
প্রজাতন্ত্র দিবসে কলকাতায় নাজিরাবাদে ২৭ জন শ্রমিকের জীবন্ত দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর আগেও দেশ জুড়ে নানা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের অসহায় মৃত্যু ঘটেছে এই বছরেই। ৮ জানুয়ারি কর্ণাটকের বেলাগাভি জেলায় চিনির কারখানায় বয়লার ফেটে মারা যান ৭ জন শ্রমিক। ১৩ জানুয়ারি উত্তরপ্রদেশের বারাউনে প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে বদ্ধ ঘরে উনুন জ্বালিয়ে দম আটকে প্রাণ হারান তিন জন গার্ড। ১৫ জানুয়ারি ঘাটশিলার পাওয়ার প্ল্যান্টে লিফট বিকল হয়ে চিমনি থেকে পড়ে মারা যান ২ জন শ্রমিক।
ভারত জুড়ে প্রতি বছরই শিল্প কারখানায় নানা কারণে দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেই চলেছে। প্রায় ৪০ বছর আগে, ভোপাল ইউনিয়ন কার্বাইড ফ্যাক্টরি থেকে বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের ফলে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়। হাজার হাজার মানুষ চিরতরে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন। তার পরেও এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ২০২০ সালে ভাইজাগে এক শিল্প এলাকায় বিষাক্ত গ্যাস লিক হয়ে আশেপাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। ১২ জনের মৃত্যু হয়, কয়েকশো মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৮-২০২০ সালের মধ্যে রেজিস্টার্ড কারখানাগুলিতে ৩৩০০ শ্রমিক এই ধরনের বিপর্যয়ের কবলে মারা গেছেন, যদিও বাস্তবে সংখ্যাটা আরও বেশি। ২০২৪ সালে ফ্যাক্টরি এলাকায় বিষাক্ত রাসায়নিক নির্গমন, আগুন লাগা, বিস্ফোরণ হওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন বিপর্যয়ে মৃত্যু হয় আনুমানিক ৪০০-র বেশি শ্রমিকের। গত ২০২৫ এ তেলেঙ্গানায় কেমিক্যাল ফ্যাক্টরিতে বিস্ফোরণ, মহারাষ্ট্রের বহু কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। কারখানাগুলোয় বিপজ্জনক সামগ্রী যথাযথ ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে না। অগ্নি-নির্বাপন ব্যবস্থা সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলেও কারখানা চালানোর ছাড়পত্র দিয়ে দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। আর বহু কারখানা চলছে কোনও ছাড়পত্র ছাড়াই। দিল্লি এনসিআর-এর অন্তর্গত শিল্পাঞ্চল যা দিল্লি সহ হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান-এর বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত অসংখ্য অবৈধ কারখানা ও গোডাউনে পরিপূর্ণ, সেখানে বহু দিন ধরেই বারবার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহেই দিল্লির সফদারগঞ্জে এক কারখানায় আগুন লাগে। গুজরাটেও শিল্পাঞ্চলে বারবার এ রকম গুদাম ও লজিস্টিকস হাবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই সব শিল্পপতিদের ঘনিষ্ঠ সরকার। সরকারের প্রশ্রয়ে মুনাফার অতিবৃদ্ধির লক্ষ্য থেকে নিরাপত্তা খাতে ব্যয়কে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছে মালিকশ্রেণি। তামিলনাড়ুতে ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য উৎপাদনকারী সংস্থা স্টেরাইল গ্রুপ সহ বহু সংস্থা দূষণ সৃষ্টিকারী পদার্থ নিয়ন্ত্রণ না করে যথেচ্ছ ভাবে পরিবেশে মিশিয়ে দিচ্ছে মানুষের জীবনের সমূহ ক্ষতির কোনও তোয়াক্কা না করেই।
এক দিকে যেমন শিল্পাঞ্চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, অন্য দিকে শ্রমিকদের জীবনে রয়েছে চাকরির ভয়াবহ অনিশ্চয়তা। স্থায়ীভাবে কর্মী নিয়োগ করলে মালিকের অতি মুনাফার অঙ্ক একটু কমবে– এই কারণে সর্বত্র চলছে চুক্তির ভিত্তিতে নিয়োগ। যেখানে কর্মচারীদের প্রতি নিয়োগকর্তার কোনও দায়বদ্ধতা নেই। চরম বেকারত্বের বাজারে মালিকশ্রেণির চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত অন্যায় শর্ত মেনে নিতে হচ্ছে শ্রমিকদের– সামান্য কিছু উপার্জনের স্বার্থে। মালিক শ্রেণিকে সুবিধা করে দিতে সরকার নিয়ে এসেছে নতুন শ্রম আইন।
ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট, ১৯৪৮ অনুযায়ী কারখানা বা গুদামে অগ্নি নির্বাপন সহ অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ব্যবহৃত প্রত্যেক মেশিন পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত নির্দেশিকা ছিল। সেই নির্দেশিকাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মালিকপক্ষ সর্বোচ্চ মুনাফার স্বার্থে হেঁটেছে। শ্রমিক চরম দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছে। এরপরও শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা, চাকরির নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। ফ্যাক্টরি পরিচালনার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকার বদলে শুধুমাত্র সাধারণ কিছু কথার উল্লেখ করে, উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখলেও মালিকের আইনি নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে সরকার।
কাজেই মুনাফাসর্বস্ব এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সঠিক রাজনীতির ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়া ছাড়া শ্রমিকের আত্মরক্ষার কোনও পথ খোলা নেই।
সৌম্যকান্তি ভট্টাচার্য, কলকাতা