Breaking News

২৪ জানুয়ারি ব্যাঙ্গালোর জনগণের পার্লামেন্টে গৃহীত হবে জনগণের শিক্ষানীতি

জনগণের পার্লামেন্ট সফল করার আহ্বান নিয়ে ১৩ জানুয়ারি কলকাতারর সর্বত্র পথসভা হয়। ছবিতে শিয়ালদহ

কোনও একটি দেশে শিক্ষানীতি কেমন হবে, তা সেই দেশের জাতীয় জীবনের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ গ্রহণ করার জন্য ভারতের পার্লামেন্টে কোনও আলোচনা হয়নি। সংসদীয় রীতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের সঙ্গে কোথাও কোনও রকম আলোচনা না করে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সেই শিক্ষানীতি গ্রহণ ও চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

মন্ত্রীসভার যে সদস্যরা এই শিক্ষানীতি ঘোষণা করলেন, তাঁরা কারা? তাঁদের শিক্ষাগত পরিচয় একটু জানা দরকার। এই শিক্ষানীতির খসড়া প্রণয়নকালে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন রমেশ পোখরিয়াল নিশঙ্ক। তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে গর্বের সঙ্গে উচ্চস্বরে বলেছিলেন, ‘জ্যোতিষশাস্ত্রের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান তো শিশু’। এটা হল তাঁর আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা। তাঁরই জুনিয়ার মন্ত্রী শিক্ষামন্ত্রকের তৎকালীন রাষ্ট্রমন্ত্রী সত্যপাল সিং বলেছিলেন, ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব ভুল। প্রমাণ হিসেবে বললেন, ‘কেউ কি কখনও কোনও বানরকে লেজ খসিয়ে মানুষ হতে দেখেছে’?মোক্ষম যুক্তিই বটে! সেই মন্ত্রীসভারই আরেকজন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি। তাঁর নিজের শিক্ষাগত ডিগ্রি নিয়েই বিতর্ক ছিল। আর এই মন্ত্রীসভার যিনি প্রধান, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি তো জ্ঞানের বহরে তাঁর সহ-মন্ত্রীদের সকলকে ছাড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ভারতে বহু প্রাচীনকালেই প্লাস্টিক সার্জারি ছিল। প্রমাণ হিসেবে বলেছেন, যদি তা না-ই থাকত তাহলে গণেশের ঘাড়ে হাতির মাথা জুড়ল কী করে? ইন্টারনেট না থাকা অবস্থায় তাঁর ই-মেল করা, বা মেঘলা আকাশে রাডারে বিমানের অবস্থান ধরতে না পারার বিদ্যা সম্পর্কেও সেনাবাহিনীকে তাঁর উপদেশ সম্পর্কে দেশবাসী অবগত। শিক্ষাক্ষেত্রের বিজ্ঞান ও জ্ঞানের এই বহর নিয়েই আধুনিক ভারতের শিক্ষানীতি তারা ঘোষণা করলেন।

তবে শিক্ষার বিষয়বস্তু নিয়ে তাদের জ্ঞানের গভীরতা যাই থাক, অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানের কমতি তাঁদের নেই। কর্পোরেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কী করে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার বেসরকারিকরণ করা যায়, কীভাবে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার যতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তাকে ধ্বংস করা যায়, কীভাবে ছাত্রছাত্রীদের মনন থেকে বিজ্ঞানমনস্কতা মুছে ফেলা যায়, কীভাবে শিক্ষা পরিচালনায় চূড়ান্ত কেন্দ্রীয় আধিপত্য কায়েম করা যায় এবং এইসব করতে গিয়ে কীভাবে বেপরোয়া স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিতে হবে, তার নিদান শিক্ষানীতির ছত্রে ছত্রে রয়েছে।

যুক্তিবাদী মন নিয়ে উপরোক্ত বিষয়গুলি সম্পর্কে আলোচনা করলেই এই শিক্ষানীতির ভয়ঙ্কর রূপ ও দগদগে ঘা ধরা পড়ে। সেই ‘দগদগে ঘা ঢাকতে গিলে করা পাঞ্জাবিক্স পরার মতো শিক্ষানীতির কিছু ছত্রে ‘ভালো কথা’র আবরণ দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষানীতি চালুর পর গত সাড়ে পাঁচ বছরে সেই আবরণ ছিঁড়ে তার সর্বনাশা রূপ আজ সর্বসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। পৌরাণিক কল্পিত কাহিনীকে ইতিহাসের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা এবং আরএসএস-এর মুসলিম বিদ্বেষকে স্থান দিতে গিয়ে মুঘল শাসনকে ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের নামে বিভিন্ন বিষয়ে শুধু প্রাচীন ভারতের কল্পিত কাহিনীই ঢোকানো হচ্ছে না, বর্তমানেও তাদের বিকৃত ধারণাকেও ঢোকানো হচ্ছে। কুসংস্কারগ্রস্ত ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে না বলে এনসিইআরটি-র স্কুলের সিলেবাস থেকে জীববিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ডারউইনের তত্ত্ব বাদ দেওয়া হয়েছে। অঙ্কশাস্ত্রের সিলেবাসও ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম ও বৈদিক ম্যাথমেটিক্স-এর নামে এমনভাবে বিকৃত করা হচ্ছে যে, দেশের সেরা অঙ্কশাস্ত্রবিদরা আতঙ্কিত হয়ে সম্মিলিতভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শিক্ষানীতিতে মুখে মাতৃভাষার প্রীতির কথা বলে বাস্তবে মাতৃভাষা এবং ইংরেজি উভয় ভাষারই গুরুত্ব হ্রাস করে জ্ঞান বিকাশের পথকে রুদ্ধ করা হচ্ছে। এই নীতি অনুযায়ী শিক্ষা বাজেটে ব্যাপক কাটছাঁট করা হচ্ছে। সেই কারণে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি চরম আর্থিক সংকটে ভুগছে। ফলস্বরূপ শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ, সরকারি শিক্ষার পরিকাঠামোর দৈন্যদশা অত্যন্ত প্রকট। আর শিক্ষাব্যবস্থার এই ভগ্নদশার ফলে একেবারে প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত সর্বত্রই আজ বেসরকারি শিক্ষার রমরমা চলছে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে অভিভাবকদের উপর চাপছে সন্তানদের পড়ানোর জন্য উচ্চহারে ফি যোগানোর দায়। অবশ্য দেশের চিন্তাশীল মানুষের কাছে জাতীয় শিক্ষানীতির সর্বনাশা রূপ তার খসড়া অবস্থাতেই ধরা পড়েছিল। অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটি সেই খসড়ায় উল্লেখিত সর্বনাশা দিকগুলি তুলে ধরে এই শিক্ষানীতিকে ‘শিক্ষার মর্মবস্তু ধ্বংসকারী, শিক্ষার ব্যবসায়ীকরণ, বেসরকারিকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণের দলিল’ হিসাবে অভিহিত করে এই শিক্ষানীতি বাতিল করার দাবি জানিয়েছিল।

