
সুন্দরবন শুধু একটি বন বা জৈব বৈচিত্র্যময় অঞ্চল নয়, এটি প্রায় ৪৫ লক্ষ মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও আর্থিক ভরসাস্থল। কিন্তু সদ্য ঘোষিত কেন্দ্র ও রাজ্য বাজেটে সুন্দরবন-সম্পর্কিত বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় মুনাফাকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও বড় প্রকল্প অগ্রাধিকার পাচ্ছে, অথচ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা প্রশ্নে যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে। ২০২৫-২৬ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বাজেটে বন ও সুন্দরবন বিষয়ক বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ১,০৯১.১১ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬৩১.৫৫ কোটি সুন্দরবন বিষয়ক প্রকল্প ও সংশ্লিষ্ট উন্নয়নে নির্ধারিত। সরকারের ভাতা, অনুদান নির্ভর বিপুল বাজেটের তুলনায় সুন্দরবনের ঝুঁকি-নির্ভর বিশেষ প্রয়োজনের জন্য বরাদ্দের অনুপাত অত্যন্ত সীমিত। প্রশ্ন ওঠে, এটি কি সত্যিই জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের অগ্রাধিকার প্রতিফলিত করে?
অন্য দিকে কেন্দ্রীয় বাজেটে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের মোট বরাদ্দ প্রায় ৩,৪১৩ কোটি টাকা। সমগ্র দেশের পরিবেশ সুরক্ষার এই সীমিত বরাদ্দের ভেতরে সুন্দরবনের মতো অতিসংবেদনশীল অঞ্চলের জন্য পৃথক বৃহৎ প্রকল্পের জায়গা কতটুকু? বাস্তবতা বলছে, উপকূল সুরক্ষা ও বৈজ্ঞানিক বাঁধ নির্মাণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সরাসরি আর্থিক ভূমিকা খুবই সীমিত।
এই আর্থিক বাস্তবতার বিপরীতে সুন্দরবনের অর্থনৈতিক অবদান বিশাল। সরকারি নথি ও ক্ষেত্রসমীক্ষা অনুযায়ী, প্রায় ১০,৫০০-এর বেশি ফিশিং ট্রলার নিয়মিত সমুদ্রে যায়। প্রতিটি ট্রলার গড়ে ২০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করে। অর্থাৎ দিনে প্রায় ২১ লক্ষ লিটার জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের ওপর আবগারি শুল্ক ও ভ্যাট মিলিয়ে প্রতি লিটারে উল্লেখযোগ্য কর আদায় হয়, যা বছরে কয়েকশো কোটি টাকার রাজস্বে পৌঁছায়।
কিন্তু শুধু জ্বালানি নয়, সুন্দরবনের অর্থনীতি থেকে সরকার রাজস্ব পায় নানা পথে। সামুদ্রিক মাছ ও কাঁকড়া রপ্তানিতে জিএসটি ও শুল্ক, বনজ সম্পদ ও মধু সংগ্রহে লাইসেন্স ফি, পর্যটন খাতে প্রবেশমূল্য, লজ, পরিবহণ ও পরিষেবা কর, নৌপরিবহণ ও ফেরিঘাট সংক্রান্ত রাজস্ব, বাজার, পাইকারি বিপণন ও পরিবহন শুল্ক অর্থাৎ সুন্দরবন কেবল ভর্তুকি-নির্ভর অঞ্চল নয়, এটি একটি রাজস্ব উৎপাদক অর্থনৈতিক অঞ্চল। কিন্তু এই রাজস্বের কতটা সুন্দরবনের উপকূল সুরক্ষা, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারে পুনর্বিনিয়োগ হয় তার স্পষ্ট ও স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে নেই।
পরিবেশগত দিক থেকেও সংকট তীব্র। গত দুই দশকে প্রায় ১১০ বর্গ কিলোমিটার ম্যানগ্রোভ বনভূমি হারিয়ে গেছে। সমুদ্রস্তর বছরে গড়ে ৩-৪ মিলিমিটার হারে বাড়ছে। বিশ্বব্যাঙ্ক-সমর্থিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, সুন্দরবনে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতির আর্থিক মূল্য প্রতি বছর প্রায় ১,২৯০ কোটি। অর্থাৎ ক্ষয়ক্ষতির অঙ্কই হাজার কোটির ঘরে।
এই পরিস্থিতিতে টুকরো প্রকল্প বা সাময়িক মেরামতি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বহুবর্ষীয়, বিজ্ঞানসম্মত ও স্বচ্ছ উপকূল সুরক্ষা পরিকল্পনা। কিন্তু বর্তমান বাজেট কাঠামো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বন্দর, করিডর, লজিস্টিক পরিকাঠামোতে বিনিয়োগের তুলনায় মানুষের বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় বরাদ্দ অনেক কম।
এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, এটি নীতিগত প্রশ্ন। যেখানে মুনাফা অগ্রাধিকার পায়, সেখানে প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা পিছিয়ে পড়ে। সুন্দরবনের মানুষ তাই বারবার ঝড়ে ঘর হারায়, নদীভাঙনে জমি হারায়, আর পরে পায় সাময়িক ত্রাণ ভিক্ষা, স্থায়ী সুরক্ষার দাবি অধরা থেকে যায়।
সুন্দরবনের জন্য জরুরি– পৃথক ও বহুবর্ষীয় উপকূল সুরক্ষা তহবিল গঠন, সুন্দরবন থেকে প্রাপ্ত জ্বালানি, মৎস্য ও পর্যটন রাজস্বের নির্দিষ্ট অংশ আইনত পুনর্বিনিয়োগের ব্যবস্থা, বিজ্ঞানসম্মত বাঁধ নির্মাণ ও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারে কেন্দ্র-রাজ্যের যৌথ পরিকল্পনা, মৎস্য ও কৃষিভিত্তিক সরকারি-সমবায় শিল্প গড়ে স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, বাজেট বাস্তবায়নে সামাজিক নিরীক্ষা ও পূর্ণ স্বচ্ছতা। সুন্দরবন অনুদানের পাত্র নয়, অধিকার ও ন্যায্য অংশীদারিত্বের প্রশ্ন। যে অঞ্চল রাজস্ব দেয়, সেই অঞ্চল নিরাপত্তা পাবে, এটাই ন্যায়ের ভিত্তি। মুনাফার বাজেট নয়, মানুষের বাজেট চাই। ত্রাণ নয়, স্থায়ী সুরক্ষা চাই। সুন্দরবন বাঁচলে ভবিষ্যৎ বাঁচবে।
সুজিত পাত্র,
পাথরপ্রতিমা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা