
বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সরকারি ক্ষমতায় এলে তারা অন্নপূর্ণা যোজনার মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে দেবে, যেখানে বিগত সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মাধ্যমে দেড় হাজার টাকা করে দিত। ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তারা বলছে– লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সব প্রাপকরা অন্নপূর্ণা যোজনার অন্তর্ভুক্ত হবেন না। কারণ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে মোট প্রাপক সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪২ লক্ষ। ইতিমধ্যেই বর্তমান সরকার ৩০ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। এই যে ৩০ লক্ষের নাম বাদ গেল এবং ভবিষ্যতে আরও নাম বাদ যেতে চলেছে, তার সবই কি দুর্নীতির কারণে? নাকি অন্য কোনও কারণ আছে? দুর্নীতির কারণ হিসাবে বিজেপি যা বলছে, তাতে নাকি পুরুষের অ্যাকাউন্টে মহিলার টাকা চলে যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ শোনা গেছে সত্যি, তবে ইতিমধ্যেই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার নিয়েও এই অভিযোগ উঠছে। এর সহজ সমাধান ছিল, যারা ভুল ভাবে টাকা পেয়েও সরকারকে জানায়নি, তাদের শাস্তি ও টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা, প্রাপক মহিলার নামে নতুন অ্যাকাউন্ট করার জন্য বলা। তা না করে এত ঝাড়াই-বাছাই কেন?
বিজেপি পরিচালিত রাজ্য সরকার অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের জন্য একটি অত্যন্ত জটিল ১২ পৃষ্ঠার ফর্ম ছাপিয়েছে। তাতে পরিবারের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ সহ পরিবারের মোট বাৎসরিক আয় এবং সবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ইন্সিওরেন্সের তথ্য, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড ইত্যাদির উল্লেখ করতে হবে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রাপকের জন্য গোটা পরিবারের তথ্য প্রয়োজন কেন? সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে সমাজের যথার্থ গরিব এবং প্রান্তিক পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা যাবে। কারা সত্যিই গরিব এবং প্রান্তিক, তার কোনও পরিসংখ্যান তা হলে কি সরকারের কাছে নেই! প্রশ্ন জাগছে, একটি সরকারি জনমুখী প্রকল্পের জন্য একজন প্রাপককে তার পরিবারের সমস্ত গোপনীয় ও ব্যক্তিগত তথ্য সরকারকে দেওয়ার জন্য বাধ্য করা যায় কি? ভারতবর্ষের শাসকরা দাবি করেন, এটা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। কিন্তু সরকারের এই আদেশনামা তো চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক!
এই ফর্ম দেখেই সাধারণ গরিব অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মহিলারা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পক্ষে একা একা এই ফর্ম পূরণ করা অত্যন্ত জটিল বিষয়। তাই তাঁদের অন্য কারও সাহায্য নিতে হচ্ছে– কোনও সাইবার কাফে, জেরক্স সেন্টার, পাড়ার কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি অথবা কোনও দালাল, যার জন্য অনেক আর্থিক খেসারত তাঁদের দিতে হচ্ছে। বহু পরিবার আশঙ্কিত যে, এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক তথ্য সরকারের কাছে পৌঁছনোর আগেই অন্য লোকদের জানা হয়ে যাচ্ছে। তা হলে এই তথ্যের নিরাপত্তা থাকবে কি? রাজ্য সরকার কি এর কোনও গ্যারান্টি দিতে পারে? যেভাবে প্রতিদিন সাইবার অপরাধ বাড়ছে, বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে এবং তথ্যের অপব্যবহার হচ্ছে গ্রাহকের অজান্তে, সে ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ মহিলার পরিবারের এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয় তথ্য ও মোবাইল নম্বরের যে অপব্যবহার হবে না, সেটা নিশ্চিত হওয়া যাবে কী ভাবে? ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নোটবন্দির কর্মসূচির সময়ে তাঁরই চালু করা জন-ধন যোজনা অ্যাকাউন্ট যা নাকি গরিব মানুষের জন্য ব্যাঙ্কগুলোতে চালু করা হয়েছিল বলে বহুল প্রচারিত, দেখা গেছে তার অনেকগুলোই ধনী পরিবারের কালো টাকা সাদা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। এ ছাড়াও অসাধু ধনী ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা কালো টাকা পাচার করার জন্য অনেক গরিব মানুষের অ্যাকাউন্ট তাঁদের অজ্ঞাতে ব্যবহার করেন। বিজেপি শাসনে এমন অভিজ্ঞতাও তো আছে! তেমন কোনও ঘটনা ঘটবে না তো?
আর একটি প্রশ্ন হল, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে পরিবারের প্রধান কে এবং তার সাথে আবেদনকারী মহিলার কী সম্পর্ক তা জানতে চাওয়া হয়েছে। এ সমাজে বেশির ভাগ নারীই গৃহস্থালীর কাজে যে শ্রম দিয়ে থাকেন তার কোনও মূল্য পান না। সরকার নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলছে এবং সেই কথা বলে এই ধরনের প্রকল্প আনছে। এই ধরনের প্রকল্প মহিলাদের হাতে সরাসরি অর্থ তুলে দেওয়ার জন্যই। তা হলে ফর্মে পরিবারের প্রধানের নামের প্রয়োজন হচ্ছে কেন?