গত সাড়ে পাঁচ বছর ধরে এই সর্বনাশা নীতির বিরুদ্ধে দেশের সর্বত্র সেমিনার, কনভেনশন, আলোচনা, বিতর্ক, ধরনা, মিছিল, সমাবেশ প্রভৃতির মাধ্যমে সেভ এডুকেশন কমিটি দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তুলেছে। এই আন্দোলনে হাজার হাজার শিক্ষক অভিভাবক ছাত্র ও শিক্ষাবিদ-বুদ্ধিজীবীরা একত্রিত হয়েছেন। তাঁদের সম্মিলিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জনগণের শিক্ষানীতি’ নামক একটি খসড়া, যা বৈজ্ঞানিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার রক্ষার জন্য একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। এই শিক্ষানীতিতে দাবি করা হয়েছে (১) শিক্ষা প্রদানের প্রধান দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে, (২) কেন্দ্রীয় বাজেটে ১০ শতাংশ ও রাজ্য বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করতে হবে, (৩) শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ সাম্প্রদায়িকীকরণ ও বৈষম্যকরণ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে, (৪) মাতৃভাষা ও ইংরেজি সারা দেশে এই দ্বি-ভাষা নীতি চালু করতে হবে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের আকাঙিক্ষত বিষয়বস্তু ও পরিচালন ব্যবস্থা সম্পর্কেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব জনগণের শিক্ষানীতির খসড়ায় রয়েছে।

সরকারের জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ যেভাবে জনগণের মতামত ছাড়াই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, জনগণের শিক্ষানীতি তেমন নয়। জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই তা তৈরি করা হয়েছে এবং গত ২২ মে ২০২৫, রাজা রামমোহন রায়ের জন্মদিনে সারা ভারতের ১৮টি রাজ্যের ২২টি শহর থেকে একই দিনে প্রকাশ করা হয়েছে। সেই খসড়ার উপর সর্বস্তরের জনগণের মতামত পাঠাতে আহ্বান জানানো হয়েছে। ভারতের বিশালতা ও বিশেষ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে সেই শিক্ষানীতি ভারতের ১২টি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে, যাতে ইংরেজি ভাষা অনুধাবন করতে না পারা মানুষও এই শিক্ষানীতির উপর মতামত দিতে পারেন।

জনগণের মতামত সংগ্রহের জন্য রাজ্যে রাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এলাকায় এলাকায়, জেলায় জেলায় সংগঠিত হয়েছে ছোট বড় মত-বিনিময় সভা। সব মিলিয়ে অসংখ্য মানুষ তাতে সামিল হয়েছেন। অনেকেই বহু মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য মানুষ ই-মেলে সংশোধনী সংযোজনী পাঠিয়েছেন। সেই সমস্ত মতামতকে সুবিন্যস্ত রূপে সাজিয়ে সংশোধিত খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

দেশের পার্লামেন্টে সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ উত্থাপন করেনি। তাই জনগণের শিক্ষানীতিকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার জন্য আগামী ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ব্যাঙ্গালোর শহরের রামাইয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অ্যাপেক্স অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে জনগণের পার্লামেন্ট অধিবেশন। সেখানে সমবেত হবেন দেশের সব রাজ্যের জনগণের সহস্রাধিক প্রতিনিধি এবং দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ বুদ্ধিজীবীরা। জনগণের শিক্ষানীতি গৃহীত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার রূপায়ণের দাবি উত্থাপন করা হবে। স্বাধীন ভারতে শিক্ষা আন্দোলনের এ এক গৌরবময় ও অভিনব রূপ।

অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশের প্রকৃত জ্ঞানের শক্তি নিহিত থাকে জনগণের শিক্ষার মধ্যে। কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি-২০২০ চালু করে সেই শিক্ষা থেকে দেশের কোটি কোটি মানুষকে বঞ্চিত করার অভিসন্ধি নিয়ে চলছে। তাই সময় এসেছে এই বিষয়ে এখনই কিছু করার। যেভাবে একদিন শিক্ষা মানবসভ্যতাকে গড়ে তুলেছে এবং তাকে রক্ষা করে এসেছে সেই শিক্ষা আজ আক্রান্ত। তাকে রক্ষা করা আজ আমাদের কর্তব্য। জনগণের পার্লামেন্টকে সর্বাত্মকভাবে সফল করে তুলবার জন্য অল ইন্ডিয়া সেভ এডুকেশন কমিটি দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আহ্বান জানিয়েছে।