Breaking News

শিল্প স্থাপনে বাধা কোথায়–চর্চা জরুরি

১২ জুন, আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সংবাদ অনুযায়ী, আমেরিকায় বেকার ভাতার আবেদনকারীর সংখ্যা এখন ২ লাখ ২৯ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। খবরটি শুনে কেউ অবাক হতে পারেন, বাস্তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দুনিয়া জুড়ে বেকার ভাতাই এখন শাসকের কাছে যুববিক্ষোভ প্রশমনের অন্যতম প্রকল্প।

আমেরিকা পুঁজিবাদী দুনিয়ার প্রথম অর্থনীতির দেশ। ভারত পঞ্চম। সেই আমেরিকাতে শিল্পের দুর্দশা ক্রমাগত বাড়ছে। নতুন শিল্পায়ন সেই অর্থে হচ্ছে না। যতটুকু হচ্ছে তা প্রযুক্তিপ্রধান, যন্ত্র নির্ভর, তাতে মানুষের কর্মসংস্থান সামান্যই। ফলে আমেরিকা হাবুডুবু খাচ্ছে কর্মসংস্থান নিয়ে। বাড়ছে ছাঁটাই। এ অবস্থাই বেকার ভাতার লাইন দীর্ঘতর করছে।

ভারতের মতো দেশে ভাতা প্রকল্প চালু হলে এক শ্রেণির মানুষ যথার্থই বলেন, সরকার মানুষকে ভিখারি-সম করে তুলছে। মানুষ চাকরি চায়। দু-হাতে কাজ চায়। নিজের শ্রমে মাথা উঁচু করে মর্যাদার সাথে বাঁচতে চায়। রোজগার চায়। সরকারের দয়ার ওপর বাঁচতে চায় না। তারা চায়, সরকার কাজ দিক। কিন্তু সরকার কাজ দেবে কী করে? কোথায় দেবে? ট্রাম্প চাকরি দিতে পারছেন না, মোদি দেবেন চাকরি? চাকরি দিতে, শিল্পায়ন করতে সিপিএম, তৃণমূলের সরকার ব্যর্থ হয়েছে, বিজেপিই বা সফল হবে কোন জাদু মন্তে্র?

সঙ্কটটা আসলে কোথায়? সঙ্কটটা কি কোনও ব্যক্তির ক্ষমতা অক্ষমতার? আদৌ তা নয়। সঙ্কটটা দেশের প্রচলিত অর্থনীতির গভীরে। এখানেই সিংহভাগ মানুষ নজর দিতে চান না। কিন্তু সমস্যাকে ডিটেক্ট করা, তারপর ডিলিট করার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি পাশ কাটিয়ে আর কতদিন?

রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেছেন, শিল্পপতিদের ধরে আনার জন্য যা যা করা দরকার তাই করবেন। কেন ধরে আনতে হবে? শিল্পপতিরা বিনিয়োগে উৎসাহী হন না কেন? কেন তাদের উৎসাহ জাগানো ভাতা দিতে হয় বারবার? আসলে ভাতাটা শিল্পপতিদের অতিরিক্ত মুনাফা। ওরা আগ্রাসী মুনাফা চায়। তাই আগ্রাসী শোষণ চালায় শ্রমিকদের ওপর। সুপার মুনাফা করতে শ্রমিকদের মজুরি কমায়, বেশি সময় ধরে খাটায়। কাঁচামালের দাম কম দেয়। মজুরদের সুরক্ষার পিছনে খরচ করে না। এ সবের সামগ্রিক পরিণামে মজুরের ক্রয়ক্ষমতা কমে। তৈরি হয় বাজার সঙ্কট অর্থাৎ মন্দা। এই মন্দাই বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সর্বোচ্চ মুনাফা করতে শিল্পে যত অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে, এ আই-এর ব্যবহার হচ্ছে, ততই শ্রমিক অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে। জব লেস গ্রোথ কথাটা কয়েক দশক আগেই অলোচনায় এসেছে। এ যুগের উন্নয়ন কর্মসংস্থানহীন উন্নয়ন, একপেশে উন্নয়ন, যেখানে শ্রমিকদের কোনও স্থান নেই। এই বাস্তবতা কে অস্বীকার করতে পারে? আজ শিল্পায়নের সামনে পুঁজিবাদী মুনাফার লক্ষ্যই প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপক মানুষকে যদি কাজ দিতে হয়, তা হলে শিল্পের অবাধ বিকাশ ঘটাতে হবে। আর সেই কারণেই শিল্পকে, উৎপাদন ব্যবস্থাকে মুনাফা-উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত করে সমাজের প্রয়োজনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এটা কি মোদি-মমতা-রাহুল গান্ধীদের দল করতে পারে?

ভারতের অন্য রাজ্যে বিশেষত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে কি শিল্পায়ন হচ্ছে? সব রাজ্যেই নৈরাশ্যজনক চিত্র। মমতা ব্যানার্জীকে বিনা কারণে তেলেভাজা শিল্পের কথা বলতে হয়নি। আশঙ্কা হয় অদূর ভবিষ্যতে হয়তো রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দিয়ে শেষপর্যন্ত ঝালমুড়ি শিল্পের উদ্বোধন করবেন! বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট করে তৃণমূল সরকার রাজকোষের ৬৩৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। তাতে দুর্নীতি কতটুকু হয়েছে, কে কে গ্রেফতার হল– এই প্রচারে হয়তো আরও কিছু দিন যাবে। কিন্তু শিল্প কেন অধরা, কোথায় সঙ্কট, সমাধান কীসে– তার চর্চা জরুরি। ভঙ্গি দিয়ে তো বেশিদিন ভোলানো যায় না। প্রশ্ন উঠছেই।