
বর্তমানে স্মার্ট মিটার সাধারণ মানুষের কাছে একটা আতঙ্ক হিসাবে এসেছে। এখানে কোন স্মার্ট মিটার সম্বন্ধে বলা হচ্ছে? অনেকেই জানেন না, চাকা মিটারের পরে এসেছে ডিজিটাল মিটার। এই ডিজিটাল মিটারও এক ধরনের স্মার্ট মিটার। এর মধ্যে একটা চিপ আছে যেখানে গত ছয় মাসের বিদ্যুতের ব্যবহার রেকর্ড করা থাকে। ডিজিটাল মিটারে ইলেকট্রনিক্স সফটওয়্যার আছে। এই ডিজিটাল মিটার অতি সূক্ষ্ম লিকেজ কারেন্ট, মোবাইল চার্জ করার বা ইন্ডিকেটর লাইটের অতি সূক্ষ্ম পরিমাণ বিদ্যুতের খরচও ধরতে পারে। এখন এই ডিজিটাল মিটারের পরিবর্তে নতুন যে মিটার আনা হচ্ছে সেটা আরও উন্নত প্রযুক্তির স্মার্ট মিটার। পার্থক্য কোথায়? নতুন স্মার্ট মিটার ডেটা ট্রান্সমিশন সিস্টেমে এআই-এর কন্টে্রালে কাজ করে, যা কিনা স্মার্ট ডিজিটাল মিটার পারে না। ডিজিটাল মিটারের স্থায়িত্ব ২০-২৫ বছর এবং গৃহস্থ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের এই মিটারের ভাড়া মাসে ১০ টাকা। অন্য দিকে স্মার্ট মিটারের স্থায়িত্ব ৭-৮ বছর এবং গৃহস্থ গ্রাহককে মাসে দিতে হবে ১০০ টাকা করে। বোঝাই যাচ্ছে, ক্ষতিটা কার হবে। ফলে সাধারণ মানুষ টাকা লুটের এই মিটারিং ব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করছে। এই বিরোধিতাকে দুর্বল করতে ধূর্ত শাসকের নানা স্তরের কর্তারা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে– উন্নত প্রযুক্তির বিরোধিতা প্রগতিবিরোধী। এর জবাবে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংগঠনের নেতা সুব্রত বিশ্বাস বলেন, উন্নত প্রযুক্তির বিরোধিতা নয়, কার স্বার্থে এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে সেটাই সাধারণ মানুষের আসল বিচার্য বিষয়।
বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এর ৪৭ এবং ৫৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, কোম্পানি সঠিক মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেবে, গ্রাহকদের অধিকার আছে, মিটার সঠিক কিনা দেখে নেওয়ার। প্রিপেমেন্ট ব্যবস্থা যদি কেউ চায় তবে তার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি ডিপোজিট লাগবে না। মিটারের পরিবর্তন করতে গ্রাহকের অনুমতি লাগবে। আইনে কোথাও স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক বলা নেই। তীব্র গ্রাহক আন্দোলনের ফলে এ রাজ্যে সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল সরকার ‘স্মার্ট মিটার বন্ধ’ করার ঘোষণা করেছিল। আসামে টাটা পাওয়ার কোম্পানি ঘোষণা করেছে আর নতুন করে স্মার্ট মিটার লাগাবে না। উত্তরপ্রদেশে স্মার্ট মিটারের বিপুল অঙ্কের বিলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে এমনকি বাড়ির মহিলারা পর্যন্ত স্মার্ট মিটার খুলে ভেঙে অফিসে ফেলে দিয়েছেন। সারা দেশের ধারাবাহিক আন্দোলনের চাপে গত ২ এপ্রিল ২০২৬, কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ‘স্মার্ট মিটার বাধ্যতামূলক নয়, কোথাও জোর করে স্মার্ট মিটার লাগানো হবে না।’ এ রাজ্যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত বছর বিরোধী দলনেতা হিসেবে বলেছিলেন ‘আইন ও রেগুলেশন অনুযায়ী স্মার্ট মিটার লাগানো বাধ্যতামূলক নয়, কেউ লাগাতে আসলে ঘাড় ধরে বের করে দেবেন’। তাঁর বক্তব্যের রিল সোসাল মিডিয়ায় ঘুরছে। সেই শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হয়ে স্মার্ট মিটার লাগানোর কৌশল নিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী কলকাতায় এসে বললেন, জুলাই মাস থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্মার্ট মিটার লাগানো হবে। গত ১০ জুন রাজ্যের মুখ্যসচিব পরিসর আরও বাড়িয়ে জানালেন, সরকারি কর্মচারী, আধা সরকারি কর্মচারী, স্কিম ওয়ার্কার, ওয়াটার ক্যারিয়ার, পেনশন হোষ্প্রর সহ সরকারি কোষাগার থেকে যাঁরাই আর্থিক বেতন, অনুদান, পারিশ্রমিক পান তাঁদের প্রত্যেকের বাড়িতে বাধ্যতামূলক স্মার্ট মিটার লাগাতে হবে এই ফতোয়া কি বিদ্যুৎ আইন ২০০৩-এর বিরোধী নয়? তিনি আরও বলেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের রিভ্যাম্পড ডিস্ট্রিবিউশন সেক্টর স্কিম (আর ডি এস এস) অনুযায়ী এই কাজ হবে।
দেশের আইন অনুযায়ী কোনও স্কিম বা প্রকল্প বাধ্যতামূলক হয় না। তাহলে আর ডি এস এস বাধ্যতামূলক হয় কী করে? এই স্কিমে বলা হয়েছে এটা কেন্দ্রীয় সরকারের উপদেশ। বিদ্যুৎ বণ্টন ব্যবস্থায় গতি আনতে এই স্কিম আনা হয়েছে। তা হলে জনগণের প্রশ্ন, কোন উদ্দেশ্য সাধন করতে কার স্বার্থে এত দ্রুততার সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির নাম করে এই স্মার্ট মিটার পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে বাধ্যতামূলকভাবে লাগানোর জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে? স্মার্ট মিটারই লাগাতে হবে– কোন কোম্পানির ব্যবসা বাড়াতে? স্মার্ট মিটার প্রস্তুতকারী কোন কোম্পানির সঙ্গে সরকারের ‘ডিল’ হয়েছে, সরকার তা জনগণের কাছে স্পষ্ট করে বলুক। কার চাপে সরকার এত উদগ্রীব?
