সেগুলির তাৎপর্যকে অত্যন্ত যত্নের সাথে বিশ্লেষণ করার মধ্য দিয়ে আমরা উচ্চতর শ্রেণিগুলিতে উত্তীর্ণ হব।

আমরা সমগ্র ‘গতিপথ’ অতিক্রম করব, যদিও যতটা সময়ে ও যত সহজে এই পথ অতিক্রম আমরা করতে চাই, বিশ্ব অর্থনীতি ও বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান অবস্থায়, তার চেয়ে সময়ও হয়তো বেশি লাগবে, কাজটা কঠিনও হবে। মূল্য যাই দিতে হোক, অন্তর্বর্তী পর্যায়ের কষ্ট-অসুবিধা যত তীব্রই হোক– দুর্ভিক্ষ, দুর্বিপাক যা-ই আসুক, আমরা টলব না, আমরা লক্ষ্যে পৌঁছবই।