
বিধানসভা ভোট যত এগিয়ে আসছে, সভায় সভায় বিজেপি নেতাদের ভাষণে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিষ ততই তীব্র হচ্ছে। সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে যে রাজ্যে, সেই পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানোই এ বার তাঁদের মূল অস্ত্র। ক্ষমতা দখলের উদগ্র লোভ এমন ভাবে তাঁদের চেতনা ছেয়ে রয়েছে যে, সেই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে গিয়ে মাঝে মাঝেই বিস্ময়কর ভাবে তাঁরা নানা অদ্ভুত মন্তব্য করে চলেছেন।
যেমন, মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে ১১ এপ্রিল নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন– ‘বাঙালিদের সংখ্যালঘু হতে দেব না’। হিন্দু-মুসলিম বিভেদের এই রাজনেতিক আবহে নরেন্দ্র মোদি ‘বাঙালি’ বলতে আসলে যে হিন্দুদেরই বোঝাতে চেয়েছেন, তা বুঝিয়ে বলার দরকার পড়ে না। প্রশ্ন হল, দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিজেপির অন্যতম সর্বভারতীয় নেতার এ কথাটুকুও কি জানা নেই যে, এই রাজ্যে বসবাসকারী প্রায় আড়াই কোটি মুসলমান ধর্মের মানুষের ৯০ শতাংশই ‘বাঙালি’ এবং তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা? তিনি কি জানেন না, বাংলা ভাষায় কথা বলেন না রাজ্যের মাত্র ১০ শতাংশ মুসলিম? এবং তাঁরাও কেউ ‘অনুপ্রবেশকারী’ নন। উর্দু বা হিন্দিভাষী এইসব মানুষ মূলত উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে রুটি-রুজির প্রয়োজনে পশ্চিমবঙ্গে এসে বাসা বেঁধেছেন। আরও বিস্ময়কর, ‘বাঙালি’ নামক বৃহৎ বিভাগটি থেকে মুসলিম ধর্মের বাংলাভাষীদের মোদিজি অবলীলায় উপড়ে ফেলে দিতে চাইলেন খোদ মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুরে বসে! অথচ এই জেলার মোট জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশই মুসলমান এবং তাঁদের মাতৃভাষা বাংলা! কে জানে প্রধানমন্ত্রীকে দেখতে, তাঁর কথা শুনতে এমন কত শত বাঙালি মুসলমান সে দিনের সভাতেও হয়তো উপস্থিত ছিলেন! এই মন্তব্য শুধু তাঁদের মর্যাদাবোধে আঘাত করেছে তাই নয়, গোটা দেশের মানুষই প্রধানমন্ত্রীর এ হেন অজ্ঞতায় বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। এ হলে তো নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের মতো মহান ব্যক্তিত্বদেরও বাঙালি বলা চলে না! তাঁদের মনে এ প্রশ্নও মাথা চাড়া দিচ্ছে– তবে কি নরেন্দ্র মোদি জেনে বুঝেই ‘বাঙালি’ জাতিগোষ্ঠী থেকে চতুর কৌশলে মুসলমান ধর্মের মানুষদের বাদ দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন? তাই যদি হয়, তা হলে বলতেই হয় যে, বিজেপির সাম্প্রদায়িক বিভেদের রাজনীতি, ইতিহাস বিকৃতি ও নোংরামি আগেকার সমস্ত সীমা এ বার ছাড়িয়ে গেল এবং তার রাস্তা দেখাচ্ছেন স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি।
বাস্তবিকই, ভোটের লোভে বিভেদের বিষাক্ত রাজনীতির চর্চা করতে করতে অসত্যভাষণ আজ যেন বিজেপি নেতাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। জঙ্গিপুরের সভায় হিন্দুদের সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাতাসে ভাসিয়ে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। অথচ সত্য হল, মুসলমান ধর্মের মানুষরা পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকও নন। খোদ সরকারি তথ্য বলছে, এ রাজ্যের জনসংখ্যার মাত্র ২৯ শতাংশ মুসলমান। শুধু তাই নয়, সারা ভারতে অন্য ধর্মের মানুষের মতোই মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে, যে কথার উল্লেখ ভুলেও বিজেপি নেতারা করেন না। সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০০১ সালে ২৯.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০১১ সালে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ২৪.৬ শতাংশে। তা হলে কিসের ভিত্তিতে এমন কথা বললেন মোদিজি? মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের ‘জঙ্গি’ কিংবা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তাদের বাড়বাড়ন্তের চূড়ান্ত মিথ্যা তথ্য প্রচার করে একটি রাজ্যের হিন্দু ধর্মের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো এবং তাঁদের ত্রাতা সেজে নিজেদের ভোটবা’ ভরানো– শুধু এই লক্ষ্যে চূড়ান্ত দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো এমন আচরণ দেশের প্রধানমন্ত্রীকে মানায় কি?
