Breaking News

এ যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবে কে

যুগে যুগে দেশে দেশে অন্যায় অত্যাচার ও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবকরাই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই উপমহাদেশের নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাতেও নজির গড়েছে সেই যুবসমাজ। এই মুহূর্তে গোটা ভারতবর্ষের তরুণ সমাজ বুক দিয়ে রুখে দিয়েছে কেন্দ্রের স্বৈরাচারী বিজেপি সরকারের রথের চাকা। নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি নিয়ে শুধু দিল্লির যন্তর মন্তরেই থেমে থাকেনি এই আন্দোলন, ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যে রাজ্যে। ২৪ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরের সেই ঢেউ যেন আছড়ে পড়ল শহর কলকাতার বুকে। শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলামুখী অভিযানে সমবেত হলেন লক্ষাধিক ছাত্র-যুবক, অভিভাবক ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। এ মিছিলের ডাক দিয়েছিল এআইডিএসও, এআইডিওয়াইও সহ অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র-যুব সংগঠন, তবে দল-মত ধর্ম-বর্ণ লিঙ্গ সব পরিচয়ের বাইরে বেরিয়ে এ মিছিল এক অনন্য গণচরিত্র ধারণ করেছিল। মনে করিয়ে দিচ্ছিল সাম্প্রতিক অতীতে আর জি কর আন্দোলন বা একটু পিছিয়ে গিয়ে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততার কথা। স্লোগানে স্লোগানে ব্যক্ত হচ্ছিল তারুণ্যের গর্জন, দেহভঙ্গি যেন বলে যাচ্ছিল এ যৌবন জলতরঙ্গ রোধিবে–সাধ্য কার?

দিল্লির ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে নৃশংস পুলিশি আক্রমণের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে ‘যব যব মোদি ডরতা হ্যায়, পোলিস কো আগে করতা হ্যায়’, ‘হিন্দু মুসলিম করতা হ্যায়’, স্লোগান উঠেছে ‘আজ প্রতি প্রান্তর—যন্তর মন্তর’। আন্দোলনরত ছাত্র যুবকরা কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের জিজ্ঞাসা করেছে ‘টিয়ার গ্যাস আনেননি? জলকামান নেই’? আপাত অর্থে যাদের দৈনন্দিন যাপন দেখলে মনে হয় নিষ্পৃহ, নিশ্চেষ্ট, কোনও কিছুতেই কিছু আসে যায় না, তারাই ঘুরে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড তুলে মোদি সরকারকে জানাচ্ছে ‘আপনারা ভুল প্রজন্মকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন।’ মুঠো করা হাত আকাশে তুলে চিৎকার করে বলেছে ‘লেগেছে লেগেছে রক্তে আগুন লেগেছে—জেগেছে জেগেছে ছাত্র সমাজ জেগেছে’। এ এক অন্য ভারত, অমিত তেজে বলীয়ান। এ দিন কলকাতায় মিছিল জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানার, নানা ধরনের পোস্টারের সাথে সাথে ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভগৎ সিং, মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতাদের ছবি ও উদ্ধৃতি।

শিয়ালদহ স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে মৌলালি অতিক্রম করতেই মিছিলের সময় লেগেছে অন্তত এক ঘণ্টা। স্বাভাবিকভাবেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে উত্তর ও মধ্য কলকাতার বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। এক সাংবাদিক যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করেন দীর্ঘক্ষণ বাসে বসে থাকা কোনও মহিলাকে, একবিন্দু বিরক্তি প্রকাশ না করেই তিনি জানান ‘কষ্ট হচ্ছে, তবে প্রতিবাদ তো জরুরি’। রাস্তার দু’ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে যাঁরা মিছিল দেখছিলেন, মনে হচ্ছিল তাঁরা যেন মিছিলেরই লোক। নবম শ্রেণির কিশোরী স্লোগান দিচ্ছে, ছ’মাসের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে এক মা বলছেন ‘সব বিক্রি হয়ে যাওয়ার মুখে দেশ বাঁচাতে রাস্তায় নেমেছি।’ মিছিল যখন ধর্মতলায় পৌঁছেছে তখন ধর্মতলা চত্বরে আর তিল ধারণের জায়গা নেই। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে কিছু বহিরাগত পুলিশ ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে কটু কথা বলা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে মিছিলের স্বেচ্ছাসেবকেরা তা প্রাণপণ চেষ্টায় আটকে দেন।

দিল্লির যন্তর মন্তরে কিংবা কলকাতার রাজপথে সে দিন যেন সমবেত হয়েছিল এক টুকরো ভারত। তা কি শুধু প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা গ্রহণকারী সংস্থা এনটিএ বাতিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতেই? গত ৯ বছরে ৮৯টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। বিগত সিবিএসই-র দ্বাদশ শ্রেণির ফলাফলের ব্যাপক বিপর্যয় ঘটেছে, শিক্ষাক্ষেত্রে সামগ্রিক ভাবে আজ বেহাল দশা। এগুলি তো আছেই। তার সঙ্গে মিলেছে বেকারত্বের তীব্র যন্ত্রণা, যুব সমাজের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, শিল্প ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, দেশজোড়া নেতা মন্ত্রীদের চুরি দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, নারী নির্যাতন, হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ ইত্যাদির পুঞ্জীভূত ক্রোধ। পশ্চিমবঙ্গে মাত্র দু’মাসের কাছাকাছি নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হয়েছে। এই ক’দিনের মধ্যেই সাধারণ মানুষ মর্মে মর্মে অনুভব করছেন এ সরকারটা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের নয়। এই সরকার এক দিকে যেমন মানুষের রুটি-রুজি বাসস্থানের উপর আক্রমণ নামিয়েছে, অন্য দিকে আইন এনে মানুষের কথা বলার, প্রতিবাদ করার অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদের রাজনীতি জাগিয়ে তুলে মানুষের ঐক্য বিনষ্ট করতে চাইছে। বিরোধিতার যে কোনও স্বরকেই তারা গলা টিপে হত্যা করতে চাইছে। বিজেপির এই রাজনীতিকেই আজ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে তরুণ প্রজন্মের মিছিল।

স্লোগান দিয়েছে ‘আপস না সংগ্রাম—সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘দালালি না রাজপথ—রাজপথ রাজপথ’। ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে এই জনতা। শুধু পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, ঘুণ ধরা এই সামাজিক ব্যবস্থাটাকেও পরিবর্তনের আকাঙক্ষায় ছটফট করছে মানুষ। এটাই শাসকের কাছে ভয়ের বিষয়। দিল্লির যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে রাজ্যে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র-যুব জনতার এই দুর্বার আন্দোলনের চাপে ২৫ জুলাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। গণআন্দোলনের এ এক বিরাট জয়। এ জয় দেখাল অত্যাচারী শাসকের আস্ফালনকে এক সময় যত শক্তিশালীই মনে হোক না কেন, জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সামনে তা নিতান্তই ঠুনকো। এই আন্দোলন আবারও শিক্ষা দিয়ে গেল অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানো জনগণের সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পারে দাবি আদায় করতে। জাগিয়ে দিয়ে গেল আগামীর আশা।