
মানুষের সৃষ্টি কিংবা সমাজ গঠনের পেছনে কোনও অলৌকিক ঘটনা কাজ করে না। ইতিহাস আমাদের শেখায় সমাজ কখনও হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে বহু মানুষের দীর্ঘদিনের শ্রম, চিন্তা, ত্যাগ ও লড়াই। সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, কবি, দার্শনিক, লেখক, বিপ্লবী প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সময়কে নির্মাণ করেন। সভ্যতার প্রতিটি স্তম্ভ গড়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত অবদানে।
আজ আমি যে সময়ে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো লিখছি, সেই সময়টি নিঃসন্দেহে এক সংকটময় সময়। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা আজ তার চরম পচনশীল পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। এই পচন শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয় এটা রাজনীতি, প্রশাসন, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ সবকিছুকে গ্রাস করেছে।
পশ্চিমবঙ্গে হোক বা সমগ্র ভারতবর্ষে আজ রাজনীতি এক ভয়ঙ্কর টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবিকা প্রায় ধ্বংসের মুখে। চাকরি নেই, কাজ নেই, পরীক্ষার নিশ্চয়তা নেই। বছরের পর বছর পড়াশোনা করেও তরুণেরা আজ দিশেহারা। অথচ রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁরা জনগণের স্বার্থ রক্ষার বদলে দুর্নীতির সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলেছেন।
একটার পর একটা দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিয়োগ কোনও ক্ষেত্রই আর কলুষমুক্ত নেই। এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলেই তার জন্য অপেক্ষা করে থাকে জেল, মিথ্যা মামলা, পুলিশি হয়রানি, কখনও কখনও মৃত্যু পর্যন্ত।
তবুও মানুষ চুপ করে থাকেনি।
আজ থেকে দেড় বছর আগে আর জি কর হাসপাতালে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ ঘটনা শুধু একটি রাজ্যের বিষয় ছিল না। তা সারা ভারতবর্ষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। সেই আন্দোলন কখনও সীমিত হয়েছে, কখনও বিশাল আকার ধারণ করেছে। সরকারের উপর চাপ তৈরি হয়েছিল, কিছু দাবি মানতেও তারা বাধ্য হয়েছিল।
এই আন্দোলনের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিল কিছু মুখ যাঁরা শুধু স্লোগান দেননি, বরং দায়িত্ব নিয়ে আন্দোলনকে সঠিক পথে চালিত করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের মধ্যেই একটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের নেতা, ডাক্তার অনিকেত মাহাতো।
আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই তাঁর ভূমিকা ছিল স্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর এবং দায়িত্বশীল। তিনি বুঝেছিলেন, আবেগ যেমন জরুরি, তেমনি আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সঠিক দিকনির্দেশ। তিনি চেষ্টা করেছিলেন আন্দোলনকে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ নিজের সরকারি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন সম্পূর্ণ সচেতনভাবে, জেনেও যে ভবিষ্যতে আর কখনো সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তিনি জানেন এর অর্থ কী। আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ। তবুও তিনি পিছিয়ে যাননি।
নিজের নিরাপত্তা, নিজের কেরিয়ার, নিজের স্বপ্ন সবকিছুকে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি সমাজের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে চেয়েছেন। এই মানসিকতা কোনও সাধারণ বিষয় নয়। এই সাহস, এই আত্মত্যাগ এটাই ইতিহাস তৈরি করে। এটাই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এটাই প্রমাণ করে, সবকিছু বিক্রি হয়ে যায়নি, সব মানুষ নতজানু হয়নি।
আমরা আজ খবরের কাগজে অনেক কিছু পড়ছি, সামাজিক মাধ্যমে অনেক আলোচনা দেখছি। কেউ পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ সমর্থনের কথা বলছেন। কিন্তু শুধু সহানুভূতি বা ফেসবুক পোস্ট যথেষ্ট নয়।
আজ প্রয়োজন বাস্তব অবস্থান নেওয়ার। আজ প্রয়োজন ডাক্তার অনিকেত মাহাতোর পাশে দাঁড়ানো। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নয়, তাঁর ন্যায্য দাবির পাশে দাঁড়ানো। তিনি যা চাইছেন, সেই চাওয়াকে সম্মান করা। কারণ এই লড়াই কোনও একজন মানুষের নয়। এটা আমাদের সবার।
ইতিহাস কখনও নিরপেক্ষ থাকে না।
ইতিহাস প্রশ্ন করে–এই সময়ে দাঁড়িয়ে আপনি কোন পাশে ছিলেন?
দীপক মাজি
বাঁকুড়া