মোদিজির সুরে সুর মিলিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ওই দিনই পুরুলিয়ার এক সভায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন– ‘‘বাংলায় ইউসিসি (অভিন্ন দেওয়ানি বিধি) চালু হবে। … আইন সবার জন্য সমান হবে। … চার বিয়েতে এমনিতেই নিষেধাজ্ঞা হয়ে যাবে’’ ইত্যাদি ইত্যাদি। স্পষ্ট যে, মোদির মতো তাঁর বক্তব্যের অভিমুখও সেই মুসলমান সমাজ এবং তাঁর যত মাথাব্যথা মুসলমানদের একাধিক বিবাহ নিয়েই। এ ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদির মতোই অমিত শাহও কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ গোপন করে অবাধে অসত্য ভাষণ দিলেন। দেশের গুরুত্বপূর্ণ একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কি জানা নেই, আজকের দিনে হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজেই একাধিক বিবাহ নেহাতই ব্যতিক্রমী ঘটনা? খোদ সরকারি তথ্যই তো সে কথাই বলছে! জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (এনএফএইচএস) ২০১৯-’২১-এর রিপোর্টই দেখাচ্ছে, দেশের মুসলমান জনসংখ্যার মাত্র ২.৮ শতাংশের একাধিক স্ত্রী রয়েছেন। হিন্দুদের মধ্যে একাধিক বিবাহে আবদ্ধ ১.৬ শতাংশ। এ সব জানা সত্তে্বও স্রেফ ভোটের লোভে ভারতের একটি বিশেষ ধর্মের বৈধ নাগরিকদের নিয়ে এ ভাবে মিথ্যাচার করতে পারলেন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী! দেশের মানুষের গভীর ভাবে ভেবে দেখা দরকার, সমাজে এ ভাবে বিভেদের বিষ ছড়ানো এই সব মন্ত্রীদের দেশ পরিচালনার যোগ্যতা এক কানাকড়িও রয়েছে কি না।
আসলে কেন্দ্রে এক দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে এবং রাজ্যে রাজ্যে তাঁদের শাসনে বিজেপি সরকার মানুষের কল্যাণে এমন কিছুই করতে পারেনি যেটা দেখিয়ে নেতারা মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারেন। তা ছাড়া বছরের পর বছর ধরে অসত্য ভাষণ ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে প্রতারিত দেশের মানুষের কাছে তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা যে হারিয়ে গেছে, তা টের পেয়েছেন বিজেপি নেতারা। তাই ভোটে জিততে মরিয়া হয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করে ভোটবাক্সে তার ফয়দা তোলার চেষ্টা করে চলেছেন তাঁরা। নেতারা তাই সত্য-মিথ্যার বাছবিচারটুকুও ত্যাগ করেছেন।
আজ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, অশিক্ষা, চিকিৎসাহীনতা, দুর্নীতিতে জেরবার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে রাজ্যের সমস্ত মানুষ। রাজ্যের অপদার্থ তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মতোই জনজীবনের এইসব মূল সমস্যা সমাধানে সামান্য সচেষ্ট হতে দেখা যায়নি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন বিধানসভা ভোটে রাজ্যের মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে তাঁরা বিজেপি নেতাদের এই মিথ্যার ফাঁদে পড়ে প্রতারিত না হন।