
ফ্যাসিবাদ হল প্রতিবিপ্লবের একটি ইতিহাস-নির্ধারিত রূপ, যার মধ্য দিয়ে আগাম পদক্ষেপের দ্বারা পুঁজিবাদ বিপ্লবকে প্রতিহত করতে চায়। এর উদ্দেশ্য, প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মুখে পড়ে সংকটে জর্জরিত ও বিশৃঙ্খলতায় কলঙ্কিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। পরিস্থিতির এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে– যখন প্রচলিত স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সংগঠন, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনযন্ত্র পুঁজিবাদের ক্রমবর্ধমান সংকটকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে যায়, যখন বাজারের কোনও রকম স্থায়িত্ব রক্ষা করা ও সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে, যখন সংকটের ফলে জীবনে অনিশ্চয়তার কঠিন আঘাতে জনসাধারণ বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে থাকে– তখন এই পরিস্থিতিতে বুর্জোয়ারা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের মৌলিক নিয়মকে সবচেয়ে কার্যকরী ভাবে বজায় রাখার জন্য, সংসদীয় গণতন্ত্রের আলখাল্লা পরিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্বকে আড়াল করার যাবতীয় প্রকরণকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এই সব ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ফ্যাসিবাদের মধ্যে কয়েকটি সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্ম দেয়, সেগুলিই তাকে চিনে নিতে সাহায্য করে। সেগুলি হল প্রধানত অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্রের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা সর্বাধিক কেন্দ্রীভূত করা এবং প্রশাসনে চূড়ান্ত ক্ষতিকারক দৃঢ়তা (rigid firmness)। এইগুলি বেশি বেশি করে রাষ্ট্রের স্বার্থের সাথে একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থের একাত্মতা গড়ে তোলে এবং সংস্কৃতির যন্ত্রীকরণ (cultural regimentation) সৃষ্টি করে। এই অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণ, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত করা, প্রশাসনিক কঠোরতা, সংস্কৃতির যন্ত্রীকরণ এবং রাষ্ট্র ও একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থের একাত্মতার চেহারা সব দেশে এক নয়। এটা নির্ভর করে প্রতিটি দেশে তার আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উপর, স্বাভাবিক ভাবেই যা দেশে দেশে ভিন্ন।
এমনকি, বাহ্যিক রূপের ক্ষেত্রেও ফ্যাসিবাদের বাঁধাধরা কোনও প্যাটার্ন বা ধাঁচা নেই। বিভিন্ন দেশের অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তা বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। কোথাও সে ব্যক্তি একনায়কত্বের রূপ নিয়েছে, কোথাও মিলিটারি শক্তির স্বৈরাচারী শাসনের রূপ পরিগ্রহ করেছে। আবার অন্য কোনও কোনও দেশে সংসদকে টিকিয়ে রেখে, সাথে সাথে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের সাহায্যে তার ক্ষমতাকে সীমিত করে, ফ্যাসিবাদ একটা গণতান্ত্রিক মুখোশ ধারণ করে। দ্বিদলীয় পরিষদীয় ব্যবস্থার সরকার গড়ার মাধ্যমে ‘গণতান্ত্রিক’ রূপে ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান ঘটানো নিশ্চিত ভাবে যুদ্ধপরবর্তী একটি সামাজিক ঘটনা– ইতিহাসে যার কোনও নজির নেই। আপাতদৃষ্টিতে এর গণতান্ত্রিক আবরণ থাকায় একই সাথে এটি চরম প্রতারণাপূর্ণ। এবং বাস্তবে এটা বহু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী যাঁরা ফ্যাসিবাদকে, পূর্বের অনুচ্ছেদে আলোচিত তার মূল চরিত্র বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে বিচার না করে এর বাহ্যিক রূপ দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করেন– তাঁদের প্রতারিত বা বিভ্রান্ত করেছে।
(– সময়ের আহ্বান)