দুরাত্মার ছলের অভাব নেই। সরকার একবার বলছে, এটা প্রি-পেইড। আবার সারা দেশে প্রবল গ্রাহক বিক্ষোভ দেখে বলছে এই মিটার পোস্ট-পেইড মোডে থাকবে। তাহলে শত শত কোটি টাকায় যে ডিজিটাল পোস্ট -পেইড মিটার চলছে সেগুলো ফেলে দিয়ে আবার শত শত কোটি টাকায় নতুন স্মার্ট মিটার যা কিনা পোস্ট-পেইড মোডেই চালানো হবে তার প্রয়োজন কোথায়? এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জনগণকেই দিতে হবে! তা হলে ডিজিটাল মিটার বাতিল করা হচ্ছে কেন?
সরকারি বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানিকে বেসরকারি টাটা, গোয়েঙ্কা, আদানি, আম্বানিদের হাতে তুলে দিতে, একটি এলাকায় একাধিক বণ্টন কোম্পানির লাইসেন্স দিতে এই নতুন স্মার্ট মিটার বসানোর তোড়জোড় করছে সরকার। এতে জনশোষণ ছাড়া, জনদুর্ভোগ ছাড়া আর কিছু নেই। স্মার্ট মিটার বেসরকারিকরণে গতিবৃদ্ধি করবে। কারণ বণ্টন কোম্পানি পরিবর্তন করতে একই ট্রান্সফরমার, পোল, তার, মিটারের মাধ্যমে শুধু স্মার্ট মিটারের কোড নম্বরটা বর্তমান কোম্পানি থেকে পরিবর্তিত কোম্পানির ঘরে পাঠাতে হবে। একটা সুপার কম্পিউটারে একজন অপারেটর একটা গ্রুপ সাপ্লাইয়ের ৫০ হাজার গ্রাহকের পরিষেবা গ্রাহকদের মোবাইলের মাধ্যমে দিতে পারবে। ফলে মিটার রিডারদের কাজ থাকবে না, বণ্টন কোম্পানির অফিসেও কর্মচারীদের কাজ থাকবে না। বিপুল সংখ্যক কর্মচারী ছাঁটাই হবে। এই সমস্ত পদ বিলুপ্ত হবে। আগামী দিনে চাকরির সুযোগ আরও কমবে।
গ্রাহকদের আশঙ্কা যে, সকল গ্রাহকদের স্মার্ট মিটার লাগানোর কাজ শেষ হলে মোবাইলে এসএমএস দিয়ে একসাথে সমস্ত মিটার প্রি-পেইড মোডে করে দেওয়া হবে। প্রি-পেইড ব্যবস্থায় গ্রাহকদের অগ্রিম টাকা নিয়ে বেসরকারি বণ্টন কোম্পানি লুটের ব্যবসা করবে এবং নতুন স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে টিওডি (টাইম অব ডে) সিস্টেম, রিয়াল টাইম মনিটরিং সিস্টেম, ডাইনামিক প্রাইসিং (চাহিদা যখন যেমন বাড়বে দামও তখন বাড়বে) সিস্টেম দূর নিয়ন্ত্রণে চালু করা যাবে। এইভাবে গ্রাহকদের টাকা লুট করার ব্যবস্থা দৃঢ়তর হবে, যা আসাম, বিহার, উত্তরপ্রদেশ সহ প্রায় সর্বত্র দেখা যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ আইন ২০০৩ (সংশোধনী) বিল ২০২৫ লোকসভায় পাশ করাতে সব রকম চেষ্টা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। দেশের কৃষক সমাজ দিল্লিতে প্রধান সড়কে এক বছর অবস্থান করে তিনটি কৃষি আইনের সাথে সর্বনাশা বিদ্যুৎ বিল প্রত্যাহার করার দাবিও তুলেছিল। দেশের বিদ্যুৎ শিল্পে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার কর্মচারীরাও এই বিল প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সংগঠন অ্যাবেকা সহ দেশের ১৭টা রাজ্যের বিদ্যুৎ গ্রাহকরাও এই দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই বিল আইনে পরিণত হলে আইনের ক্ষমতায় স্মার্ট মিটার লাগানো হবে। তাই ঘুরপথে তাই আরডিএসএস স্কিমের আড়াল নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার।
আধুনিক সভ্যতার অত্যাবশ্যকীয় বিদ্যুতের ব্যবহার রক্ষা করতে দলমত নির্বিশেষে ‘স্মার্ট মিটার প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করে আন্দোলন তীব্রতর করতে গ্রাহকদের এগিয়ে আসতে হবে। এটা আজ জরুরি প্রয়োজন হিসেবে দেখা দিয়েছে।