এখন আসা যাক এই জটিল ফর্ম পূরণের প্রশ্নে জমি সংক্রান্ত বিষয়ে। ধরা যাক একটি গ্রামীণ পরিবারে পাঁচ ভাই পাঁচ বিঘা যৌথ সম্পত্তির মালিক। কিন্তু আলাদা আলাদা দলিল না থাকার জন্য যদি তাঁরা প্রত্যেকে এক বিঘা সম্পত্তি ভোগ করেন বা চাষ করেন, তা হলে তাঁরা কীভাবে সেটা উল্লেখ করবেন? কারণ তাঁদের হাতে তো এক বিঘার আলাদা দলিল নেই। তা হলে ফর্ম পূরণ করতে গেলে একজন মহিলা ভুল তথ্য দিচ্ছেন এই অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। আবার দুই ভাইয়ের যৌথ সম্পত্তি নিয়ে মামলা চললে এক ভাই যদি অন্য ভাইকে দলিল না দেয় তা হলে সেই মহিলার পক্ষে ওই সম্পত্তি দেখানো সম্ভব হবে কী করে? তাদের ফর্ম অপূরিত থেকে যাবে, ফলে তাঁরাও এই যোজনার বাইরে থেকে যাবেন।
কোনও শিশু যদি সরকারি টিকা না নেয় অথবা খারিজি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে তা হলে সেই পরিবারগুলোকে অন্নপূর্ণা যোজনার বাইরে রাখা হবে। এ ঘটনা ঘটে কখন এবং কাদের ক্ষেত্রে? অশিক্ষা ও উপযুক্ত সচেতনতার অভাব যেখানে থাকে, অতি দরিদ্র, প্রান্তিক মানুষের মধ্যেই এমন ঘটনা দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন কী? সহানুভূতির সঙ্গে অতি যত্নে শিক্ষার আলোর মধ্যে তাদের টেনে আনা, কর্মক্ষমদের কাজের সুবন্দোবস্ত করা। তা না করে এই হতদরিদ্র মানুষগুলিকে সরকারি প্রকল্পের বাইরে বের করে দেওয়া কেন? তা হলে কি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে বহু গরিব মুসলিম পরিবারকে অন্নপূর্ণা যোজনার বাইরে রেখে দিতে চাইছে সরকার?
একই ভাবে গরিব প্রান্তিক ও আদিবাসী সমাজের অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত মহিলারা যাঁরা দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিশেষত জঙ্গলমহলে থাকেন তাঁরা এই ফর্মগুলো ঠিকমতো পূরণ করতে পারবেন না। তাঁরাও এই যোজনা থেকে বাদ পড়ে যাবেন।
অসংগঠিত ও পরিযায়ী শ্রমিকরাই বা কী ভাবে তাঁদের বার্ষিক আয়ের তথ্য সঠিকভাবে পরিবেশন করবেন? এঁদের রোজগারের কোনও নিশ্চয়তা নেই, কারণ তাঁদের কাজেরই তো নিশ্চয়তা নেই! ফলে মহিলা পরিযায়ী শ্রমিকরাও সঠিকভাবে ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না। তাঁরাও বাতিল হয়ে যাবেন অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে। ক্ষুদ্র চাষি ও ভূমিহীন খেতমজুরদেরও নিশ্চিত বার্ষিক আয় নেই। তা হলে এঁদের পরিবারের মহিলারাই বা সঠিক তথ্য দিয়ে ফর্ম কী ভাবে পূরণ করবেন? তাই মহিলাদের ক্ষমতায়নের কথা বলে অন্নপূর্ণা যোজনার যে জটিল ফর্ম সরকার তৈরি করেছে, যদি সদিচ্ছা থাকত তা হলে তা অনেক সরল ও সংক্ষিপ্ত করতে পারত। আবার সরকার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে, তথ্য সঠিক না হলে তথ্যদাতাকে শাস্তি দেওয়া হবে। বাস্তবে ফর্ম পূরণের নামে গরিব মহিলাদের বিজেপি সরকার ব্যাপক হয়রানি ও আতঙ্কের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা দরকার। এক দিকে অল্প শিক্ষিত, গরিব কৃষক, আদিবাসী পরিবারের মহিলাদের ফর্ম ভরাতে এত জটিলতা, অন্য দিকে আদানি, আম্বানি, টাটা সহ বিভিন্ন বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থাকে সরকারি কোষাগার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অনায়াসে ছাড় বা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে অতি সহজেই। এদের জন্য সরকারের ‘এক জানালা নীতি’, ঝামেলা কমানোর হিসাব নিকাশের ব্যবস্থা আছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হচ্ছে, বিজেপি সরকার গরিব মানুষের নয়, একচেটিয়া পুঁজিপতি শ্রেণিরই স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে।