
‘আমরা স্বৈরতন্ত্র চাই না, রাজা চাই না, গণতন্ত্র চাই।’ ‘ট্রাম্প নয়, আমরা জনগণই শেষ কথা বলব।’ এমনই নানা স্লোগানের গর্জন উঠল ২৯ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লস অ্যাঞ্জেলেস, টেক্সাস, বস্টন, ফিলাডেলফিয়া, মিনিয়াপোলিস, ডালাস, শিকাগো, পোর্টল্যান্ড সহ ৫০টি শহরে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ক্ষোভের বারুদ ফেটে পড়ল সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, যুদ্ধনীতি এবং চড়া মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে। দাবি উঠল, প্রেসিডেন্ট আর তাঁর ঘনিষ্ঠ ধনকুবেরদের কোনও জায়গা নেই দেশে।
পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ‘নো কিংস’ আন্দোলন নামে খ্যাত এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভের ঢেউ তৃতীয় বার আমেরিকার বুকে নাড়া দিয়ে গেল। এর আগে বার দুয়েক এ রকম স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দেখা গেলেও ট্রাম্প সরকারের বিরুদ্ধে এত মানুষকে পথে নামতে দেখা যায়নি। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ আক্রমণে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে মার্কিন নাগরিকদের অনেকেরই। অবিলম্বে ইরান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন তারা। সংখ্যায় যে তারা কম নয়, বিক্ষোভকারীদের সংখ্যাই তার প্রমাণ।
এক দিকে আমেরিকার অর্থনীতির হাল ভাল নয়। ২০২৫-এর অক্টোবরের তথ্য বলছে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট খুবই মারাত্মক। ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ১০ লক্ষ পরিবার তাদের ঘর হারিয়েছে। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে ৯২ হাজার ছাঁটাই হয়েছে। বেকারি বেড়েছে অন্তত ৪.৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬-এ শিক্ষাক্ষেত্রে বহুমুখী সংকট চলছে। সরকারি স্কুল ও কলেজ-শিক্ষার বেহাল অবস্থা। ২০২৩-২৪-এর তথ্যে প্রকাশ, ৪৫ শতাংশ সরকারি স্কুল কম সংখ্যক শিক্ষক নিয়ে চালাতে হচ্ছে। পরিণামে ছাত্র ভর্তি কমছে এবং সাক্ষরতার হার কমছে। স্বাস্থ্যপরিষেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বললেই চলে। স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যয়বহুল ও বিমানির্ভর হওয়ায় যাদের পয়সা নেই, তারা চিকিৎসা করাতে পারছে না। এই চেনা ছবিটা অনেকটা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী দেশ ভারতেরই মতো।
ভয়াবহ মন্দার মতো অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে যুদ্ধ-অর্থনীতির রাস্তা নিয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এ দিকে ট্রাম্প সহ তার ধনকুবের দোসরদের নামে যৌন কেলেঙ্কারি ‘এপস্টিন ফাইলে’ প্রকাশ হয়েছে। এ সবের বিরুদ্ধে মানুষের বিক্ষোভ দমন করতে একের পর এক অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। আন্দোলন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের জেলে পর্যন্ত দিচ্ছে তারা। অভিবাসী ধরার নাম করে নানা প্রদেশে ট্রাম্প প্রশাসনের ভয়াবহ অত্যাচারের বিরুদ্ধে বারবার বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে মানুষ।
বন্ধু ইজরায়েলের সহযোগিতায় ইরান আক্রমণ, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, কিউবায় অর্থনৈতিক অবরোধ ও দখলের হুমকি ইত্যাদির পেছনে আসল মতলব যে বিশ্বে আমেরিকার ধনকুবেরদের জন্য বাজার নিশ্চিত করা ও দেশের অস্ত্র ব্যবসাকে আরও চাঙ্গা করে মালিকদের মুনাফা বাড়ানোর পথ সুগম করা, যাতে বড় অংশের ভেট শাসকের তহবিলে ঢুকতে পারে, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট।
প্রেসিডেন্টের অভিসন্ধি বুঝতে পেরে মার্কিন নাগরিকরা আবারও বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার শাসকদের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন লন্ডন, লিসবন, রোমের মতো ইউরোপের নানা শহরের হাজার হাজার মেহনতি জনতা। মার্কিন জনগণ বলছেন, আমরা স্বৈরতন্তে্রর হাতে দেশকে ছেড়ে দেব না। আমরা জনগণ আমাদের দেশ চালাব। আমেরিকায় লক্ষ কণ্ঠের প্রতিবাদ মনে করিয়ে দিচ্ছে এই ঐতিহাসিক সত্যকে– ‘শাসকরা শেষ কথা বলে না, শেষ কথা বলে জনগণই।’
(তথ্যঃ ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ. প্রোজেক্ট সিন্ডিকেট.কম, ডব্লিউ ডব্লিউ ডব্লিউ.মিয়ামি স্টুডেন্ট.নেট, ফরচুন.কম)